পুরোনো বাড়ির গাম্ভীর্য আর আধুনিক নকশার প্রাণবন্ত রঙ দুইয়ের মেলবন্ধনে বদলে গেছে ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনার ১৯০৮ সালের একটি ক্রাফটসম্যান বাড়ি। গাঢ় কাঠের ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই বাড়িটিতে যোগ হয়েছে গোলাপি-সবুজের রঙের ছোঁয়া, বৈচিত্র্যময় ওয়ালপেপার, ভিনটেজ আসবাব ও শিল্পকর্ম। ফলে সময়ের ছাপ ধরে রেখেও বাড়িটি ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ ও বাসিন্দার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।
অ্যানিমেটেড টিভি শো, সিনেমা ও ভিডিও গেমে ২,৫০০-এর বেশি চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন গ্রে ডিলাইল। ‘দ্য লাউড হাউস’, ‘স্কুবি-ডু’ ও ‘দ্য সিম্পসনস’-এর মতো জনপ্রিয় কাজের জন্য পরিচিত এই শিল্পীর কণ্ঠ যেমন প্রাণবন্ত, তার প্যাসাডেনার বাড়িটিও তেমনি রঙিন, উচ্ছল ও ব্যক্তিত্বময়।
১৯০৮ সালে নির্মিত এই ক্রাফটসম্যান বাড়ির বাইরের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে স্যাজ সবুজ ও স্যামন গোলাপির বিভিন্ন শেড। ভেতরে অক্ষত রাখা হয়েছে বাড়িটির মূল গাঢ় কাঠের ওয়েইনস্কোটিং। তবে সেই কাঠের গাম্ভীর্যকে ভারসাম্য দিতে দেয়াল ও ছাদজুড়ে ব্যবহার করা হয়েছে সাহসী ও বৈচিত্র্যময় নকশার ওয়ালপেপার।
বাড়িটির প্রতিটি ঘরেই যেন আলাদা গল্প। রান্নাঘরের নকশার অন্যতম অনুপ্রেরণা ১৯৪০-এর দশকের একটি লাল ও’কিফ অ্যান্ড মেরিট চুলা। আর খাবার ঘরের কেন্দ্রে রয়েছে ‘স্লিম’ নামের মানুষের সমান উচ্চতার কাঠের কাউবয় ভাস্কর্য। ২৪ বছর বয়সে কেনা এই ভাস্কর্যটি ডিলাইলের কাছে শুধু একটি সাজসজ্জার সামগ্রী নয়, বরং দীর্ঘদিনের সঙ্গী।
ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিল রেখে সাজানো বাড়ি
দক্ষ গায়িকা ও গীতিকার হিসেবেও পরিচিত ডিলাইল বাড়িটির সংস্কার করেছেন ২২ ইন্টেরিয়র্স-এর প্রতিষ্ঠাতা লুসি আয়ার্সের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটির কাজ সাধারণত পরিশীলিত, উচ্চমানের ও নিরপেক্ষ রঙনির্ভর হলেও ডিলাইলের বাড়ির ক্ষেত্রে সেই পরিচিত ধারা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছেন আয়ার্স।
লস অ্যাঞ্জেলেস ও ন্যাশভিলে ডিলাইলের বিভিন্ন বাড়ি নিয়ে ১২ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করতে করতে দুজনের নকশার দর্শনের মধ্যেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের ভারসাম্য।
আয়ার্স বলেন, “তিনি রং নিয়ে একদমই ভয় পান না। ডিলাইল প্রাচীন জিনিসপত্র ও শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেন। তার সংগ্রহে রয়েছে ক্রমেই বড় হতে থাকা আঁকা নগ্নচিত্রের সংগ্রহও। তার সঙ্গে কাজ করা সবসময়ই ভীষণ আনন্দের এবং সৃজনশীলভাবে উদ্দীপনাময়।”
প্যাসাডেনার এই বাড়ির সংস্কার শুরু করার সময় আয়ার্স জানতেন, বাড়িটির নকশায় ডিলাইলের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, “আমি জানতাম, এই বাড়ির ভেতরের পরিবেশে তার মতোই প্রচুর ব্যক্তিত্ব থাকতে হবে। এটি হতে হবে রঙিন, উজ্জ্বল ও আনন্দময়। তবে ক্রাফটসম্যান বাড়িতে মূল গাঢ় কাঠের কাজগুলো অক্ষত রেখে এমন পরিবেশ তৈরি করা মোটেই সহজ নয়।”
বড় বাড়ি ছেড়ে পুরোনো ঠিকানায় ফেরা
২০০৭ সালে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে ২,০০০ বর্গফুটের এই বাড়িটি ১৫ লাখ ডলারে কিনেছিলেন ডিলাইল। কয়েক বছর পর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ডিলাইলের ভাষায়, সেটি ছিল “অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ বিবাহবিচ্ছেদ”। বড় ছেলেকে বাড়ি বদলের ঝামেলায় ফেলতে না চেয়ে তিনি নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তার সাবেক স্বামী ও ছেলে থেকে যান প্যাসাডেনার বাড়িতেই।
