বিয়েতে উপহার পাওয়া সুন্দর বাসনপত্র। বিশেষ কোনও দিনে প্রিয় মানুষের দেওয়া ঘড়ি। বিদেশ থেকে আনা স্মারক কিংবা যত্ন করে তুলে রাখা শখের পোশাক। এমন অনেক জিনিসই আমাদের ঘরে থাকে, যেগুলো ব্যবহার করার চেয়ে তুলে রাখতেই বেশি ভালো লাগে।
মনে হয়, প্রতিদিন ব্যবহার করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোথাও আঁচড় পড়তে পারে, ভেঙে যেতে পারে কিংবা হারিয়ে যেতে পারে নতুনের মতো সৌন্দর্য। তাই ঠিক করা হয়, বিশেষ দিনেই ব্যবহার করা হবে। কিন্তু সেই বিশেষ দিনটির অপেক্ষা করতে করতে বছরের পর বছর কেটে যায়। আলমারিতে পড়ে থাকে সুন্দর বাসনপত্র, বাক্সে বন্দি থাকে প্রিয় উপহার। অথচ যে আনন্দের জন্য সেগুলো এত যত্ন করে রাখা, সেই আনন্দই আর উপভোগ করা হয় না।
কখনও কি ভেবে দেখেছেন, প্রিয় জিনিস আগলে রাখতে গিয়ে সেগুলোর আনন্দ থেকে নিজেকেই বঞ্চিত করছেন না তো?
ভোক্তা-আচরণবিষয়ক গবেষক জ্যানিনা স্টেইনমেটজ এক লেখায় এমনই একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বস্তু এবং সেগুলো ব্যবহার করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আবেগের সংযোগ আরও দৃঢ় হওয়ার বিষয়টি।
প্রিয় জিনিস ব্যবহার করতে দ্বিধা কেন?
কোনও বস্তু আমাদের কাছে মূল্যবান হয়ে ওঠে নানা কারণে। কখনও তার দাম বা সৌন্দর্যের জন্য, কখনও আবার সেটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোনও মানুষ, সম্পর্ক কিংবা বিশেষ মুহূর্তের কারণে।
বিয়েতে উপহার পাওয়া একটি কাপের কথাই ধরুন। বাজার থেকে কিনলে হয়তো সেটি আর দশটি কাপের মতোই সাধারণ হতো। কিন্তু প্রিয় কারও দেওয়া বলে কাপটির আলাদা অর্থ তৈরি হয়েছে। সেটিতে চা খেতে বসলে হয়তো বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ে, উপহারদাতার কথা মনে হয় কিংবা সম্পর্কটির প্রতি নতুন করে মমতা অনুভব করেন।
সমস্যা হলো, এই স্মৃতি অক্ষত রাখার জন্যই অনেকে কাপটি ব্যবহার করতে চান না। ভয় থাকে, ব্যবহারে জিনিসটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির মূল্যও বুঝি কমে যাবে।
কিন্তু স্মৃতি আর বস্তু তো এক জিনিস নয়। কাপটিতে আঁচড় পড়লেও উপহার দেওয়ার মুহূর্তটি মুছে যায় না। ঘড়িটি পুরোনো হলেও প্রিয় মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না।
বরং ব্যবহার না করার কারণে জিনিসটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে। সেটি যে স্মৃতি বা সম্পর্কের স্মারক, তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও কমে যায়।
ব্যবহার করলে স্মৃতির মূল্য বাড়তে পারে?
প্রিয় কোনও বস্তু ব্যবহার করলে তার মূল্য কমে যায়—এমন ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। বরং ব্যবহার করার মধ্য দিয়েই সেটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি আরও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
২০২৬ সালে ড্যান গ্রসম্যান ও তার সহকর্মীদের প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা হয়েছে, আবেগপূর্ণ স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত বস্তু ব্যবহার করলে তার প্রতি মানুষের অনুভূতি কীভাবে বদলায়।
গবেষকেরা প্রায় দুই হাজার অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে পাঁচটি গবেষণা পরিচালনা করেন। ফলাফলে দেখা যায়, স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত বস্তু ব্যবহার করলে মানুষ সেই বস্তুটির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি, ঘটনা কিংবা অভিজ্ঞতার কথা তুলনামূলক বেশি মনে করেছেন। একই সঙ্গে বস্তুটির সঙ্গে নিজেদের পরিচয়ের সংযোগও তাদের কাছে আরও দৃঢ় হয়েছে।
একটি পরীক্ষায় ২১৪ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিজেদের প্রিয় কলেজ-স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়, এমন শব্দ দিয়ে একটি চাবির রিং সাজাতে বলা হয়। এরপর একদল শিক্ষার্থী দুই সপ্তাহ প্রতিদিন সেটি ব্যবহার করেন। অন্যরা চাবির রিংটি ড্রয়ারে তুলে রাখেন।
দুই সপ্তাহ পর দেখা যায়, প্রতিদিন ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের কাছে চাবির রিংটির আবেগগত মূল্য তুলনামূলক বেশি বেড়েছে।
অর্থাৎ, প্রিয় কোনও বস্তু ব্যবহার করলেই তার আবেগগত মূল্য কমে যায়, এমন নয়। বরং ব্যবহারের মধ্য দিয়েই সেটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও অনুভূতির সংযোগ আরও গভীর হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব ধরনের মূল্যবান জিনিস ব্যবহার করলেই তার আবেগগত মূল্য বাড়বে। গবেষণাটি মূলত স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত বস্তু ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে; সব বস্তু বা সব মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্মৃতিকে শুধু আলমারিতে আটকে রাখবেন না
