আঙুল বা আঙুলের গাঁট ফোটানোর সেই পরিচিত ‘কট’ শব্দটি অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক, আবার কারও কাছে বিরক্তিকর। কেউ অভ্যাসবশত গাঁট ফোটান, কেউবা দীর্ঘক্ষণ কাজের পর আঙুলে হালকা আরাম পাওয়ার জন্য এটি করেন। কিন্তু এই ছোট্ট অভ্যাস নিয়ে বহুদিন ধরেই একটি ভয় প্রচলিত নিয়মিত গাঁট ফোটালে কি ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিস হতে পারে?
বিজ্ঞানের উত্তর বলছে, সাধারণভাবে না। এই ধারণার বিরুদ্ধে সবচেয়ে অদ্ভুত পরীক্ষাগুলোর একটি করেছিলেন মার্কিন চিকিৎসক ডোনাল্ড উঙ্গার। ছোটবেলা থেকেই তিনি শুনে আসছিলেন, গাঁট ফোটালে একদিন আর্থ্রাইটিস হবে। বিষয়টি যাচাই করতে তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে দিনে অন্তত দুবার নিজের বাঁ হাতের গাঁট ফোটাতেন। ডান হাতটি রাখতেন অক্ষত।
হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ দশকে বাঁ হাতের গাঁট প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০ বার ফোটানো হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে ৭২ বছর বয়সে দুই হাতের এক্স-রে করিয়ে তিনি দেখলেন, কোনো হাতেই আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ নেই। দুই হাতের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
অবশ্য একজন মানুষের ওপর করা এই পরীক্ষা দিয়ে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে পরবর্তী গবেষণাগুলোও মোটামুটি একই দিকেই ইঙ্গিত করেছে গাঁট ফোটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই।
গাঁট ফোটালে ‘কট’ শব্দটা হয় কীভাবে- এই প্রশ্ন অনেকের। আসলে শব্দটির পেছনে রয়েছে জয়েন্টের ভেতরের এক চমকপ্রদ প্রক্রিয়া। আঙুলের গাঁটসহ শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে থাকে সাইনোভিয়াল তরল। এটি অনেকটা পিচ্ছিলকারকের মতো কাজ করে, যাতে জয়েন্টের হাড়গুলো সহজে নড়াচড়া করতে পারে।
আঙুল টানলে, বাঁকালে বা মোচড়ালে জয়েন্টের ভেতরের ফাঁক সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। এতে সাইনোভিয়াল তরলের চাপ কমে যায় এবং তরলের মধ্যে দ্রবীভূত গ্যাস থেকে ছোট ছোট বুদবুদ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেই তৈরি হয় সেই পরিচিত ‘কট’ বা ‘ক্র্যাক’ শব্দ।
শব্দটি কিন্তু বেশ জোরালো হতে পারে। গবেষণায় একটি গাঁট ফোটানোর শব্দের তীব্রতা প্রায় ৮৩ ডেসিবেল পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা কাছ দিয়ে চলে যাওয়া একটি ডিজেল ট্রাকের শব্দের কাছাকাছি। এমনকি আল্ট্রাসাউন্ডে জয়েন্ট ফোটানোর মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ঘটনাটিকে আতশবাজি বিস্ফোরণের মতো দেখেছেন।
আঙুলের গাঁট ফোটানো নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভয় হলো, এতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হবে। কিন্তু গবেষণা সেই ভয়কে সমর্থন করে না।
১৯৭৫ সালের একটি গবেষণায় নিয়মিত গাঁট ফোটান এমন ২৮ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের ক্ষয়জনিত আর্থ্রাইটিসের হার গাঁট না ফোটানো ব্যক্তিদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা নয়।
আরও সাম্প্রতিক গবেষণাতেও একই ফল পাওয়া গেছে। অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ২১৫ জন রোগীর দীর্ঘদিনের গাঁট ফোটানোর অভ্যাস বিশ্লেষণ করেও দেখা যায়, কত বছর ধরে বা কত বেশি গাঁট ফোটানো হয়েছে, তার সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকির সম্পর্ক নেই।
