ভালোবাসা যখন ‘অন্ধ করে দেয়’, তখন কী হয় জানেন?

ভালোবাসার মানুষটির ভুলও কি কখনও আপনার চোখে ভুল বলে মনে হয় না? অন্যরা যখন তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন কি আপনি বরং তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান? এমনকি স্পষ্ট কোনও সত্য সামনে এলেও কি মনে হয়, সবাই ভুল বুঝছে, শুধু আপনিই তাকে ঠিকভাবে চেনেন?

ভালোবাসার সম্পর্কে এমন অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়। প্রিয় মানুষটির পাশে দাঁড়ানো, তার দুর্বলতা মেনে নেওয়া কিংবা কঠিন সময়ে তাকে সমর্থন করা সম্পর্কেরই অংশ। কিন্তু তাকে সমর্থন করতে গিয়ে যখন তার ভুলও অস্বীকার করতে শুরু করি, তখন ভালোবাসা আর বাস্তবতাকে দেখার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী এলিজাবেথ জে. লা মটের মতে, কখনও কখনও ভালোবাসা মানুষের কাছে বাস্তবতা থেকে পালানোর আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। তখন সম্পর্কের বন্ধন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, সেই সম্পর্কের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও সত্য মেনে নেওয়াই কঠিন মনে হয়।

ভালোবাসার মানুষটি কি ভুলের ঊর্ধ্বে?

এর একটি আলোচিত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেরানোসের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ হোমস ও তার সঙ্গী বিলি ইভান্সের সম্পর্ক।

একসময় হোমসকে প্রযুক্তি দুনিয়ার সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা হিসেবে দেখা হতো। তার প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তি তৈরির দাবি করেছিল, যার সাহায্যে অল্প রক্ত ব্যবহার করে অনেক ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু পরে প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে হোমস দোষী সাব্যস্ত হন এবং কারাদণ্ড পান।

তবু নিজের নির্দোষতার দাবি ধরে রাখেন হোমস। তার সঙ্গী ইভান্সও তাকে সমর্থন করেন। তাদের সম্পর্ক নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র “ইউ ক্যান সি এভরিথিং”–এ ব্যক্তিগত ভালোবাসা, আনুগত্য এবং অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

লা মটের বিশ্লেষণে এই সম্পর্কের একটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: ভালোবাসার মানুষটিকে রক্ষা করার তাগিদ কখনও কখনও বাস্তবতা স্বীকার করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অবশ্য কোনও সম্পর্কের সব দিক বাইরে থেকে জানা সম্ভব নয়। তাই কাউকে ভালোবাসেন বা তার পাশে দাঁড়ান বলেই তিনি বাস্তবতা অস্বীকার করছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। বরং এই ঘটনা আমাদের ভাবতে শেখায়, প্রিয় মানুষটির প্রতি আনুগত্য আর তার প্রতিটি কাজকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়।

ভালোবাসা আর অন্ধ আনুগত্য এক নয়

একটি সুস্থ সম্পর্কে দুজন মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি থাকেন, আবার নিজেদের আলাদা মতামত ও ব্যক্তিসত্তাও ধরে রাখেন। একজন ভুল করলে অন্যজন তা নিয়ে কথা বলতে পারেন। মতের অমিল হলেও সম্পর্ক হারানোর ভয় থেকে সব কথা চেপে রাখতে হয় না।

কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে যখন একজনের পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্যজন নিজের অস্তিত্বকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলেন, তখন সমস্যা তৈরি হতে পারে। সঙ্গীর ভুল স্বীকার করাকে তখন নিজের সম্পর্কের ব্যর্থতা বলে মনে হতে পারে। ফলে ভুলটি বোঝার বদলে সেটিকে ব্যাখ্যা দিয়ে আড়াল করার প্রবণতা তৈরি হয়।

ধরা যাক, আপনার সঙ্গী কর্মক্ষেত্রে কোনও গুরুতর ভুল করেছেন। বিষয়টি নিয়ে অন্যরা প্রশ্ন তুলছেন। আপনি চাইলে তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু যদি তার ভুলের কোনও দায়ই স্বীকার না করেন, বরং সবাইকে শত্রু ভাবতে শুরু করেন, তাহলে আপনি হয়তো তাকে সাহায্য করার বদলে ভুলটি আরও জটিল করে তুলছেন।

কাউকে ভালোবাসা মানে তার সব কাজকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং ভুল করলেও তাকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

‘আমাদের ভালোবাসা আলাদা’—এই বিশ্বাসের ফাঁদ

অনেক যুগল নিজেদের সম্পর্ককে অন্য সবার সম্পর্কের চেয়ে আলাদা ও বিশেষ বলে মনে করেন। এই অনুভূতি স্বাভাবিক। দুজন মানুষের মধ্যে এমন কিছু স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়া থাকে, যা বাইরের কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারেন না।

 

