তেল-গ্যাসের বাড়তি দামে মাথা গরম? এর পেছনে আছে মনের খেলাও

ভাবুন, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কখন গ্যাস পাবেন, আদৌ ট্যাংক ভরতে পারবেন কিনা—তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আবার গাড়িতে তেল নিতে গিয়ে মিটারের অঙ্ক দ্রুত বাড়তে দেখছেন। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে শুনছেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিরক্তি, উদ্বেগ কিংবা অসহায় লাগা অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে মানুষের এই অভিজ্ঞতা এখন আরও তীব্র। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর উত্তর শুধু পকেটের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের মনস্তত্ত্বও।

খরচের অঙ্ক চোখের সামনে বাড়তে থাকা

মনোবিজ্ঞানে টাকা খরচ করার সময় যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তাকে বলা হয় ‘পেইন অব পেইং’—অর্থাৎ খরচের মানসিক যন্ত্রণা। সাধারণত কোনও পণ্য কেনার পর আমরা সেটি ব্যবহার করি। কেনার সময় কত টাকা দিয়েছি, সেই হিসাব পরে ধীরে ধীরে মন থেকে সরে যায়। কিন্তু জ্বালানি কেনার অভিজ্ঞতা আলাদা।

পাম্পে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার সময় মিটারের অঙ্ক চোখের সামনেই বাড়তে থাকে। যতক্ষণ জ্বালানি ভরা হয়, ততক্ষণই টের পাওয়া যায় কত টাকা খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ, টাকা দেওয়া আর কেনা জিনিস ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা এখানে প্রায় একই সময়ে ঘটে। ফলে খরচের বিষয়টি বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়।

গবেষক ড্যানিয়েল প্রিলেক ও জর্জ লোয়েনস্টাইন ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই মানসিক অস্বস্তির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তাদের আলোচনার মূল কথা হলো, টাকা খরচ করার অনুভূতি যত সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হয়, অস্বস্তিও তত বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়। গাড়িতে তেল নেওয়ার সময় বাড়তি কয়েকশ টাকা খরচের হিসাব যেমন চোখে পড়ে, তেমনি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হলে সেই চাপও তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয়।

দাম বাড়লে শুরু হয় সস্তা বিকল্পের খোঁজ

জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে মানুষ সাধারণত কম খরচে তা কেনার উপায় খোঁজে। কোথায় তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাবে, কোন পথে গেলে কম জ্বালানি লাগবে, কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে অন্য পরিবহন ব্যবহার করা যায় কিনা—এসব ভাবনা বাড়ে।

তবে সস্তা জ্বালানি খুঁজতে গিয়ে দূরের কোনও স্টেশনে চলে যাওয়াই সব সময় লাভজনক নয়। সেখানে যেতে যে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হবে, তা সাশ্রয়ের চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে। আবার দাম কমতে শুরু করলে সস্তা বিকল্প খোঁজার আগ্রহও কমে যেতে পারে। গবেষকেরা দেখেছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সময় মানুষ দামের তুলনা করতে বেশি আগ্রহী হয়; দাম কমার সময় সেই তৎপরতা কমে আসে।

বাংলাদেশে অবশ্য সিএনজি বা এলপিজির ক্ষেত্রে বিষয়টি কেবল কম দামে কেনার সুযোগ খোঁজার নয়। অনেক সময় কোথাও গ্যাস পাওয়া যাবে কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন। ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যাওয়া কিংবা বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করার বাড়তি খরচও মানুষের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

জ্বালানির দাম বাড়লে অন্য খরচ নিয়েও ভয়

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির ট্যাংক বা রান্নাঘরের সিলিন্ডারে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়, এবার হয়তো পরিবহন ভাড়া, খাবার কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য পণ্যের দামও বাড়বে।

২০২৬ সালে প্রকাশিত সান ফ্রান্সিসকো ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন জ্বালানির দাম বাড়বে বলে আশা করে, তখন অন্য পণ্যের দামও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করার প্রবণতা দেখা যায়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে এই প্রভাব তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে অনেক পরিবারের আয়ের বড় অংশই খাবার, যাতায়াত ও বাসাভাড়ার মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়, সেখানে জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ আরও বিস্তৃত হতে পারে। মাসের বাজেট মেলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষ তখন শুধু বর্তমান খরচ নয়, সামনে আরও কত টাকা লাগতে পারে—সেই হিসাবও করতে থাকে।

তবে জ্বালানির দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে, এমন নয়। কিন্তু বাড়তি খরচের আশঙ্কাটিও মানুষের বর্তমান মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

অস্বস্তি কমাতে কী করা যায়?

জ্বালানির দাম বা সরবরাহের সংকট ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া যায়। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো, সম্ভব হলে একসঙ্গে কয়েকটি কাজ সেরে ফেলা, যাত্রাপথ পরিকল্পনা করা এবং বাস্তবসম্মত মাসিক বাজেট তৈরি করা খরচ সামলাতে সাহায্য করতে পারে।

তবে শুধু সাশ্রয়ের পরামর্শ দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান হয় না। জ্বালানি সহজলভ্য করা, বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর রাখা এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা কমানোও জরুরি।

জ্বালানির দাম বাড়লে মানুষের বিরক্তি তাই নিছক হিসাবি অসন্তোষ নয়। প্রতিবার টাকা খরচের দৃশ্যমান চাপ, সামনে আরও খরচ বাড়ার আশঙ্কা এবং দৈনন্দিন জীবন চালানোর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়েই তৈরি হয় এই অস্বস্তি। সংকটের সময়ে মানুষের মানসিক চাপ বুঝতে হলে পাম্পের মিটার কিংবা গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম দেখার পাশাপাশি সেই খরচ সামলাতে গিয়ে তার মনে কী চলছে, সেটিও বোঝা প্রয়োজন।