অর্থাৎ, ‘গাঁট ফোটালে বয়স হলে আর্থ্রাইটিস হবেই’ এটি মূলত একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। সাধারণভাবে আঙুলের গাঁট ফোটানো ক্ষতিকর নয়। কিন্তু সমস্যা হতে পারে যখন কেউ অতিরিক্ত জোর প্রয়োগ করেন। বিশেষ করে আঙুলকে হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে টানা বা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানোর ফলে মচকানো কিংবা টেন্ডনে আঘাত লাগতে পারে। এমন ঘটনা বিরল হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নজির রয়েছে।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন দুজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যাঁরা জোর করে গাঁট ফোটাতে গিয়ে আঙুলে মচকানোর মতো চোট পেয়েছিলেন। তাই শুধু শব্দ বের করার জন্য অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা উচিত নয়। আর ব্যথা, ফোলা কিংবা জয়েন্ট নড়াচড়ায় সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে স্বাভাবিক গাঁট ফোটানোর ফল ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, নিয়মিত গাঁট ফোটালে হাতের গ্রিপ শক্তি কমে যায়। ১৯৯০ সালের একটি গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে গাঁট ফোটানোর অভ্যাস থাকা ৭৪ জন ব্যক্তির হাতে কিছুটা কম গ্রিপ শক্তি ও বেশি ফোলাভাব পাওয়া গিয়েছিল।
তবে ২০১৭ সালের আরেক গবেষণায় এই ফলাফল সমর্থন করা হয়নি। সেখানে গাঁট ফোটানো এবং গ্রিপ শক্তি কমে যাওয়ার মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
একইভাবে গাঁট ফোটালে আঙুলের গাঁট বড় হয়ে যায় বা টেন্ডন ঢিলে হয়ে যায়, এমন দাবিরও শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অনেকেই গাঁট ফোটানোর পর আঙুলে এক ধরনের হালকা স্বস্তি বা নড়াচড়ার সুবিধা অনুভব করেন। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, গাঁট ফোটানোর সময় জয়েন্ট সাময়িকভাবে প্রসারিত হয়। ফলে কিছুক্ষণের জন্য জয়েন্টের নড়াচড়ার পরিসর বাড়তে পারে।
আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় জয়েন্টের আশপাশের স্নায়ু উদ্দীপিত হয়ে পেশি কিছুটা শিথিল করতে পারে এবং ব্যথার অনুভূতি কমাতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যাটি এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
স্বাভাবিকভাবে গাঁট ফোটানো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর না হওয়ায় এটি বন্ধ করার চিকিৎসাগত প্রয়োজন সাধারণত নেই। তবে কেউ যদি অভ্যাসটি ছাড়তে চান, তাহলে প্রথমে খেয়াল করতে পারেন কখন গাঁট ফোটানোর প্রবণতা বেশি হয়। মানসিক চাপ, বিরক্তি, একঘেয়েমি কিংবা অজান্তে কারণটি চিহ্নিত করা গেলে অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে। হাত ব্যস্ত রাখার জন্য স্ট্রেস বল বা ফিজেট খেলনা ব্যবহার করাও কাজে লাগতে পারে।
আঙুলের গাঁট ফোটানোর শব্দ যতই অস্বস্তিকর বা ভয়ংকর শোনাক, স্বাভাবিকভাবে এই অভ্যাস করলে আর্থ্রাইটিস হওয়ার প্রমাণ নেই। হাতের শক্তি কমে যাওয়া, গাঁট বড় হয়ে যাওয়া বা টেন্ডন ঢিলে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার পক্ষেও শক্ত প্রমাণ নেই।
তবে গাঁট ফোটানোর সময় অতিরিক্ত জোর প্রয়োগ করা ঠিক নয়। আর কোনও জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা, আঘাত বা নড়াচড়ায় সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
শেষ পর্যন্ত নিয়মিত গাঁট ফোটানোর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়তো শরীরের নয়, পাশে বসা মানুষটির ধৈর্যের!
সূত্র: বিবিসি









