বর্ষাকালে ঝোপঝাড়, জমি, বাড়ির আশপাশ কিংবা কখনও ঘরের ভেতরেও সাপের দেখা মিলতে পারে। সাপের কামড় নিয়ে ভয় ও আতঙ্ক স্বাভাবিক হলেও সেই মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্তই পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে। বিশেষ করে বিষধর সাপের কামড় কি না, তা দেখে সব সময় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই সাপ কামড়ালে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই সবচেয়ে জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, সাপের বিষ শরীরে ঢুকলে তার প্রভাব বিভিন্ন ভাবে দেখা দিতে পারে। কিছু বিষ স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে, ফলে দুর্বলতা বা পক্ষাঘাতের মতো সমস্যা হতে পারে। আবার কিছু বিষ রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কোনও কোনও সাপের বিষ কামড়ের জায়গার কোষ ও টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। তাই সাপের কামড়কে কোনও ভাবেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কামড়ের পর ক্ষতস্থান শক্ত করে বাঁধবেন না
সাপ কামড়ানোর পর অনেকেই কাপড়, দড়ি, সুতো কিংবা অন্য কিছু দিয়ে কামড়ের জায়গার ওপরের অংশ শক্ত করে বেঁধে দেন। এতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘ সময় এ ভাবে বাঁধা থাকলে আক্রান্ত অঙ্গে গুরুতর জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিজের সিদ্ধান্তে ক্ষতস্থানের চারপাশে শক্ত করে বাঁধা ঠিক নয়।
ক্ষত কেটে বিষ বার করার চেষ্টা করবেন না
সাপের কামড়ের জায়গা ছুরি বা অন্য কোনও ধারালো বস্তু দিয়ে কেটে বিষ বার করার চেষ্টা করাও বিপজ্জনক। একই ভাবে মুখ দিয়ে ক্ষতস্থান চুষে বিষ বার করার কোনও প্রয়োজন নেই। এতে বিষ বের করে ফেলার বদলে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত আঘাতও তৈরি হতে পারে।
ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের উপর নির্ভর করে সময় নষ্ট নয়
সাপের কামড়ের পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই ভালো। তাই ওঝা, গুনিন, ঝাড়ফুঁক বা কোনও ঘরোয়া পদ্ধতির উপর নির্ভর করে হাসপাতালে যেতে দেরি করা উচিত নয়। বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষেধক ও অন্যান্য চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখুন
সাপের কামড়ের পর আতঙ্কিত হয়ে রোগী বেশি নড়াচড়া করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই তাঁকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন এবং অপ্রয়োজনীয় হাঁটাচলা বন্ধ করুন। আক্রান্ত অঙ্গটিও যতটা সম্ভব স্থির রাখা প্রয়োজন। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।
কামড়ের সময় হাতে, পায়ে বা শরীরের অন্য কোনও অংশে আংটি, চুড়ি, ঘড়ি, আঁটসাঁটো পোশাক বা অন্য কোনও জিনিস থাকলে তা খুলে দেওয়া ভালো। কারণ কামড়ের পর আক্রান্ত অংশ ফুলে উঠতে পারে, তখন ওই জিনিসগুলি রক্ত চলাচলে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সাপটিকে ধরতে বা মেরে ফেলতে যাবেন না
সাপটি দেখতে কেমন ছিল, তার রং বা বিশেষ চিহ্ন মনে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে সম্ভব হলে ছবি তোলা যেতে পারে। কিন্তু সাপটিকে ধরতে, মারতে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। এতে দ্বিতীয় বার কামড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সাপের কামড়ে কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তা নির্ভর করে বিষের ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর। তাই বাড়িতে বসে বিষধর না নির্বিষ তা অনুমান করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছনোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সাপের কামড়ের পর শ্বাসকষ্ট, চোখের পাতা ঝুলে পড়া, দুর্বলতা, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, কামড়ের জায়গায় দ্রুত ফোলা বা তীব্র ব্যথার মতো কোনও লক্ষণ দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও জরুরি হয়ে ওঠে। তবে লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে সাপের কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সাপ কামড়ানোর পর প্রথম কয়েক মিনিট আতঙ্কে কোনও ভুল চিকিৎসা না করে রোগীকে শান্ত রাখা, আক্রান্ত অংশ স্থির রাখা এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়া গেলে সাপের কামড়ের মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ে।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। সাপের কামড় একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। কোনও ঘরোয়া চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছন। ব্যক্তিগত চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।