কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকা মানেই ব্যস্ততা, কেনাকাটা, খাবারের দোকান আর পর্যটকদের ভিড়। এর আশপাশের ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সুদার স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট ও রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য হোটেল, লজ ও গেস্টহাউস। চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা কেনাকাটার কাজে কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশি পর্যটকদেরও এই এলাকার আবাসনগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা রয়েছে।
কিন্তু বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সেই হোটেলপাড়ার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুনে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। ছয়জন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও ঘটনাটিতে অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তাদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানা গেছে। আগুনের পাশাপাশি ঘন ধোঁয়া পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে।
এই দুর্ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ নিউ মার্কেট–ফ্রি স্কুল স্ট্রিট–সুদার স্ট্রিট এলাকায় ছোট হোটেল ও গেস্টহাউসের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২২ সালে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি গেস্টহাউসে আগুনের পর পশ্চিমবঙ্গ দমকল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সেখানে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ওই সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, এলাকার বহু পুরোনো ভবনে একাধিক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নেই এবং অনেক আবাসনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।
অর্থাৎ, আজকের দুর্ঘটনার আগে থেকেই এই এলাকার আবাসন ব্যবসার সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ইতিহাস রয়েছে।
পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্রীয় কলকাতার কয়েকটি এলাকায় হোটেল ও গেস্টহাউসের ঘনত্ব বেশি। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সুদার স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট ও রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের আশপাশে গত কয়েক দশকে প্রচুর আবাসিক ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এসব আবাসনের একটি বড় অংশের গ্রাহক হিসেবে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা, ব্যবসা ও পর্যটনের কাজে আসা মানুষরা।
এই এলাকার সমস্যা শুধু হোটেলের ভেতরের নিরাপত্তা নয়। সরু রাস্তা, ঘনবসতি, পুরোনো ভবন, অবৈধ নির্মাণ কিংবা রাস্তা দখল করে ব্যবসা চললে আগুন লাগার পর দমকলের গাড়ি ও উদ্ধারকারী দলের প্রবেশও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালের রিতুরাজ হোটেল অগ্নিকাণ্ডের পর বুররাবাজার এলাকায় এমন সমস্যাই সামনে এসেছিল। ওই আগুনে ১৪ জন মারা যান। তদন্তে জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ, কাজ না করা অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জানালা বন্ধ করে দেওয়া এবং দাহ্য সামগ্রী জমিয়ে রাখার মতো গুরুতর অনিয়মের কথা উঠে আসে।
২০২৫ সালের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম শহরের সব ছাদে থাকা রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়।
এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি কমিটি গঠন করে। মেয়রের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটিতে রাজ্যের ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস মন্ত্রী ও কলকাতা পুলিশ কমিশনারও ছিলেন। হোটেল, রেস্তোরাঁ, কারখানা ও অন্যান্য ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ব্যবস্থার সমন্বয় আরও কার্যকর করার বিষয়টি কমিটির আলোচনায় ছিল।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাজ্যের ফায়ার সেফটি টাস্কফোর্সের পরিধি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্তের খবরও প্রকাশিত হয়। বাজার ও ছাদে থাকা রেস্তোরাঁর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন, শপিং মল, হাসপাতাল ও স্কুলকেও অগ্নিনিরাপত্তা অডিটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিঙ্গেল-উইন্ডো ব্যবস্থায় তিন তারকা পর্যন্ত হোটেলের জন্য ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট, ফায়ার সেফটি রেকমেন্ডেশন এবং ফায়ার লাইসেন্সের মতো অনুমোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেসের সরকারি ওয়েবসাইটেও হোটেল ভবনের জন্য আলাদা ফায়ার সেফটি গাইডলাইন রয়েছে।
কলকাতা পুরসভার নথিতেও হোটেল, রেস্তোরাঁ, গেস্টহাউস ও বারসহ ঘুমানোর ব্যবস্থা রয়েছে এমন আবাসনের ক্ষেত্রে ফায়ার বিভাগের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নিয়মের অভাব নেই। বড় প্রশ্ন হলো, নিয়মগুলো নিয়মিত পরীক্ষা ও বাস্তবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।
রিতুরাজ হোটেলের ঘটনায় ‘শুধু সার্টিফিকেট থাকলেই কি নিরাপদ’ এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এনেছিল। তদন্তে এমন একটি ভবনের ছবি উঠে আসে, যেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার একাধিক অংশ কার্যকর ছিল না এবং ভবনের কিছু পরিবর্তন নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করেছিল।
আরও উদ্বেগের বিষয়, অগ্নিকাণ্ডের পরও বুররাবাজার এলাকায় রাস্তা দখল, দাহ্য সামগ্রী মজুত এবং জরুরি পথ আটকে রাখার মতো সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে পরবর্তী প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এ থেকে স্পষ্ট যে, শুধু একবার পরিদর্শন বা একটি ফায়ার সার্টিফিকেট যথেষ্ট নয়। ভবনের ব্যবহার বদলেছে কি না, নতুন নির্মাণ হয়েছে কি না, জরুরি দরজা খোলা আছে কি না, অ্যালার্ম ও স্প্রিংকলার কাজ করছে কি না এসবও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের সামনে কয়েকটি কাজ জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সুদার স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড ও নিউ মার্কেট এলাকার প্রতিটি হোটেল-গেস্টহাউসের নতুন করে অগ্নিনিরাপত্তা অডিট করা।
দ্বিতীয়ত, যেসব আবাসনের ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
তৃতীয়ত, জরুরি বহির্গমন পথ, সিঁড়ি, জানালা ও দরজা বন্ধ বা দখল করে রাখা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা।
চতুর্থত, হোটেলকর্মীদের নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধার প্রশিক্ষণ দেওয়া।
পঞ্চমত, শুধু হোটেলের ভেতর নয়, আশপাশের সরু রাস্তা ও ফুটপাতও জরুরি পরিষেবার জন্য খোলা রাখা।
হোটেলে ওঠার সময় অতিথিরাও কয়েকটি বিষয় খেয়াল করতে পারেন। জরুরি সিঁড়ি কোথায়, বিকল্প বের হওয়ার পথ আছে কি না, কক্ষের দরজার কাছে ধোঁয়া শনাক্তকারী বা অ্যালার্ম আছে কি না এবং অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কোথায় রাখা হয়েছে—এসব জানা থাকলে বিপদের সময় মূল্যবান কয়েক মিনিট বাঁচতে পারে।
বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে বের হওয়ার অন্তত দুটি সম্ভাব্য পথ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
কলকাতায় হোটেলের সংখ্যা কম নয়, নিউ মার্কেট এলাকাতেও আবাসনের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। কিন্তু ‘কয়টি হোটেল ঝুঁকিপূর্ণ’ এর উত্তর শুধু হোটেলের সংখ্যা গুনে পাওয়া যাবে না। প্রতিটি ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করেই সেই তালিকা তৈরি করতে হবে।
২০২২ সালে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৫ সালে রিতুরাজ হোটেলের আগুনে ১৪ জনের মৃত্যু প্রশাসনিক নজরদারি ও প্রয়োগের দুর্বলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছিল। এরপর অডিট, কমিটি ও নতুন পদক্ষেপের কথা এসেছে। আর ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট আবারও একটি হোটেলে নয়জনের মৃত্যু দেখিয়ে দিলো কাগজে থাকা নিয়ম আর বাস্তবে নিশ্চিত করা নিরাপত্তার মধ্যে ব্যবধান থাকলে তার মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে।
সূত্র: রয়টার্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া, পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস, কলকাতা পুরসভা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংশ্লিষ্ট নথি।