চায়ের কাপ থেকে শুরু করে পায়েস, হালুয়া কিংবা বিভিন্ন ঘরোয়া খাবার মিষ্টি স্বাদের জন্য রান্নাঘরে চিনির ব্যবহার বেশ পরিচিত। তবে খাবারে বাড়তি চিনি কমাতে চাইলে মিষ্টি স্বাদের জন্য সবসময় চিনির ওপর নির্ভর করতে হয় না। রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি কিংবা চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কয়েকটি উপকরণ।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, চিনির বিকল্প মানেই সবসময় স্বাস্থ্যকর বা সীমাহীনভাবে খাওয়া যায়, এমন নয়। গুড়, মধু, খেজুর বা খেজুরের সিরাপেও চিনি ও ক্যালরি থাকে। তাই পরিমাণের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
গুড়: চিনির বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে পরিচিত উপকরণগুলোর একটি হলো গুড়। আখ, খেজুর বা তালের রস থেকে তৈরি গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ খাবারে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
পায়েস, পিঠা, হালুয়া কিংবা বিভিন্ন মিষ্টি পদে গুড় ব্যবহার করা যায়। চা-কফিতেও অনেকে চিনির পরিবর্তে গুড় ব্যবহার করেন। গুঁড়ো গুড়, তরল গুড় কিংবা পাটালি, রান্নার ধরন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায় বিভিন্ন ধরনের গুড়।
তবে গুড়ও মূলত মিষ্টিকারক। তাই চিনির তুলনায় কিছু খনিজ উপাদান থাকলেও গুড়কে স্বাস্থ্যকর বলে ইচ্ছেমতো বেশি খাওয়া ঠিক নয়।
মধু: প্রাকৃতিক মিষ্টি হিসেবে মধুর ব্যবহার বহুদিনের। চা, দই, স্মুদি কিংবা বিভিন্ন খাবারে অল্প পরিমাণ মধু যোগ করলে মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়।
মধুর স্বাদ ও ঘ্রাণ খাবারের স্বাদেও পরিবর্তন আনে। তবে মধুতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিনি রয়েছে। তাই চিনির পরিবর্তে মধু ব্যবহার করলেও মোট মিষ্টি খাওয়ার পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
খেজুর: প্রাকৃতিকভাবেই মিষ্টি খেজুর চিনির ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে ভালো একটি উপকরণ হতে পারে। খেজুর সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি পায়েস, কেক, স্মুদি, চাটনি কিংবা বিভিন্ন মিষ্টি পদে ব্যবহার করা যায়।
খেজুরে ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে হলে বাড়তি চিনি দেওয়া খাবারের বদলে পরিমিত খেজুরও বেছে নেওয়া যেতে পারে।
নারকেলের চিনি: নারকেল গাছের ফুলের কুঁড়ি থেকে পাওয়া মিষ্টি রস প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় নারকেলের চিনি। এতে ক্যারামেলের মতো স্বাদ ও ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
পায়েস, ক্ষীর, হালুয়া কিংবা বিভিন্ন মিষ্টি পদে এটি ব্যবহার করা যায়। এতে কিছু খনিজ উপাদান থাকলেও এটি মিষ্টিকারকই। তাই সাধারণ চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করলেও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
মঙ্ক ফ্রুট: চিনির বিকল্প হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে মঙ্ক ফ্রুট বা লুও হান গুও-এর ব্যবহারও বাড়ছে। দক্ষিণ চীনে পরিচিত এই ছোট গোলাকার ফল থেকে মিষ্টিকারক তৈরি করা হয়।
মঙ্ক ফ্রুটের মিষ্টি স্বাদের পেছনে রয়েছে মোগ্রোসাইড নামের যৌগ। এর নির্যাস খুব অল্প পরিমাণেই মিষ্টি স্বাদ দিতে পারে এবং এতে সাধারণ চিনির মতো ক্যালরি থাকে না বললেই চলে।
