চাল তো নয় যেন হীরা: জানুন দাম, স্বাদ ও সৃষ্টির গল্প

এই সপ্তাহের সিএনএন ভ্রমণ বিভাগে উঠে এসেছে নানা বিচিত্র গল্প। এরমধ্যে চোখ আটকালো বিশ্বের সবচেয়ে দামি চালের গল্পে। এই চালের নাম ‘কিনমেমাই প্রিমিয়াম’। এই চালকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি চাল হিসেবে। জাপানে বছরে মাত্র ১ হাজার বাক্স তৈরি হয় এই চালের, প্রতিটির দাম প্রায় ৭৩ আমেরিকান ডলার বা প্রায় ৯ হাজার টাকা!

এতো দাম হওয়ার কারণ কী

টোয়ো রাইস করপোরেশনের ৯১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট কেইজি সাইকার ভাষায়, স্বাদ ও টেক্সচারের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত সেরা ধানের জাত বাছাই করা হয়। এরপর পরীক্ষা করা হয় দানার এনজাইম লেভেল। যাকে তিনি বলেন চালের ‘ভাইটালিটি’ বা ‘লাইফ ফোর্স’।

একজন শেফ সিএনএন–কে জানান, এই চালের দানাগুলো এতটাই চকচকে দেখতে, যা ‘হীরের মতো’ লাগে। তবে স্বাদের পরীক্ষায় এটি কতটা ব্যতিক্রম, তা জানতে হলে পুরো ফিচারটি পড়তে হবে।শেফ ফুজিমতো কিনমেমাই প্রিমিয়াম চালের ভাত চেখে দেখছেনদাম, স্বাদ ও সৃষ্টির গল্প

সোনালি অক্ষরে লেখা ‌‘‘ওয়ার্লড’স বেস্ট রাইস’’ খোদাই করা একটি কালো বাক্স হাতে নিয়ে জাপানি শেফ কেনিচি ফুজিমোতো সামান্য সন্দেহের হাসি হাসলেন। হংকংভিত্তিক ‘সুশি ফুজিমোতো’ রেস্তোরাঁর মালিক এই শেফ বললেন, ‘এ ধরনের জিনিস অনেক সময় খুব বাণিজ্যিক হয়, কিন্তু সবসময় যে খুব ভালো তা নয়।’ 

তার রান্নাঘরে ফুটতে থাকা চালের হাঁড়ির দিকে ইশারা করে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

বিশ্বখ্যাত সুশি মাস্টারদের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় কাজ করা ফুজিমোতো অসংখ্য ধরনের চাল দেখেছেন। তবে এমন চাল তিনি আগে দেখেননি। উৎপাদকদের দাবি ‘কিনমেমাই প্রিমিয়াম’ শুধু বিশ্বের সেরা চালই নয়, ২০১৬ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস একে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি চাল হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়।

এই দাবি কতটা সত্য? তা যাচাই করতেই সিএনএন ফুজিমোতোকে দিয়ে স্বাদ পরীক্ষা করায়। ধুয়ে ও ভিজিয়ে নেওয়া চাল কাস্ট-আয়রন পাত্রে রান্না করা হচ্ছে—একজন জাপানি শেফের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ফুজিমোতো বলেন, “চাল জাপানের ‘সোল ফুড’। ভালো সুশির ৮০ শতাংশই নির্ভর করে চালের ওপর, মাছ মাত্র ২০ শতাংশ।”

চুলোর দিকে তাকিয়ে ‘আর ১৫ মিনিট পরই বোঝা যাবে’,—বললেন তিনি।কিনমেমাই প্রিমিয়াম চালের বাক্সবছরে মাত্র ১ হাজার বাক্স

জাপানে প্রায় ৩,০০০ বছর ধরে চাল প্রধান খাদ্য। বর্তমানে দেশজুড়ে ৩০০–এর বেশি জাতের ধান চাষ হয়, নতুন জাতও তৈরি হচ্ছে নিয়মিত। সুশি, মোচি, সাকে—জাপানি চালভিত্তিক খাবার বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হলেও রপ্তানিতে তেমন সাফল্য পায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে সামনে আসেন টয়ো রাইস কর্পোরেশনের ৯১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট কেইজি সাইকা। ২০১৬ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে জাপানি চালকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেন। ওয়াকায়ামাভিত্তিক তার প্রতিষ্ঠান চালের মিলিং মেশিনের পাশাপাশি তৈরি করে কিনমেমাই—যার অর্থ ‘গোল্ডেন স্প্রাউট রাইস’—পুষ্টিগুণ ও স্বাদের জন্য পরিচিত।

সাইকা বলেন, ‘জাপানি চাল কতটা অসাধারণ, এটি আন্তর্জাতিক মহলে আরও ভালোভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল।’

সেই বছরই বাজারে আসে কিনমেমাই প্রিমিয়াম। ৮৪০ গ্রাম বাক্সের দাম ৯,৪৯৬ ইয়েন (২০১৬ সালে প্রায় ৬০ মার্কিন ডলার প্রতি কেজি)। তখন সাধারণ চালের দাম ছিল কেজিতে ৩০০–৪০০ ইয়েন। তবু অবাক করার মতো চাহিদা তৈরি হয়।

এখন এটি বার্ষিক সীমিত সংস্করণ—প্রতি বছর মাত্র ১ হাজার বাক্স, চলতি বছরে দাম ১০,৮০০ ইয়েন (প্রায় ৭৩ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৯ হাজার টাকা প্রতি কেজি)।চালের প্যাকেট হাতে টয়ো রাইচ করপোরেশনের প্রধান কেইজি সাইকালাভের জন্য নয়