প্রিয় জিনিসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক সময় তার ব্যবহারিক প্রয়োজনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। একটি পুরোনো বই হয়তো এখন আর পড়া হয় না, কিন্তু সেটি মনে করিয়ে দেয় জীবনের বিশেষ একটি সময়ের কথা। প্রিয়জনের দেওয়া কলমটি হয়তো বাজারের সাধারণ কলমের চেয়ে ভালো নয়, কিন্তু সেটি হাতে নিলেই উপহারদাতার কথা মনে পড়ে।
এই বস্তুগুলো আমাদের জীবনের গল্পের অংশ। এগুলো মনে করিয়ে দেয়, আমরা কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি এবং কোন মানুষ বা ঘটনাগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এসব জিনিসকে শুধু সংরক্ষণ করার বস্তু হিসেবে না দেখে স্মৃতি ও সম্পর্কের সঙ্গে সংযোগ তৈরির মাধ্যম হিসেবেও ভাবা যেতে পারে।
বিয়েতে পাওয়া সুন্দর প্লেটটি শুধু আলমারিতে সাজিয়ে রাখার জন্য নয়। সেটিতে সকালের নাশতা খাওয়া যেতে পারে। বিশেষ কারও দেওয়া শালটি শুধু বিশেষ দিনের অপেক্ষায় না রেখে শীতের সকালে গায়ে জড়ানো যায়। প্রিয় ভ্রমণের স্মারকটি ঘরের এমন জায়গায় রাখা যায়, যেখানে চোখে পড়লেই সেই ভ্রমণের আনন্দ মনে পড়ে।
এভাবে প্রিয় জিনিসগুলো জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে, কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে পড়ে থাকতে হয় না।
বেশি জিনিস, কম ব্যবহার
অনেকের ঘরেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জিনিস জমে থাকে। কিছু নিয়মিত ব্যবহার করা হয়, কিছু মাঝেমধ্যে, আর কিছু বছরের পর বছর বাক্সবন্দি থাকে।
কোনও জিনিস ফেলে দিতে কষ্ট হয়, আবার ব্যবহার করতেও দ্বিধা কাজ করে। ফলে মূল্যবান বলে মনে করা বস্তুগুলো জায়গা দখল করে রাখে, কিন্তু আমাদের জীবনে তাদের ব্যবহারিক বা আবেগগত ভূমিকা খুব কম থাকে।
স্টেইনমেটজের আলোচনার মূল বক্তব্য হলো, জিনিসপত্রের মূল্যকে শুধু মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সেগুলো কীভাবে আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করছে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, সব জিনিস ব্যবহার করতেই হবে। কোনও বস্তু ভঙ্গুর হলে, ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলে কিংবা বিশেষ কারণে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন হলে সেটি তুলে রাখাই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। একইভাবে, কোনও স্মারক ব্যবহার করলে হারিয়ে যাওয়ার বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা থাকলে সতর্কতা জরুরি।
মূল কথা হলো, কেবল ‘নষ্ট হয়ে যাবে’—এই ভয় থেকেই সব প্রিয় জিনিসকে ব্যবহারহীন করে রাখছি কি না, তা ভেবে দেখা।
বিশেষ দিনের জন্য অপেক্ষা কেন?
প্রিয় কোনও জিনিস ব্যবহার করার জন্য জীবনের নিখুঁত মুহূর্তের অপেক্ষা করতে হয় না। সব সুন্দর বাসনপত্র অতিথি এলে ব্যবহার করতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। প্রিয় পোশাকটি পরার জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের অপেক্ষাও জরুরি নয়।
আজকের সাধারণ দিনটিও আপনার জীবনের অংশ। সকালের নাশতা, বিকালের চা কিংবা পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময়টুকুও বিশেষ হয়ে উঠতে পারে।
তাই আলমারিতে তুলে রাখা কোনও প্রিয় জিনিস বের করে দেখুন। সেটি ব্যবহার করলে কী হতে পারে, ভাবুন। হয়তো সেটি ব্যবহারে কোনও সমস্যা নেই। হয়তো ব্যবহার করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু আনন্দ, যা এত দিন কেবল সম্ভাবনা হয়েই ছিল।
নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর কথাও ভাবতে পারেন। কোন বস্তুটি আপনাকে কারও কথা মনে করিয়ে দেয়? কোনটি জীবনের কোনও আনন্দের মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে? সেগুলো কীভাবে আপনার বর্তমান জীবনেও জায়গা করে নিতে পারে?
প্রিয় জিনিসের মূল্য শুধু সেটিকে অক্ষত রাখার মধ্যে নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি, অনুভূতি ও সম্পর্ককে জীবন্ত রাখার মধ্যেও।
হয়তো সবচেয়ে সুন্দর বাসনটি আলমারিতে তুলে রাখার জন্য নয়, আজকের সকালের নাশতায় ব্যবহার করার জন্যই অপেক্ষা করছে।