সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ঘরের জন্য রোজকার ১৪ অভ্যাস

জীবন যত ব্যস্ত হচ্ছে, ঘর পরিষ্কার ও গোছানোর জন্য আলাদা করে দীর্ঘ সময় বের করা তত কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ বাড়ি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর এবং আরামদায়ক রাখতে কিছু অভ্যাস নিয়মিত মেনে চললেই অনেকটা কাজ সহজ হয়ে যায়। পেশাদার হাউসকিপিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘর সামলানোর বিষয়টি শুধু ঝাড়ু দেওয়া বা ধুলো মোছার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জিনিসপত্রের সঠিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পরিষ্কার, অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলা এবং দৈনন্দিন কাজের একটি রুটিন তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে কম সময়ে বাড়িকে আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখা যায়, রইল ১৪টি কার্যকর পরামর্শ।

ঘর গোছানোর আগে বুঝুন বাড়ির প্রয়োজন

১. ঘর গোছানোর আগে বুঝুন বাড়ির প্রয়োজন

প্রত্যেক বাড়ির ধরন এবং প্রয়োজন আলাদা। কোথাও রান্নাঘর সামলানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও আবার শিশুর ঘর বা স্টোরেজের জায়গা। তাই অন্যের বাড়ির নিয়ম নিজের বাড়িতে হুবহু প্রয়োগ না করে পরিবারের অভ্যাস অনুযায়ী পরিষ্কার ও গোছানোর রুটিন তৈরি করা ভালো।

বাড়ির সদস্যরা কোন জিনিস কোথায় রাখতে স্বচ্ছন্দ, কোন কাজটি আগে করা প্রয়োজন এসব বুঝে নিলে ঘর সামলানো অনেক সহজ হয়।

সকালে বিছানা গুছিয়ে নিন (ছবি: সংগৃহীত)

২. সকালে বিছানা গুছিয়ে নিন

শোবার ঘরকে মুহূর্তে পরিপাটি দেখানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হল বিছানা গুছিয়ে রাখা। ঘুম থেকে ওঠার পর চাদর ঠিক করে, বালিশ সাজিয়ে রাখলেই গোটা ঘরের চেহারা বদলে যায়।

সাধারণ ভাবে সপ্তাহে এক বার চাদর বদলানো যেতে পারে। গরমের সময়ে ঘাম বেশি হলে আরও ঘন ঘন বদলানো ভালো। বাড়িতে পোষ্য প্রাণী বিছানায় ঘুমালে চাদর পরিবর্তনের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

শুধু চাদর নয়, নিয়মিত ম্যাট্রেসও ভ্যাকুয়াম করা উচিত। ম্যাট্রেস টপার বা অতিরিক্ত গদিও মাঝেমধ্যে ঝেড়ে নিলে তার ফোলাভাব বজায় থাকে।

রান্নাঘরে বাসন জমতে দেবেন না (ছবি: সংগৃহীত)

৩. রান্নাঘরে বাসন জমতে দেবেন না

পরিষ্কার রান্নাঘরের সবচেয়ে বড় শত্রু হল জমে থাকা অপরিষ্কার বাসন। খাওয়ার পর বাসন সিঙ্কে ফেলে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব ধুয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে রাখলে রান্নাঘর অনেক বেশি গোছানো থাকে।

ঘরকে সুগন্ধে ভরে রাখতে উপযুক্ত উড অয়েল ব্যবহার করুন (ছবি: সংগৃহীত)

৪. ঘরে থাকুক সতেজ গন্ধ

ঘর পরিষ্কার দেখানোর পাশাপাশি সেখানে ঢুকে যেন স্যাঁতসেঁতে বা বাসি গন্ধ না পাওয়া যায়, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার। বিশেষ করে রান্নাঘরের আবর্জনা, ভেজা কাপড় বা নোংরা বাসনের গন্ধ দ্রুত দূর করুন। ঘর পরিষ্কার করার পর হালকা সুগন্ধি মোমবাতি বা ডিফিউজার ব্যবহার করা যেতে পারে। কাঠের আসবাবে উপযুক্ত উড অয়েল ব্যবহার করলেও মৃদু সুবাস পাওয়া যায়।

টয়লেট, বেসিন, আয়না এবং মেঝে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি (ছবি: সংগৃহীত)

৫. বাথরুমকে দিন বাড়তি গুরুত্ব

বাড়িতে অতিথি এলে সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ে এমন জায়গাগুলির মধ্যে বাথরুম অন্যতম। তাই টয়লেট, বেসিন, আয়না এবং মেঝে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। চুনের দাগ বা পানির আস্তরণ জমতে না দিয়ে দ্রুত পরিষ্কার করলে পরবর্তী সময়ে ঘষাঘষির প্রয়োজন কমে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পরিষ্কার করার তরল লাগিয়েই সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলবেন না। প্যাকেটে নির্দেশিত সময় অনুযায়ী কিছুক্ষণ কাজ করতে দিলে দাগ সহজে উঠতে পারে।

সপ্তাহে অন্তত একবার ফ্রিজ পরিস্কার করুন (ছবি: সংগৃহীত)

৬. ফ্রিজও পরিষ্কারের তালিকায় রাখুন

ফ্রিজের ভেতরে খাবার পড়ে দাগ তৈরি হলে যত দ্রুত সম্ভব তা মুছে ফেলুন। শুকিয়ে গেলে একই দাগ পরিষ্কার করতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সপ্তাহে অন্তত এক বার ফ্রিজের তাক ও কোণগুলি দেখে নেওয়া ভালো। এতে পেছনে লুকিয়ে থাকা পুরনো খাবার বা মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া উপকরণও চোখে পড়বে। ফ্রিজ পরিষ্কার করার সময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে নতুন করে খাবার সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাওয়া যায়।

ধোয়া কাপড় দ্রুত গুছিয়ে তুলে রাখুন (ছবি: সংগৃহীত)

৭. ধোয়া কাপড় দ্রুত তুলে রাখুন

ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়া হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখলে কাপড়ে দুর্গন্ধ ও বেশি ভাঁজ পড়তে পারে। তাই সম্ভব হলে ধোয়া শেষ হওয়ার পর দ্রুত মেলে দিন।

বাড়ির বিভিন্ন সুবিধাজনক জায়গায় লন্ড্রি বাস্কেট রাখলে ময়লা কাপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার সমস্যা কমে। শুকনো কাপড়ও বিছানা বা চেয়ারের ওপর ফেলে না রেখে ভাঁজ করে দ্রুত নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে রাখুন।

মেঝে পরিষ্কারে দিন বিশেষ নজর (ছবি: সংগৃহীত)

৮. মেঝে পরিষ্কারে দিন বিশেষ নজর

পরিষ্কার মেঝে গোটা বাড়ির চেহারাতেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ঘর পরিষ্কার করার সময় ওপর থেকে নিচের দিকে এগোনো ভালো। প্রথমে তাক, জানালা বা আসবাব পরিষ্কার করে শেষে মেঝে ঝাড়ু বা ভ্যাকুয়াম করলে ওপর থেকে পড়া ধুলোও একসঙ্গে সরিয়ে ফেলা যায়।

ধুলো জমার আগেই পরিস্কার করুন (ছবি: সংগৃহীত)

৯. ধুলো জমার অপেক্ষা করবেন না

জানালার পাল্লা, ব্লাইন্ড, পর্দা, তাক এবং আসবাবের ওপর নিয়মিত ধুলো জমে। তাই শুধু মেঝে পরিষ্কার করলেই ঘর সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন হয় না।

ব্লাইন্ড পরিষ্কার করার সহজ উপায় হিসেবে পুরনো মোজা হাতে পরে তার ওপর সামান্য উপযুক্ত পরিষ্কার করার তরল লাগিয়ে নেওয়া যায়। এরপর ব্লাইন্ডের পাতাগুলির ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে পরিষ্কার করুন।

জেদি দাগ তুলতে উপযুক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করুন (ছবি: সংগৃহীত)

১০. জেদি দাগে মনে রাখুন ‘CHAT’

কোনও দাগ সহজে উঠছে না? সে ক্ষেত্রে ‘CHAT’ পদ্ধতির কথা মনে রাখতে পারেন। এর অর্থ Chemical, Heat, Agitation এবং Time—অর্থাৎ উপযুক্ত রাসায়নিক, তাপমাত্রা, ঘষে পরিষ্কার করার পদ্ধতি এবং সময়।

