বিভিন্ন শারীরিক অবস্থায় রোজা

ইফতার

আমার নানী খুব পরহেজগার একজন মানুষ। ওনার মতো জেনে বুঝে মনোযোগ দিয়ে নামাজ রোজা করতে আমি খুব কম মানুষকে দেখেছি। সেই মানুষটাকে দেখেছিলাম, খুব মন খারাপ করতে যখন ওনার ডায়াবেটিস ধরা পড়লো। উনি ভেবেই পাচ্ছিলেন না কি করে উনি এর মাঝে রোজা থাকবেন। পরে যখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন নিয়ম মেনে রোজা পালন করলে সাধারণত সমস্যা হয় না, বরং রোজা রাখলে শরীরের উপকার হয়, কি যে খুশি হয়েছিলেন! আমি নিশ্চিত উনার মতন অনেকেই এমনটা ভাবেন। সত্যি বলতে কি, যদিও রোজা রাখলে প্রথম কিছুদিন কিছু সমস্যা হতে পায়ে, কিন্তু সঠিক নিয়মে ঘুম এবং খাবার গ্রহণ করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোজাতে কষ্ট হবার কথা না। আসুন জেনে নেই বিভিন্ন শারীরিক অবস্থায় রোজা রাখতে হলে কি করতে হবে।

প্রসূতি মায়ের রোজা

অনেকে মনে করেন, রোজা রাখলে বুকের দুধ কমে যেতে পারে, ফলে সন্তান দুধ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এ কথাটি একদমই ভুল, কেননা রোজা রাখলে বুকের দুধ কমার কোনও আশঙ্কা নেই। তবে প্রসূতি মাকে এটা মনে করে অবশ্যই সেহরি ও ইফতারের সময় প্রচুর তরল খাবার খেতে হবে এবং ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যন্ত ঘণ্টায় ঘণ্টায় অল্প অল্প করে পানি বা তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে।

বয়স্কদের রোজা

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বয়স্ক ব্যক্তিদের শারীরিক অসুস্থতা থাকার প্রবণতা বেশি থাকে এবং তাদের বয়সের সাথে সাথে উনাদের খাবার গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে উনাদের খাবার হতে হবে সহজপাচ্য ও নরম। ইফতারে ছোলা ভাঁজা আমাদের চাই ই চাই, কিন্তু যদি ছোলা হজমে বা চিবাতে অসুবিধা হয় তাহলে ঘুঘনি, চটপটি দেয়া যেতে পারে। এছাড়া ভিজানো চিড়া, নুডলস, হালিম, দুধ-সুজি, দুধ-সেমাই এগুলোও ইফতারিতে দেওয়া যেতে পারে। সেহরিতে দুধ-ভাত-কলা দিলে ভালো হয়। তাদের রমজানের খাবার এমন হবে যাতে শরীর ঠিক থাকে, আবার যাদের অসুস্থতা রয়েছে সেই অসুখ বুঝেও ইফতারি দিতে হবে।

হৃদরোগীদের রোজা

রোজার সময় ইফতারিতে যেসব উপাদান থাকে তা প্রায়ই ডুবো তেলে ভাজা হয়, যার সবই ট্রান্সফ্যাট, যা রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং তা হৃদরোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়। এ কারণে ইফতারিতে ডুবো তেলে ভাজা খাবার পরিহার করে ইফতারির প্লেট সাজানো উচিত। হৃদরোগীর ক্ষেত্রে শরবত কোনো ক্ষতিকারক উপাদান নয় তবে, তাজা ফলের রস হলে আরও ভালো হয়। এছাড়া থাকতে পারে ছোলা ভাজা, ঘুঘনি, কুসুমবিহীন সিদ্ধ বা পোচ ডিম। নরম খিচুড়ি, ঘি-চর্বি ছাড়া হালিম, নুডলস, চিঁড়ার পোলাও। ননস্টিক ফ্লাইপ্যানে তৈরি পেঁয়াজু, আলুর চপ, যে কোনো বড়া খাওয়া যেতে পারে। সন্ধ্যারাতে ভাত-মাছ-সবজি এবং ভোররাতে ভাত-মুরগির মাংস বা মাছ-ডাল-সবজি থাকা উচিত। দুধ পান করতে চাইলে ননীবিহীন দুধ খাওয়া ভালো। যা কিছুই খাওয়া হোক না কেন খাবারে পর্যাপ্ত পানি থাকা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা

ডায়াবেটিস থাকলে ইফতারের শরবতের পরিবর্তে ডাবের পানি অথবা বিকল্প চিনি দিয়ে লেবুর শরবত, ইসবগুলের শরবত, তোকমার শরবত, তেঁতুলের শরবত খাওয়া যেতে পারে। ছোলা-পেঁয়াজুর পাশাপাশি মুড়ি বা চিঁড়া বা ফ্রায়েড রাইস অথবা খিচুড়ি চলবে। অর্থাৎ যে কোনো একটি শর্করাজাতীয় খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ দিনে সকালের নাশতায় যতটুকু শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার কথা ছিল ইফতারিতে ঠিক ততটুকুই কার্বোহাইড্রেট খেতে হবে। মিষ্টি ফল যেমন-খেজুর, আম, কমলা, আপেল, কলা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বলা যায় যদি রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে যে কোনো একটি ফল পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে। টক ফল যেমন-আমড়া, কামরাঙ্গা ইত্যাদি রুচি অনুযায়ী খাওয়া যাবে। সন্ধ্যারাতে কেউ রুটি খেতে না চাইলে ভাত খেতে পারেন, তবে এ সময় ডাল বাদ দিলে ভালো হয়, কারণ ইফতারিতে ডালের তৈরি খাবারই বেশি খাওয়া হয়। সেহরিতে ভাত মাছ বা মাংস এবং সবজির সঙ্গে ডাল খাওয়া যেতে পারে। তবে যদি এ সময় দুধ খাওয়া হয় তাহলে ডাল বাদ দিলে ভালো হয়। আর যাদের ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স আছে তারা সয়াদুধ খেতে পারেন। মনে রাখতে হবে অন্যদিনে পাঁচ থেকে ছয়বার যতটুকু খাবার খাওয়া হতো সেই পরিমাণ খাবারই ইফতার, সন্ধ্যারাতে ও সেহরিতে খেতে হবে। আবার কোনো বেলার খাবার বাদও দেয়া যাবে না। তাহলে রক্তশর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

ইউরিক এসিড ও রোজা

রোজার সময় ইফতারির উপাদানগুলো বেশির ভাগই ডাল দিয়ে তৈরি হয় ফলে রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে গিয়ে বাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যথা বেড়ে যায়। এ কারণে সতর্কতার সঙ্গে ডাল অবশ্যই বাদ দিতে হবে। তাদের খাবার তৈরি করতে হবে ময়দা, চালের গুঁড়া, সুজি ইত্যাদি দিয়ে। এছাড়া তারা খেতে পারেন চিড়া, মুড়ি, নুডলস, দুধ, দই, ফ্রায়েড রাইস, ফল, শরবত ইত্যাদি। এ ধরনের রোগীর নিষিদ্ধ খাবার হলো সব রকমের ডাল, ছোলা, বেসন, মটর, মটরশুঁটি, সিমের বিচি, বরবটি, বেগুন, পালংশাক, পুঁইশাক, মাশরুম, আতাফল, সমুদ্রের মাছ এবং কাঁটাসহ ছোট মাছ। এদের ঘি, মাখন, মাছের ডিম, মাংসের চর্বি, মাংসের স্যুপ বাদ দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন ইফতারিতে আনারস রাখতে পারলে বাতের জন্য উপকার পাবেন।

/এফএএন/