ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যা হলেই কলা, ভাত, আপেলসস ও টোস্ট এই চার খাবারের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ একসময় বেশ প্রচলিত ছিল। এই খাদ্যতালিকাই পরিচিত ব্র্যাট ডায়েট নামে। সহজপাচ্য খাবার হিসেবে এসব খাবার সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু পেটের অসুস্থতা সারানোর জন্য এই ডায়েট কতটা কার্যকর?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বর্তমান ধারণা বলছে, ব্র্যাট ডায়েট ডায়রিয়া বা বমি দ্রুত বন্ধ করে দেয় এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং দীর্ঘসময় এই সীমিত খাদ্যতালিকা অনুসরণ করলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যাট শব্দটি এসেছে চারটি খাবারের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর থেকে—কলা বা ব্যানানা, ভাত বা রাইস, আপেলসস ও টোস্ট। ২০ শতকের শুরুর দিকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য এই ধরনের সাদামাটা খাবারের ধারণা জনপ্রিয় হয়। তখন চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, কম পরিমাণে সহজপাচ্য খাবার খেলে পায়খানা কম হবে এবং শরীর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়াও কমবে।
খাবারগুলো ছিল তুলনামূলক সস্তা, সহজলভ্য এবং অসুস্থ অবস্থায় খাওয়া সহজ। ফলে ধীরে ধীরে বাড়ির পাশাপাশি হাসপাতালেও এই খাদ্যতালিকা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে সময়ের সঙ্গে গবেষণায় দেখা যায়, শুধু এই চার ধরনের খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিশেষ চিকিৎসাগত সুবিধা নেই। ১৯৯০-এর দশকে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও শিশুদের ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে ব্র্যাট ডায়েটকে নিয়মিতভাবে অনুসরণ করার পরামর্শ থেকে সরে আসে।
ব্র্যাট ডায়েট নিয়ে ২০১৯ সালে ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনের এক সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৯৫ শিশুর ওপর গবেষণা করা হয়।
একদল শিশুকে ব্র্যাট ডায়েট এবং অন্যদলকে স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হয়েছিল। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দুই দলের পায়খানার সংখ্যা কিংবা সুস্থ হয়ে ওঠার সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, কলা, ভাত, আপেলসস ও টোস্ট খেলে ডায়রিয়া দ্রুত সেরে যায় এমন ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
পেটের সংক্রমণ বা বমির সময় খাবার মুখে রাখতে কষ্ট হলে ব্র্যাট ডায়েটের মতো সহজপাচ্য খাবার খাওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, শরীর যে খাবার সহজে গ্রহণ করতে পারছে, সেটিই সাময়িকভাবে বেছে নেওয়া যেতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু চারটি খাবারেই আটকে থাকতে হবে। বমি ও ডায়রিয়ার উপসর্গ কমতে শুরু করলে ধীরে ধীরে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও খাদ্যতালিকায় যোগ করা উচিত।
ডায়রিয়া বা বমির সময় যে সংক্রমণ হয়, তা অন্ত্রের ভেতরের আবরণে থাকা কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রদাহযুক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্যও ব্যাহত হতে পারে।
এই ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পুনর্গঠনের জন্য শরীরের প্রয়োজন প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ। কিন্তু ব্র্যাট ডায়েটে এসব পুষ্টি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না।
দীর্ঘসময় এই খাদ্যতালিকা অনুসরণ করলে তাই শরীরের পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি বেশি।
শিশুর শরীর তখনও বেড়ে ওঠে। ফলে তাদের পুষ্টির চাহিদা বড়দের তুলনায় আরও নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালের একটি পর্যালোচনায় দুই বছর বয়সী শিশুর এক দিনের ব্র্যাট ডায়েটের পুষ্টিমান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন এ এবং বি১২-এর পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
গবেষণায় দেখা যায়, ওই খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়াম ছিল প্রায় ১৩০ মিলিগ্রাম, যেখানে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৫০০ মিলিগ্রাম। ভিটামিন বি১২-এর পরিমাণও ছিল শূন্য। তাই শিশুদের ডায়রিয়ার সময় খাবার অযথা সীমিত না করে পানিশূন্যতা রোধের পাশাপাশি বয়স উপযোগী পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়া ও বমির সময় শরীর থেকে পানি এবং ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। তাই চিকিৎসকদের মতে, খাবারের চেয়েও প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পানিশূন্যতা প্রতিরোধ। এ জন্য পর্যাপ্ত তরল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পানি পান করলে শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া সব ইলেকট্রোলাইট পূরণ নাও হতে পারে।
পানিশূন্যতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে খাবার বন্ধ না রেখে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবারে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পেটের সমস্যা কমে এলে সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় যোগ করা যেতে পারে। যেমন— ডিম সেদ্ধ বা পোচ করা, মুরগির মাংস, ওটমিল, সেদ্ধ আলু, রান্না করা সবজি, কলা, ভাত, টোস্ট এবং পরিমাণমতো পিনাট বাটার।
ডিমে প্রোটিন ও চর্বি রয়েছে। আলুতে পটাশিয়াম পাওয়া যায়। ওটমিল কিছুটা ফাইবার সরবরাহ করে। আর কলা ও টোস্টের সঙ্গে অল্প পিনাট বাটার যোগ করলে শুধু কার্বোহাইড্রেট নয়, প্রোটিন, চর্বি ও ফাইবারও পাওয়া যায়।
তবে কোন খাবার শরীর সহজে গ্রহণ করছে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারও টোস্ট খেতে ভালো লাগতে পারে, আবার কারও ডিম বা অন্য কোনো খাবার সহজে সহ্য হতে পারে। তাই শুধু ব্র্যাট ডায়েটের খাবারকেই নিরাপদ ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ডায়রিয়ার সময় কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় ও বেশি চিনি থাকা খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। অতিরিক্ত চিনি ডায়রিয়ার সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। তাই পানিশূন্যতা পূরণে কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি জুসের বদলে খাবার স্যালাইন বা উপযুক্ত ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বেশি কার্যকর।
ব্র্যাট ডায়েটের খাবারগুলো সহজপাচ্য হওয়ায় সাময়িকভাবে খাওয়া যেতে পারে। বমিভাব বা পেটের অস্বস্তির সময় কলা, ভাত বা টোস্ট অনেকের কাছে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতে পারে। কিন্তু এটিকে ডায়রিয়ার চিকিৎসা হিসেবে দেখা বা দীর্ঘসময় শুধু এই চারটি খাবার খেয়ে থাকা ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ হলো, পানিশূন্যতা রোধ করুন, শরীর যতটা সহ্য করতে পারে ততটা খাবার খান এবং উপসর্গ কমলে দ্রুত সুষম ও স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় ফিরে যান।
শিশুর ক্ষেত্রে ডায়রিয়া বেশি হলে, বারবার বমি হলে, প্রস্রাব কমে গেলে, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া খাদ্যতালিকার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস







