তীব্র গরম শুধু অস্বস্তিই তৈরি করে না, শিশুদের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। বিশেষ করে শিশু ও নবজাতকের শরীর বড়দের তুলনায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কম সক্ষম। ফলে প্রচণ্ড গরমে তারা দ্রুত পানিশূন্যতা ও হিট এক্সহস্টশন বা হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) শিশুদের গরমে বিশেষ নজরদারির পরামর্শ দিয়েছে।
বাংলাদেশেও তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ও ইউনিসেফ যৌথভাবে শিশু এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে তাপজনিত অসুস্থতা থেকে সুরক্ষায় ‘ন্যাশনাল গাইডলাইনস অন হিট-রিলেটেড ইলনেস’ প্রকাশ করে।
কেন শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে?
শিশুদের শরীর বড়দের তুলনায় দ্রুত গরম হয়ে যেতে পারে এবং তাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের বেশি সময় লাগে। একই সঙ্গে অনেক ছোট শিশু নিজের তৃষ্ণা, দুর্বলতা বা অতিরিক্ত গরম লাগার বিষয়টি ঠিকভাবে বোঝাতে পারে না। ফলে অভিভাবকের সতর্ক নজর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শিশু, নবজাতক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত শিশুদের গরমের সময়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। হাঁপানি বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে অতিরিক্ত গরমে সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।
ঘরটাকে যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখুন
দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরের পর্দা বা জানালার শেড টেনে সূর্যের তাপ কমিয়ে রাখা যায়। সম্ভব হলে রাতে জানালা খুলে ঠান্ডা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। ফ্যান, কুলার বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে শুধু যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে শিশুকে ঠান্ডা, ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখাও জরুরি। ইউনিফে শিশুদের জন্য বাড়িতে প্রয়োজনে একটি ঠান্ডা জায়গা প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
তৃষ্ণার অপেক্ষা নয়, নিয়মিত পানি
গরমে শিশুকে তৃষ্ণা লাগার পর পানি দেওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত তরল পান করাতে হবে। বাইরে গেলে সঙ্গে পানির বোতল রাখা ভালো। ৬ মাসের বেশি বয়সী শিশুকে নিয়মিত পানি পান করানো যেতে পারে।
তবে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে বুকের দুধই প্রধান তরল। ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী, শুধু বুকের দুধ পান করা ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে গরমের কারণে আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং মাকেও পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
অতিরিক্ত ঘাম, বমি বা ডায়রিয়ার কারণে পানিশূন্যতার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) দেওয়া যেতে পারে। ওআরএস তৈরির ক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
পোশাকে থাকুক স্বস্তি
গরমে শিশুকে পাতলা, হালকা রঙের ও ঢিলেঢালা পোশাক পরানো ভালো। বাতাস চলাচল করতে পারে এমন কাপড় ব্যবহার করলে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের হতে সুবিধা হয়। ঘুমের সময়ও অতিরিক্ত কাপড় বা ভারী বিছানা ব্যবহার না করাই ভালো।
শিশুর ত্বকে ঘামাচি দেখা দিলে তাকে ঠান্ডা ও শুষ্ক পরিবেশে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলুন
তাপমাত্রা বেশি থাকা সময়ে শিশুর বাইরে খেলাধুলা বা শারীরিক পরিশ্রম সীমিত করা উচিত। প্রয়োজন হলে সকাল বা বিকেলের তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যায়। বাইরে গেলে ছায়ায় থাকা, ছাতা বা টুপি ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখা জরুরি।
শিশু খেলতে খেলতে ক্লান্ত বা অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে তাকে বিশ্রাম দিয়ে ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। ইউনিসেফ শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় নিয়মিত বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
গাড়ির ভেতর কখনো একা নয়
গরমের দিনে পার্ক করা গাড়ির ভেতর শিশুকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রেখে যাওয়া উচিত নয়, জানালা সামান্য খোলা থাকলেও নয়। গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা খুব দ্রুত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং শিশুদের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
শিশুর শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন—অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘাম, মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ক্লান্তি, বমি বমি ভাব বা বমি, পেশিতে টান বা ক্র্যাম্প, মুখ ও মুখগহ্বর শুকিয়ে যাওয়া, শিশু অস্বাভাবিক বিরক্ত বা অস্থির হয়ে পড়া, ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কান্নার সময় চোখে পানি না থাকা, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব এবং দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
শিশু সঠিকভাবে সাড়া না দিলে, মাথা ঘুরে পড়ে গেলে, খুব বেশি জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে কিংবা দ্রুত শ্বাস নিতে থাকলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে।
হিটস্ট্রোক সন্দেহ হলে দেরি নয়
হিটস্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসাগত অবস্থা। শিশু অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে গেলে এবং বিভ্রান্তি, অচেতনতা, খিঁচুনি বা স্বাভাবিকভাবে সাড়া না দেওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসা সহায়তা আসা পর্যন্ত শিশুকে ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে গিয়ে শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করা জরুরি।
এ সময় নিজের সিদ্ধান্তে জ্বর কমানোর ওষুধ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। ইউনিসেফ বিশেষভাবে অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
মনে রাখুন
তাপপ্রবাহে শিশুকে নিরাপদ রাখার মূলকথা হলো ঠান্ডা পরিবেশ, পর্যাপ্ত তরল, হালকা পোশাক, দুপুরের গরম এড়িয়ে চলা এবং লক্ষণগুলোর দিকে নিয়মিত নজর রাখা। শিশু নিজে সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলতে না পারলেও অভিভাবকের সতর্ক নজর অনেক আগেই বিপদের সংকেত শনাক্ত করতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিইএইচও), ইউনিসেফ ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)