সমস্যা হয় যখন এই বিশেষত্বের ধারণা সম্পর্কের সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। তখন মনে হতে পারে, বাইরের কেউ আমাদের বুঝবে না; তাই অন্যদের কোনও প্রশ্ন বা সমালোচনাই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাস্তব জীবনে এমন পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে নানা ধরনের সম্পর্কে। কেউ সঙ্গীর বারবার মিথ্যা বলাকে ছোট করে দেখেন। কেউ ক্ষতিকর আচরণকে ‘ওর স্বভাবই এমন’ বলে মেনে নেন। আবার কেউ মনে করেন, সম্পর্কের বাইরে থাকা মানুষ তাদের বন্ধন বুঝতে পারবেন না বলে কোনও পরামর্শ শোনার প্রয়োজন নেই।

এভাবে সম্পর্ককে রক্ষা করতে গিয়ে মানুষ কখনও নিজের অস্বস্তি, উদ্বেগ কিংবা যুক্তিসংগত প্রশ্নগুলোকেও উপেক্ষা করতে শুরু করেন।

দুজন মিলে একই ভুলকে সত্য ভাবলে

মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ফলি আ দ্যু’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। ফরাসি শব্দবন্ধটির অর্থ মোটামুটি ‘দুজনের বিভ্রান্তি’। ১৮৭৭ সালে ফরাসি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শার্ল লাসেগ ও জুল ফালরে এমন পরিস্থিতি বর্ণনা করেন, যেখানে দুজন মানুষের মধ্যে একজনের বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস অন্যজনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ধারণাটি দিয়ে প্রতিটি যুগলের মতের মিল বা পরস্পরের প্রতি সমর্থনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: কাছের মানুষের বিশ্বাস কি কখনও আমাদের নিজেদের বিচারবোধকেও প্রভাবিত করতে পারে?

সম্পর্কে দুজন মানুষ যখন বারবার একে অপরের ধারণাকে সমর্থন করেন, তখন নিজেদের বিশ্বাস নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ কমে যেতে পারে। বাইরের কেউ প্রশ্ন তুললে তারা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বদলে একে অপরকে আশ্বস্ত করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন।

তবে একে অপরকে সমর্থন করা নিজে কোনও সমস্যা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই সমর্থন কি দুজনকে বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করছে, নাকি অস্বস্তিকর সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে?

সঙ্গীর ভুল ধরিয়ে দিলে কি ভালোবাসা কমে যায়?

অনেকেই সম্পর্কের মধ্যে কঠিন কথা বলতে ভয় পান। মনে করেন, সঙ্গীর ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি কষ্ট পাবেন, রেগে যাবেন কিংবা সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। তাই সমস্যাটি নিয়ে কথা না বলে চুপ থাকাই সহজ মনে হয়।

কিন্তু সবসময় চুপ থাকা সম্পর্কের জন্য ভালো নয়। কোনও আচরণ বারবার কষ্ট দিলে, বিশ্বাসে আঘাত লাগলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া হলে তা নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন।

অবশ্য ভুল ধরিয়ে দেওয়ারও ধরন আছে। অপমান করা, দোষারোপ করা কিংবা সঙ্গীকে ছোট করার বদলে নিজের উদ্বেগ স্পষ্টভাবে জানানো যায়। তার বক্তব্যও শোনা যায়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কে জিতল, তা প্রমাণ করা নয়; বরং সমস্যাটি বোঝা এবং সমাধানের পথ খোঁজা।

একটি সম্পর্কের শক্তি শুধু কতটা ভালোবাসা আছে, তার ওপর নির্ভর করে না। সেখানে দুজন মানুষ কতটা সততার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, মতের অমিল সহ্য করতে পারেন এবং ভুল থেকে শিখতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভালোবাসা হোক সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস

ভালোবাসার মানুষটি আমাদের কাছে আশ্রয় হতে পারেন। তার কাছে আমরা দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারি, ব্যর্থতার কথা বলতে পারি, কঠিন সময়েও ভরসা খুঁজে পাই। কিন্তু সেই আশ্রয় যদি বাস্তবতা অস্বীকার করার জায়গা হয়ে ওঠে, তাহলে সম্পর্কটি সমস্যার সমাধান না করে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তাই নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা জরুরি: আমি কি সঙ্গীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি? তার ভুল নিয়ে কথা বললে কি সম্পর্ক হারানোর ভয় কাজ করে? বাইরের কেউ যুক্তিসংগত উদ্বেগ জানালে আমি কি তা শুনতে পারি? নাকি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সব অস্বস্তিকর বিষয় এড়িয়ে যাই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সম্পর্কের প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

কারও পাশে থাকা আর তার প্রতিটি কাজকে সমর্থন করা এক নয়। ভালোবাসা মানে সবসময় একমত থাকা নয়, বরং মতের অমিল থাকলেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা।

কারণ, সত্যিকারের ভালোবাসা চোখ বন্ধ করে রাখতে শেখায় না; বরং সত্য দেখার পরও কীভাবে একে অপরের পাশে থাকা যায়, তা শেখায়।