রাজনীতি নিয়ে মতের অমিল, একাকিত্ব বাড়ছে তরুণদের?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:৪৩ আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:৪৩

আপনার রাজনৈতিক মতের সঙ্গে বন্ধুর মত মেলে না। যে বিষয়টি আপনার কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, বন্ধুর কাছে সেটিই হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত। কথা বলতে গিয়ে মতের অমিল দেখা দিলেই শুরু হয় তর্ক। একসময় তর্ক গড়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণে। বন্ধুত্বে তৈরি হয় দূরত্ব, কখনও ভেঙেও যায় সম্পর্ক।

এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মতের বিরোধ, ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারা কিংবা মতের অমিল হলেই কাউকে অপছন্দের তালিকায় ফেলে দেওয়ার প্রবণতা মানুষের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন স্টসনি সম্প্রতি তার এক লেখায় দেখিয়েছেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ কীভাবে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারা এবং সবকিছুকে সাদা-কালোভাবে দেখার প্রবণতা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।

মতের অমিল কেন এত ব্যক্তিগত মনে হয়?

রাজনীতি নিয়ে আলোচনা অনেক সময় শুধু নীতি বা সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনও রাজনৈতিক অবস্থানকে আমরা নিজেদের মূল্যবোধ, পরিচয় ও নৈতিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। ফলে কেউ সেই অবস্থানের বিরোধিতা করলে মনে হতে পারে, তিনি শুধু একটি মতের বিরোধিতা করছেন না; বরং আমাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকেও অস্বীকার করছেন।

স্টসনির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উদ্বেগের সময় মানুষ সম্ভাব্য বিপদ খুঁজতে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারে। তখন ভিন্নমতও হুমকি বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ বয়সে নিজের পরিচয় ও বিশ্বাস সম্পর্কে দৃঢ়তা তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকায় মতের অমিল মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।

ধরা যাক, দুই বন্ধু একই বিষয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। একজন মনে করেন, অন্যজনের মতটি শুধু ভুল নয়, বরং তার চরিত্রেরও পরিচায়ক। অন্যজনও একইভাবে বন্ধুর অবস্থানকে ব্যক্তিগতভাবে বিচার করতে শুরু করেন। তখন যুক্তি দিয়ে আলোচনা করার বদলে দুজনই নিজেদের অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

এভাবে মতের অমিল থেকে তৈরি হয় অবিশ্বাস, ক্ষোভ এবং সম্পর্কের দূরত্ব।

তরুণদের ওপর চাপটা বেশি কেন?

তরুণ বয়সে মানুষ নিজের পরিচয়, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। এ সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাবলি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যেসব বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেগুলো নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষকে অসহায় বোধ করাতে পারে।

স্টসনির মতে, এই অসহায়ত্ব কখনও বিরক্তি, অনমনীয় চিন্তা কিংবা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে অনীহার রূপ নিতে পারে। তখন রাজনৈতিক মতের পার্থক্যকে স্বাভাবিক মতবিরোধ হিসেবে দেখার বদলে ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা শুরু হয়।

এর প্রভাব পড়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও। কেউ হয়তো বন্ধুর সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। কেউ আবার মনে করেন, ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অর্থ নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করা।

কিন্তু একজন মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মানবিকতা, আচরণ, বন্ধুত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা—এসবও তাকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি দূরত্ব বাড়াচ্ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্ক খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অনেক সময় জটিল কোনও বিষয়কে কয়েকটি শব্দ, স্লোগান কিংবা ছোট ভিডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কোনও বিষয়ে বিস্তারিত জানার আগেই মানুষ একটি অবস্থান নিয়ে ফেলতে পারে।

একই ধরনের মতামত বারবার দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, নিজের পক্ষের মানুষই সঠিক এবং অন্য পক্ষের সবাই ভুল। ভিন্নমতের মানুষকে বোঝার বদলে তাদের বক্তব্যের দুর্বলতা খুঁজে বের করাই তখন প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।

স্টসনি সতর্ক করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সামাজিক সমস্যার জটিলতা পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না। সেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবিরোধ যেভাবে প্রকাশ পায়, তা মানসিক চাপ বাড়াতে এবং মানুষের মধ্যে বিভাজন তীব্র করতে পারে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই সব সমস্যার কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এর প্রভাব নির্ভর করে মানুষ কী ধরনের তথ্য দেখছেন, কীভাবে তা বিচার করছেন এবং অনলাইনের বিরোধকে বাস্তব সম্পর্কের মধ্যে কীভাবে নিয়ে আসছেন, তার ওপরও।

ভালোবাসার শর্ত কি একই রাজনৈতিক মত?

ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব বজায় রাখতে কি সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি?

স্টসনির মতে, কোনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সফল হওয়ার জন্য দুজনের রাজনৈতিক বা সামাজিক বিশ্বাস এক হওয়া আবশ্যক নয়। বরং সহমর্মিতা, দয়া এবং পরস্পরের প্রতি সম্মান সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, সব ধরনের মতপার্থক্য উপেক্ষা করতে হবে। কোনও মত বা আচরণ যদি অন্যের মর্যাদা অস্বীকার করে, তাকে অপমান করে কিংবা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে, তাহলে সেই বিরোধকে নিছক মতের অমিল বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

কিন্তু নীতি, কৌশল কিংবা কোনও সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে আলোচনার সুযোগ রাখা যায়। অন্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা সম্ভব।

মেরুকরণ থেকে বের হওয়ার উপায় কী?

স্টসনি পরামর্শ দিয়েছেন, অন্যকে বিচার করার চেয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়া জরুরি। কোনও বক্তব্য শুনেই সেটি বাতিল না করে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে—কেন তিনি এমন মনে করেন, তার অভিজ্ঞতা কী এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় কাজে আসতে পারে।

প্রথমত, মতের বদলে যুক্তি নিয়ে কথা বলুন। কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই তার চরিত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, তার বক্তব্যের নির্দিষ্ট যুক্তি ও তথ্য নিয়ে আলোচনা করুন।

দ্বিতীয়ত, নিজের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা স্বীকার করুন। কোনও বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস থাকা মানেই সেই বিষয়ে আপনার সব ধারণা সঠিক—এমন নয়। নতুন তথ্য পেলে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার মানসিকতা রাখুন।

তৃতীয়ত, ভিন্নমতকে শত্রুতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। কেউ আপনার সঙ্গে একমত নন বলেই তিনি আপনার ক্ষতি চান, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তার আচরণ ও যুক্তি বিবেচনা করুন।

চতুর্থত, সম্পর্কের সীমারেখা বুঝুন। আলোচনা যদি অপমান, হুমকি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণে গড়ায়, তাহলে সেখান থেকে সরে আসা যুক্তিসংগত। মতের অমিল মেনে নেওয়ার অর্থ অসম্মান সহ্য করা নয়।

মতের অমিল থাকলেও সম্পর্ক টিকে থাকুক

রাজনীতি মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে অধিকার, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। তাই এসব বিষয়ে মানুষের আবেগ থাকবে, মতের পার্থক্যও থাকবে।

কিন্তু প্রতিটি মতবিরোধকে ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত করলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। বিশেষ করে তরুণ বয়সে, যখন বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, তখন ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা শেখা জরুরি।

অন্যের মত গ্রহণ করতেই হবে, এমন নয়। বরং বোঝার চেষ্টা করা দরকার—কোন বিষয়ে আমাদের মত আলাদা, কেন আলাদা এবং সেই পার্থক্য সত্ত্বেও আমরা পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে পারি কি না।

কারণ সুস্থ সম্পর্কের জন্য সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়; জরুরি হলো মতের অমিলের মধ্যেও মানুষ হিসেবে একে অন্যকে বোঝার ও সম্মান করার চেষ্টা।

/এম/
সম্পর্কিত
স্কুলের পুনর্মিলনীতে কেন ফেরেন মানুষ, টান কি শুধুই স্মৃতির?
মানসিক সুস্থতায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জরুরি: চিফ হুইপ
তরুণ প্রজন্ম কেন মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে?
সর্বশেষ খবর
জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী
জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অতীতের ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’, এবার কোন পথে বিএনপি?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে অতীতের ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’, এবার কোন পথে বিএনপি?
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
ভোটের আগে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন চেয়ে নেতানিয়াহুর আকুতি
ভোটের আগে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন চেয়ে নেতানিয়াহুর আকুতি
সর্বাধিক পঠিত
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমপি নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করবেন, আশা করেন রাশেদ খাঁন
২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমপি নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করবেন, আশা করেন রাশেদ খাঁন
ঋতুস্রাবের সময় বিজয়ের সেবাযত্নের প্রশংসায় রাশমিকা
ঋতুস্রাবের সময় বিজয়ের সেবাযত্নের প্রশংসায় রাশমিকা
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়