সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে নতুন কোনও ট্রেন্ড। কখনও নিজের ছবিকে অ্যানিমেশনে রূপান্তর, কখনও একই গানের সঙ্গে ভিডিও বানানো, আবার কখনও জনপ্রিয় কোনও চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া। একজন শুরু করেন, এরপর বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনেরা যোগ দেন। দেখতে দেখতে ট্রেন্ডটি ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের মধ্যে।
কিন্তু মানুষ কেন এসব ট্রেন্ডে অংশ নেয়? শুধু মজা পাওয়ার জন্য, নাকি এর পেছনে কাজ করে আরও গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ট্রেন্ড অনুসরণের পেছনে কাজ করে অন্যদের অনুকরণ, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, নিজের পরিচয় প্রকাশ এবং কোনও গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকার প্রয়োজন। সংকটের সময় এসব ট্রেন্ড আবার মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির উপায়ও হয়ে উঠতে পারে।
সবাই করছে, আমিও করি
অনেক মানুষ একই কাজ করলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য বা আকর্ষণীয় মনে হওয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে। মনোবিজ্ঞানে একে ‘হার্ড মেন্টালিটি’ বা দলগত অনুসরণপ্রবণতা বলা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ‘সোশ্যাল প্রুফ’ বা সামাজিক প্রমাণের ধারণা। অর্থাৎ, কোনও কিছু জনপ্রিয় কিনা, তা বোঝার জন্য মানুষ অন্যদের আচরণ দেখে।
ধরা যাক, কোনও নতুন ফিল্টার ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ ছবি পোস্ট করছেন। বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে পরিচিত তারকারাও তাতে অংশ নিচ্ছেন। তখন ট্রেন্ডটি শুধু ছবি সম্পাদনার বিষয় থাকে না, বরং জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। এতে অংশ নিয়ে মানুষ অন্যদের সঙ্গে মিল খুঁজে পান এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অনুভূতি পান।
নিজের অন্য রূপ দেখানোর সুযোগ
সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ নিজের পছন্দের একটি রূপ তুলে ধরতে পারেন। কোনও ট্রেন্ড সেই সুযোগ তৈরি করে।
২০২৫ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে স্টুডিও জিবলির অ্যানিমেশনধর্মী আবহে ছবি তৈরির প্রবণতা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। এই ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে অনেকে নিজেদের পরিচিত মুখকে কল্পনার জগতে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
একইভাবে, পোশাক, সংগীত কিংবা ভিডিওর ধরন বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের রুচি ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করেন। কখনও এটি বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি, কখনও নিজের কাঙ্ক্ষিত জীবনের কল্পিত সংস্করণ। অর্থাৎ, ট্রেন্ড অনুসরণ শুধু অনুকরণ নয়; নিজের পরিচয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষারও একটি মাধ্যম।
লাইক-কমেন্টের আনন্দ কেন বারবার টানে?
ছবি বা ভিডিও পোস্ট করার পর লাইক, শেয়ার ও ইতিবাচক মন্তব্য পেলে ভালো লাগতে পারে। সেই স্বীকৃতি আবার একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে উৎসাহ দেয়। মস্তিষ্কের পুরস্কার-প্রক্রিয়া আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশিত স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বেশি মানুষের নজরে আসার সম্ভাবনা ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আগ্রহ বাড়াতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও জনপ্রিয় কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে। এতে কোনও ট্রেন্ডে অংশ নিয়ে পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। তবে লাইক পাওয়া মানেই আসক্তি তৈরি হয়েছে, এমন নয়। সমস্যা দেখা দিতে পারে যখন নিজের ভালো লাগা বা আত্মমূল্যবোধ ক্রমাগত অন্যের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ট্রেন্ডে অংশ না নিলে পিছিয়ে পড়ার ভয়
বন্ধুরা সবাই কোনও ট্রেন্ডে অংশ নিচ্ছেন, অথচ আপনি নিচ্ছেন না। তখন মনে হতে পারে, কোনও মজার অভিজ্ঞতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা ফোমো।
মানুষের মধ্যে অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকার স্বাভাবিক চাহিদা রয়েছে। তাই কোনও জনপ্রিয় ট্রেন্ডে অংশ নেওয়া অনেক সময় গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকার উপায় হয়ে ওঠে। কেউ কেউ ট্রেন্ডটি পছন্দ না করলেও আলোচনার বাইরে পড়ে যাওয়ার ভয় থেকে তাতে যোগ দেন।
সব ট্রেন্ড কি নিরীহ?
অনেক ট্রেন্ড সৃজনশীলতা, হাস্যরস ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু কিছু চ্যালেঞ্জ বিপজ্জনকও হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে ভিডিও বানানো কিংবা অন্যের চাপে নিজের নিরাপত্তা উপেক্ষা করার প্রবণতা বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য ক্ষতিকর।
দলগত চাপ, নতুন কিছু করার উত্তেজনা এবং অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনও ঝুঁকির মাত্রা ঠিকভাবে বিবেচনা করতে বাধা দেয়। তাই কোনও ট্রেন্ড জনপ্রিয় হলেই সেটি নিরাপদ বা অনুসরণযোগ্য, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সংকটের সময় ট্রেন্ড হয়ে ওঠে সংযোগের মাধ্যম
সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ঘরে বসে রুটি তৈরি, অনলাইন নাচ ও বিভিন্ন মজার চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া অনেকের জন্য সময় কাটানো এবং অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকার উপায় হয়েছিল।
সরাসরি দেখা করা সম্ভব না হলেও একই কাজ করা কিংবা একই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি হতে পারে। কঠিন সময়ে এমন সম্মিলিত অভিজ্ঞতা একাকিত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ট্রেন্ড অনুসরণের আগে ভাবুন
সোশ্যাল মিডিয়ার কোনও ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন—এটি কি সত্যিই আমার ভালো লাগছে, নাকি সবাই করছে বলে আমিও করছি? এতে কি নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারছি, নাকি শুধু অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছি? আর এতে কোনও ঝুঁকি আছে কি না?
সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডে অংশ নেওয়া মানেই অন্ধ অনুকরণ নয়। কখনও এটি আনন্দ, সৃজনশীলতা ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার উপায়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের ইচ্ছায় ট্রেন্ড অনুসরণ করছেন, নাকি অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয় আপনাকে তাতে অংশ নিতে বাধ্য করছে।