দাগের ধরন অনুযায়ী এই চারটির মধ্যে এক বা একাধিক বিষয় সামঞ্জস্য করলে পরিষ্কার করা সহজ হতে পারে। যেমন, উপযুক্ত ক্লিনিং এজেন্ট ব্যবহার করা, সামান্য উষ্ণ পানি প্রয়োগ করা কিংবা পরিষ্কার করার উপাদানটিকে কিছুক্ষণ কাজ করার সুযোগ দেওয়া।

অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমতে দেবেন না ও সব খেলনা একসঙ্গে বের করবেন না (ছবি: সংগৃহীত)

১১. অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমতে দেবেন না

বাড়ি যতই পরিষ্কার করা হোক, অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ঘর ভর্তি থাকলে সেটি কখনও পুরোপুরি গোছানো দেখাবে না। এক বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি এমন জিনিস সত্যিই প্রয়োজন কি না, তা ভেবে দেখুন। ভালো অবস্থায় থাকা জিনিস ফেলে না দিয়ে পরিচিত কাউকে দেওয়া, দান করা বা স্থানীয় অনলাইন কমিউনিটির মাধ্যমে অন্যের কাজে লাগানো যেতে পারে।

১২. একসঙ্গে গোটা বাড়ি নয়

ঘর গোছাতে গিয়ে একসঙ্গে সবকিছু করার চেষ্টা করলে কাজ আরও কঠিন মনে হয়। বরং একটি ঘরের ছোট কোনও অংশ বা একটি কোণ দিয়ে শুরু করুন।

সব জিনিস একে একে তুলে আবার জায়গায় রাখার বদলে আগে একটি জায়গায় এনে ফেলতে পারেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন কোনটি থাকবে, কোনটি সরবে এবং কোন জিনিস কোথায় রাখা হবে।

১৩. সব খেলনা একসঙ্গে বের করবেন না

শিশুর ঘর দ্রুত অগোছালো হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল একসঙ্গে অনেক খেলনা ছড়িয়ে রাখা। সব খেলনা একসঙ্গে সামনে না রেখে কয়েক দিন অন্তর খেলনা বদলে দিতে পারেন।

কিছু খেলনা তুলে রেখে অন্য কয়েকটি শিশুর নাগালের মধ্যে রাখুন। কয়েক দিন পর আবার সেগুলির সঙ্গে অন্য খেলনা অদলবদল করুন। এতে ঘর কম অগোছালো থাকবে এবং পুরনো খেলনাও শিশুর কাছে নতুন বলে মনে হতে পারে।

১৪. বাড়ির কাজে সাহায্যকারির সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ রাখুন

বাড়ির পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতির কাজে যারা সাহায্য করেন, তাদের সঙ্গে শুরুতেই নিজের প্রত্যাশা পরিষ্কার করে বলা উচিত। কোন কাজটি আগে দরকার, কোন জায়গায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বা কোনও বিশেষ নিয়ম আছে কি না সেগুলি জানিয়ে দিলে ভুল বোঝাবুঝি কমে। কারণ প্রতিটি বাড়ির প্রয়োজন আলাদা। পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মান ও সৌজন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সব সময় নিখুঁত ঘর রাখার দরকার নেই

ঘর সব সময় ঝকঝকে থাকবে এমন প্রত্যাশা নিজের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পেশাদারভাবে অন্যের বাড়ি পরিষ্কার করেন যারা, তাদের নিজেদের বাড়িও যে ২৪ ঘণ্টা নিখুঁত থাকে না, সেটাই স্বাভাবিক।

কাজের চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, ছোট সন্তান কিংবা দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে কোথাও কাপড় জমে থাকা, কোনও চেয়ার বা টেবিলে জিনিস পড়ে থাকা এসব হতেই পারে। গুরুত্বপূর্ণ হল, অগোছালোভাবকে স্থায়ী হতে না দেওয়া। ঘরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে দিনের শেষে ফিরে স্বস্তি পাওয়া যায়।