তবে বাজারে পাওয়া মঙ্ক ফ্রুট সুইটনারের উপাদান একেক ব্র্যান্ডে একেক রকম হতে পারে। তাই কেনার আগে প্যাকেটের উপাদান তালিকা দেখে নেওয়া ভালো।
স্টিভিয়া: উদ্ভিদ থেকে পাওয়া মিষ্টিকারক হিসেবে স্টিভিয়াও বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত স্টিভিয়ার নির্যাস ব্যবহার করা হয় চা, কফি, পানীয় ও বিভিন্ন খাবারে মিষ্টি স্বাদ আনতে।
স্টিভিয়ায় খুব সামান্য বা প্রায় কোনও ক্যালরিই থাকে না এবং এটি সাধারণ চিনির মতো রক্তে শর্করা বাড়ায় না। তরল, গুঁড়ো কিংবা ট্যাবলেট বিভিন্ন ধরনের স্টিভিয়া বাজারে পাওয়া যায়।
তবে এর স্বাদ চিনির তুলনায় কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই রান্নায় ব্যবহারের পরিমাণ ও ধরন অনুযায়ী স্বাদ সামঞ্জস্য করে নিতে হয়।
সুক্রালোজ: চিনি কম বা চিনি ছাড়া তৈরি বিভিন্ন মিষ্টি খাবার ও পানীয়তে সুক্রালোজের মতো কৃত্রিম মিষ্টিকারক ব্যবহার করা হয়। এটি চিনির তুলনায় অনেক বেশি মিষ্টি হওয়ায় অল্প পরিমাণেই কাজ হয়।
চা, কফি, পানীয় কিংবা কিছু রান্নায় সুক্রালোজ ব্যবহার করা যায়। তবে এটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও পরিমাণের দিকে নজর রাখা উচিত এবং নিয়মিত ব্যবহারের আগে ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস ও প্রয়োজন বিবেচনা করা ভালো।
খেজুরের সিরাপ: খেজুর ঘনীভূত করে তৈরি করা হয় খেজুরের সিরাপ। খেজুরের স্বাভাবিক মিষ্টি স্বাদের কারণে এটি বিভিন্ন খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
প্যানকেক, দই, ওটস, স্মুদি কিংবা মিষ্টি পদে অল্প পরিমাণ খেজুরের সিরাপ যোগ করা যেতে পারে। তবে খেজুরের মতোই এর মধ্যেও প্রাকৃতিক চিনি থাকে। ফলে এটিকেও সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করাই ভালো।
মিষ্টি ফল: চিনির ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হতে পারে প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি ফল ব্যবহার করা। পাকা কলা, পেঁপে, আপেল কিংবা অন্যান্য মিষ্টি ফল রান্না বা বিভিন্ন খাবারে যোগ করলে বাড়তি চিনি দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
পাকা কলা পিষে প্যানকেক বা বেক করা খাবারে ব্যবহার করা যায়। পাকা ফল দিয়ে তৈরি করা যায় স্মুদি, ডেজার্ট কিংবা বিভিন্ন মিষ্টি পদও।
ফলের বিশেষ সুবিধা হলো প্রাকৃতিক চিনির পাশাপাশি এতে থাকে ফাইবার, পানি, ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। তাই শুধু বাড়তি চিনি যোগ করার পরিবর্তে পুরো ফল ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প হতে পারে।
চিনির ব্যবহার কমাতে মূল কথা পরিমাণে
চিনির বদলে গুড়, মধু, খেজুর বা খেজুরের সিরাপ ব্যবহার করলেই খাবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। এসব উপকরণেও চিনি ও ক্যালরি রয়েছে। অন্যদিকে স্টিভিয়া বা মঙ্ক ফ্রুটের মতো কম-ক্যালরির মিষ্টিকারক ব্যবহার করলেও সেগুলোকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করা উচিত নয়।
তাই খাবারে মিষ্টি স্বাদ ধরে রেখে চিনির পরিমাণ কমাতে চাইলে মিষ্টি স্বাদের অভ্যাসটিই ধীরে ধীরে কমানো, পাশাপাশি ফলের মতো পুষ্টিকর উপাদানকে খাবারে যুক্ত করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হতে পারে।