রূপকথার রাজকন্যার মতো সুন্দর পোশাক, সবার মনোযোগ, সবসময় সেরা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—ছোটদের কাছে এসব বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু রাজকন্যার মতো দেখতে হওয়া বা সবার আদর পাওয়াই যদি একটি মেয়ের কাছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে তার আত্মবিশ্বাস ও নিজস্ব পরিচয়ের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে এ প্রবণতাকে কখনও কখনও ‘প্রিন্সেস সিনড্রোম’ বা রাজকন্যা-মানসিকতা বলা হয়। এটি স্বীকৃত কোনও চিকিৎসাবিষয়ক রোগনির্ণয় নয়; বরং এমন এক আচরণগত প্রবণতার বর্ণনা, যেখানে বাহ্যিক সৌন্দর্য, বিশেষ সুবিধা পাওয়া এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকার ধারণা শিশুর আত্মপরিচয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ছোটবেলায় রূপকথার জগতে মেতে থাকা স্বাভাবিক। তবে সৌন্দর্য, দামি জিনিস এবং সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌন্দর্যই কি সব?
বিজ্ঞাপন, কার্টুন, খেলনা, পোশাক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েদের সামনে প্রায়ই একটি নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের ধারণা তুলে ধরা হয়। সুন্দর দেখানো, জনপ্রিয় হওয়া কিংবা অন্যের প্রশংসা পাওয়াকেই যেন সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখানো হয়।
এ ধরনের বার্তা বারবার পেলে শিশু নিজের মূল্যকে বাহ্যিক চেহারা ও অন্যের স্বীকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শিখতে পারে। ফলে নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি, অন্যের সঙ্গে তুলনা কিংবা প্রশংসা না পেলে হতাশ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
সবকিছুর জন্য অন্যের ওপর নির্ভরতা
রাজকন্যা-মানসিকতার আরেকটি দিক হলো, কেউ এসে সব সমস্যার সমাধান করে দেবে—এমন প্রত্যাশা। এতে শিশু নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করার চেষ্টা, সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা ব্যর্থতা সামলানোর সুযোগ কম পেতে পারে।
একইভাবে, বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অন্যকে খুশি রাখার জন্য নিজের মতামত চেপে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অথচ সুস্থ আত্মবিশ্বাসের জন্য নিজের পছন্দ-অপছন্দ বোঝা এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবক কী করতে পারেন?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তানকে সব নেতিবাচক প্রভাব থেকে আড়াল করে রাখা সম্ভব নয়। বরং তাকে এসব বার্তা বুঝতে ও বিচার করতে শেখানো বেশি কার্যকর।
প্রথমত, বিজ্ঞাপন, কার্টুন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌন্দর্য ও সাফল্য সম্পর্কে কী ধারণা দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। কেন সে কোনও চরিত্র বা তারকাকে পছন্দ করে, কী তাকে আকর্ষণ করে—এসব প্রশ্নের মাধ্যমে তাকে নিজের মতামত গড়ে তুলতে সাহায্য করুন।
দ্বিতীয়ত, সন্তানের নিজের পছন্দ প্রকাশের সুযোগ দিন। পোশাক বা সাজসজ্জা নিয়ে তার আগ্রহকে অযথা দমন না করে আরাম, ব্যবহারিক দিক ও পরিস্থিতির উপযোগিতা বোঝান। পাশাপাশি তাকে প্রশ্ন করতে, কোনও কিছু ভালো না লাগলে তা জানাতে এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে উৎসাহিত করুন।
তৃতীয়ত, অন্যের মতো হওয়ার চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করুন। সব বন্ধুর কাছে যে জিনিস আছে, সেটি তারও লাগবে—এমন নয়। নিজের আলাদা পছন্দ ও বৈশিষ্ট্য থাকা যে স্বাভাবিক, তা ছোটবেলা থেকেই শেখানো প্রয়োজন।
রাজকন্যা নয়, নিজের গল্পের নায়িকা
সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার অর্থ তার সৌন্দর্য বা কল্পনাকে অস্বীকার করা নয়। বরং তাকে বোঝানো যে, তার মূল্য শুধু চেহারা, পোশাক কিংবা অন্যের প্রশংসার ওপর নির্ভর করে না। তার চিন্তা, দক্ষতা, সহমর্মিতা, সাহস এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য সন্তানকে রাজকন্যা হতে বাধা দেওয়া নয়; বরং তাকে এমনভাবে বড় হতে সাহায্য করা, যাতে নিজের জীবনের গল্পে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে—অন্য কারও স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকতে না হয়।