পরবর্তী সময়ে ডিলাইল আবার বিয়ে করেন, আরও দুই সন্তানের মা হন এবং প্রায় ৪,৩০০ বর্গফুটের বড় একটি বাড়িতে চলে যান ক্যালিফোর্নিয়ার গ্লেনডেলে। বাড়িটির পেছনে দুটি অ্যাক্সেসরি ডুয়েলিং ইউনিট (এডিইউ) নির্মাণ করে সেগুলো ভাড়া দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে বন্ধকী ঋণের খরচ কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো।
তবে বছর দুয়েক আগে পরিস্থিতি বদলে যায়। একাধিক ভাড়াটে থাকার কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব তাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। একই সময়ে তার সাবেক স্বামীও প্যাসাডেনার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ডিলাইল যখন পুরোনো বাড়িটি বিক্রি করার কথা ভাবছিলেন, তখন বড় ছেলে এতে আপত্তি জানায়। ছেলের কথা শুনে ডিলাইলও সিদ্ধান্ত বদলান।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি গ্লেনডেলের বাড়িটি বিক্রি করে দুই ছোট সন্তান বর্তমানে ৯ ও ১২ বছর বয়সীকে নিয়ে প্যাসাডেনার পুরোনো বাড়িতে ফিরে আসেন।
রঙে রঙে নতুন জীবন
ফিরে এসে বাড়িটির বাইরের অংশে নতুন করে গোলাপি ও সবুজ রঙের সমন্বয় করা হয়। পুরোনো লন তুলে তার জায়গায় তৈরি করা হয় পানি সাশ্রয়ী ল্যান্ডস্কেপ। স্থানীয় প্রজাতির গাছপালা, পাথরের পেভার ও নুড়ি দিয়ে সাজানো হয় বাইরের অংশ।
ভেতরে ফোয়ারের ওপরের দেয়াল ও ছাদে ১৮৭৬ সালে উইলিয়াম মরিসের নকশা করা একটি ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনের প্রাণবন্ত হানিসাকল অ্যান্ড টিউলিপ ওয়ালপেপার ব্যবহার করা হয়েছে।
বসার ঘরে রাখা হয়েছে ডিলাইলের জুকবক্স। দেয়ালে লাগানো জ্যাক + ফক্স-এর ওয়ালপেপারের নকশায় ফুটে উঠেছে আইভি লতার আবহ। এর সঙ্গে রয়েছে গাঢ় লাল ভেলভেটের সোফা এবং ইকাট-অনুপ্রাণিত পিয়ের ফ্রে কাপড়ে মোড়ানো একটি আরামকেদারা।
খাবার ঘরে রয়েছে সেই পরিচিত Slim ভাস্কর্য। ছাদে জ্যামিতিক নকশার স্কালামান্দ্রে ওয়ালপেপার এবং ওপরে ঝুলছে সোহো হোম-এর সবুজ কাচের টিউব দিয়ে তৈরি বড় ঝাড়বাতি।
রান্নাঘরেও রঙের ছড়াছড়ি। ভিনটেজ চুলাটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে স্মেগ-এর লাল রঙের রেট্রো-স্টাইলের ফ্রিজ ও ডিশওয়াশার আনা হয়েছে। দেয়ালে নীল ও লালের বিভিন্ন শেডের কাস্টম ফায়ারক্লে টাইল, আর মেঝেতে ব্যবহার করা হয়েছে হলুদ ও সাদা টাইল।
গাঢ় রঙের অন্তরঙ্গ শয়নকক্ষ
বাড়িটিতে আগে আলাদা কোনও মাস্টার স্যুট ছিল না। তাই আয়ার্স দেয়ালের কাঠামোতে পরিবর্তন এনে একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টার স্যুট তৈরি করেন।
মাস্টার বেডরুমে রাখা হয়েছে গাঢ় অবারজিন রঙের দেয়াল, ফুলেল নকশার ওয়ালপেপারে ঢাকা ছাদ এবং টাফটেড টিল-রঙের ভেলভেট হেডবোর্ড। দেয়ালজুড়ে রয়েছে ডিলাইলের সংগ্রহ করা অসংখ্য নগ্নচিত্র।
নতুন আসবাবপত্রসহ পুরো বাড়িটি সংস্কার করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ডলার। এখন বাড়িটির প্রতিটি কোণে রয়েছে বিলাসিতা, উষ্ণতা ও ব্যক্তিগত রুচির ছাপ, যা ডিলাইলের জীবনযাপনের সঙ্গেও যেন পুরোপুরি মিলে যায়।
অন্যরা যখন আরামদায়ক অ্যাথলেইজার পোশাক বেছে নেন, ডিলাইল তখনও ভিনটেজ ইভনিং গাউন পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই বাড়িটিও যেন তার সেই ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি, যার রক্ষণশীল স্থাপত্যের ভেতরে সাহসী রং, পুরোনো জিনিসের সঙ্গে নতুন নকশা, আর প্রতিটি ঘরে ব্যক্তিগত গল্পের উপস্থিতি।