২০২৬ সালে প্রকল্পের ১০ বছর পূর্তি সামনে রেখে সাইকা বলেন, এই চাল থেকে লাভ করাই লক্ষ্য ছিল না। ‘খরচ হিসাব করলে সম্ভবত আমরা লোকসানেই আছি’,—স্বীকার করেন তিনি। মূল উদ্দেশ্য জাপানি চালের মান ও পরিচিতি বাড়ানো এবং কৃষকদের উন্নত জাত চাষে উৎসাহ দেওয়া।

৯০-এর দশকে তিনি ‘রিন্স-ফ্রি রাইস’ উদ্ভাবন করেন পানি সাশ্রয়ের জন্য, পরে পুষ্টি ও স্বাদ ধরে রাখতে নতুন মিলিং প্রযুক্তি আনেন।

কিনমেমাই প্রিমিয়াম তৈরির প্রক্রিয়া আরও জটিল। প্রায় ৫,০০০ এন্ট্রি থেকে প্রতি বছর ৪–৬টি পুরস্কারজয়ী জাত বাছাই করা হয়। স্বাদ ও টেক্সচারের পাশাপাশি এনজাইম কার্যক্রম দিয়ে শস্যের ‘ভাইটালিটি’ বা জীবনীশক্তি পরীক্ষা করা হয়। সবচেয়ে শক্তিশালী দানাই নির্বাচিত হয়, এরপর কয়েক মাস ‘এজিং’ করা হয়—যাতে স্বাদ আরও সমৃদ্ধ হয়।

এই জটিল প্রক্রিয়া ও সীমিত সরবরাহই চালটিকে ব্যয়বহুল করে তোলে। সাধারণত এটি বিলাসবহুল উপহার বা বিশেষ উপলক্ষে ব্যবহৃত হয়। নির্বাচিত কৃষকদের টোকিওতে এনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়—যা তাদের জন্য বড় সম্মানের।

চলতি সংস্করণে চারটি জাতের মিশ্রণ—গিফু ও নাগানো থেকে দুই ধরনের কোশিহিকারি এবং একই দুই অঞ্চল থেকে ইউদাই ২১।জমিতে ধান বুনছেন জাপানের কৃষকরা, ১৯০০-১৯২০ সালের ছবিশৈশবের ক্ষুধা থেকে অনুপ্রেরণা

সাইকার চালপ্রেমের শিকড় শৈশবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জাপানে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়; টাইফুন মাকুরাজাকি কৃষিজমি ধ্বংস করে। ‘অনেকে অনাহারে মারা গিয়েছিলেন, উচ্চপদস্থ মানুষও’,—স্মরণ করেন তিনি। তার পরিবার বীজ বপন ও মাছ–পাখি ধরে বেঁচে ছিল। সেই অভিজ্ঞতাই ভালো মানের চাল উৎপাদনের সংকল্প জাগায়।

আজও তিনি বছরে মাত্র একবার সামান্য পরিমাণ কিনমেমাই প্রিমিয়াম চালের স্বাদ নেন।

স্বাদ পরীক্ষায় কী বললেন শেফরা

টোয়ো রাইসের ইন-হাউস সুশি রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ হিরোশি মাতসুমোতো প্রথমবার খেয়েই মুগ্ধ, ‘এক বাটি যথেষ্ট মনে হয়নি।’ তবে তিনি এটিকে সুশির সঙ্গে নয়, গরম ভাত হিসেবে পরিবেশন করাই ভালো বলেন।

ফুজিমোতোর রান্নাঘরে পরীক্ষায় চালের রং পরিষ্কার, দানা ঝকঝকে ‘হীরার মতো’—এমন মন্তব্য করেন তিনি। স্বাদে ভারসাম্য, টেক্সচার ভালো, আর্দ্রতা যথাযথ, ‘সবারই ভালো লাগবে।’ তবে দাম বেশি হওয়ায় রেস্তোরাঁয় ব্যবহার করা সম্ভব নয়, ‘তাহলে দাম তিনগুণ করতে হবে।’একজন শেফ চাল নিয়ে গবেষণা করছেনহংকংয়ের শেফ ন্যানসেন লাই নিজের থাই–জাপানি মিশ্রণের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এটি তুলনামূলক আঠালো, সুগন্ধ কম, তবে স্বাদ অনেক বেশি জটিল ও সমৃদ্ধ, ‘এতটাই সুস্বাদু যে সাদা ভাত হিসেবেই খাওয়া যায়।’

দু’জন শেফই মনে করেন, এমন উদ্যোগ কৃষকদের উৎসাহ দেয়। কারণ বাড়তি খরচ সত্ত্বেও বহু বছর ধরে চালের দাম তেমন বাড়েনি, ফলে অনেক কৃষকই টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে

৯১ বছর বয়সেও সাইকা প্রতিদিন কাজে যান। তার মতে, সুস্থ থাকার রহস্য ‘চাল’। ‘আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা জাপানের ভবিষ্যৎ’, বলেন তিনি। ‘আর যতদিন বাঁচি, সমাজের কাজে লাগে এমন কিছু উদ্ভাবন করতে চাই।’, যোগ করেন তিনি।

‘কিনমেমাই প্রিমিয়াম’ শুধু একটি বিলাসবহুল খাদ্য নয়; জাপানি চালের মর্যাদা, কৃষকের প্রেরণা এবং একজন মানুষের আজীবন আবেগের প্রতীক হিসেবেই এটি আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত চাল নয় ‘হীরা’।