সন্তান স্কুলে পৌঁছেছে কিনা, ক্লাসে কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে—সবকিছুর খোঁজ রাখেন মা। সন্তান নিজে কোনও সমস্যার সমাধান করার আগেই এগিয়ে যান তিনি। ভুল করার সুযোগ না দিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপে আগলে রাখেন। উদ্দেশ্য একটাই—সন্তানের যেন কোনও কষ্ট না হয়।
কিন্তু অতিরিক্ত আগলে রাখার এই প্রবণতা কখনও কখনও সন্তানের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সামলানো ও স্বাধীনভাবে বড় হয়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অভিভাবকত্বকে বলা হয় ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং’। আর যেসব মা সব সময় সন্তানের মাথার ওপর হেলিকপ্টারের মতো ঘুরঘুর করেন, তাদের বলা হয় ‘হেলিকপ্টার মম’।
তবে এমন মায়েদের নিয়ে হাসাহাসি বা দোষারোপ করার আগে আরও কিছু বিষয় বোঝা জরুরি। কেন তারা সন্তানকে অতিরিক্ত আগলে রাখেন? এর পেছনে কি শুধু সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, নাকি সামাজিক প্রত্যাশা ও নিজের উদ্বেগও কাজ করে?
সম্প্রতি ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী আলি ক্রেশ লেভিন এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, অতিরিক্ত আগলে রাখার প্রবণতা বদলাতে হলে মায়েদের দোষারোপ না করে আগে বুঝতে হবে, তারা কেন এমন আচরণ করছেন।
ভালো মা হওয়ার চাপ
ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয়, অন্যের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হতে হবে। কেউ কষ্ট পেলে তাকে সান্ত্বনা দিতে হবে, সমস্যা হলে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। বড় হয়ে মা হওয়ার পর এই প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়।
সমাজে ভালো মায়ের একটি প্রচলিত ধারণা হলো—সন্তানের জন্য নিজের সব প্রয়োজন বিসর্জন দিতে হবে, তার বিকাশের প্রতিটি ধাপে নজর রাখতে হবে এবং যেকোনও সমস্যা থেকে তাকে রক্ষা করতে হবে।
লেভিন এই মানসিকতাকে ‘ইনটেনসিভ মাদারিং আইডিওলজি’ বা নিবিড় মাতৃত্বের আদর্শ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই ধারণায় সন্তানের সর্বোচ্চ বিকাশ নিশ্চিত করাকে মায়ের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, যেখানে নিজের প্রয়োজনকে অনেক সময় পেছনে সরিয়ে রাখতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য মায়েদের সন্তান লালন-পালনের ছবি ও অভিজ্ঞতা দেখেও এই চাপ বাড়তে পারে। কেউ সন্তানের পড়াশোনা, কেউ খেলাধুলা, কেউ আবার প্রতিদিনের নানা কর্মকাণ্ডে কতটা সময় দিচ্ছেন, তা দেখে মনে হতে পারে—ভালো মা হতে হলে আরও বেশি কিছু করতে হবে।
কিন্তু সন্তানের জন্য বেশি কিছু করলেই যে সব সময় ভালো ফল পাওয়া যাবে, তা নয়।
সন্তানের কষ্টে মা এত উদ্বিগ্ন হন কেন?
সন্তান কষ্ট পেলে মায়েরও কষ্ট হয়। শিশুর কান্না বা বিপদের সংকেতে অভিভাবকের মস্তিষ্ক ও শরীরে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ফলে সন্তানকে কোনও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে আনলে মা নিজেও সাময়িক স্বস্তি পান।
কিন্তু এভাবে প্রতিবার সন্তানের সমস্যা মিটিয়ে দিলে একটি অভ্যাস তৈরি হতে পারে। সন্তান নিজে সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আগেই মা সমাধান করে দেন। এতে শিশুর সাময়িক কষ্ট কমলেও, নিজে সমস্যা সামলানোর সুযোগ কমে যায়।
অবশ্য সব শিশুর প্রয়োজন এক নয়। বিশেষ চাহিদা রয়েছে বা নির্দিষ্ট কোনও ঝুঁকির মুখে আছে, এমন সন্তানের ক্ষেত্রে বাড়তি নজরদারি ও সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। বাইরে থেকে যাকে অতিরিক্ত আগলে রাখা মনে হচ্ছে, বাস্তবে সেটি তার জন্য প্রয়োজনীয়ও হতে পারে।
তাই শুধু মায়ের আচরণ দেখে বিচার না করে সন্তানের বয়স, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
অতিরিক্ত আগলে রাখলে সন্তানের কী ক্ষতি হতে পারে?
সন্তানের প্রতিটি সমস্যা মা-বাবা সমাধান করে দিলে সে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা ভুল থেকে শেখার সুযোগ কম পায়। ছোটখাটো হতাশা, ব্যর্থতা বা মতবিরোধ সামলানোর অভিজ্ঞতাও তার কম হতে পারে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপমূলক অভিভাবকত্বের সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও আচরণগত সমস্যার সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখায়, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের সঙ্গে সন্তানের কিছু প্রতিকূল মানসিক ফলাফলের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া প্রত্যেক মায়ের সন্তানই সমস্যায় পড়বে।
সন্তানকে আগলে রাখার পাশাপাশি তাকে বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়াও তাই গুরুত্বপূর্ণ। ভুল করলে কীভাবে তা ঠিক করতে হয়, সমস্যা হলে কীভাবে সাহায্য চাইতে হয় এবং হতাশা সামলাতে হয়—এসব শেখার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
‘কম করুন’ বললেই কি সমস্যার সমাধান?
অতিরিক্ত আগলে রাখা মায়েদের প্রায়ই বলা হয়, সন্তানকে নিজের মতো থাকতে দিন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন না। পরামর্শটি যুক্তিসংগত হলেও, কেন মা এমন আচরণ করছেন, তা না বুঝে শুধু আচরণ বদলাতে বললে উল্টো তার মধ্যে অপরাধবোধ বাড়তে পারে।
লেভিনের মতে, মায়েদের বোঝানো দরকার যে ভালো অভিভাবক হওয়ার অর্থ প্রতিটি সমস্যার সমাধান নিজে করে দেওয়া নয়। কখনও পাশে থাকা, কখনও সাহায্য করা, আবার কখনও সন্তানকে নিজে চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়াও ভালো অভিভাবকত্বের অংশ।
এর জন্য মায়ের নিজের উদ্বেগ বোঝা, সামাজিক প্রত্যাশার চাপ কমানো এবং পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া জরুরি। সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব শুধু মায়ের একার—এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।
সন্তানকে ভালোবাসুন, তবে নিজের মতো বড় হতে দিন
সন্তানের প্রতি যত্ন ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। সন্তানকে বিপদ থেকে রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি বয়স অনুযায়ী নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভুল করা এবং সেই ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন।
মা সব সময় সন্তানের পাশে থাকবেন, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না। সন্তান সমস্যায় পড়লে সাহায্য করবেন, তবে সম্ভব হলে তাকে নিজে সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করবেন।
ভালো মা হওয়ার অর্থ সন্তানকে সব কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; বরং জীবনের ছোট ছোট কষ্ট ও চ্যালেঞ্জ সামলানোর শক্তি অর্জনেও তাকে সাহায্য করা।
পছন্দের জিনিস না পেলেই কান্না, কথায় কথায় জেদ—কেন এমন করে শিশুরা?
সন্তান খেতে চাইছে না? ‘খুঁতখুঁতে’ ভেবে এড়িয়ে যাবেন না
মেয়ে সন্তান হলে কি সত্যিই বাবার আয়ু বাড়ে?