সময় যেন আমাদের জীবনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক। কখন ঘুম থেকে উঠতে হবে, কখন অফিসে পৌঁছাতে হবে, কখন কোথায় যেতে হবে প্রতিটি কাজের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে ঘড়ির কাঁটা। সামান্য দেরি হলেই শুরু হয় দুশ্চিন্তা, তাড়াহুড়ো কিংবা অপরাধবোধ। অথচ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কি সত্যিই সময়ের হিসাব মেনেই কাটাতে হবে? মাঝে মাঝে একটু থামা, ধীর হওয়া এবং নিজের মতো করে সময় কাটানোরও তো প্রয়োজন আছে। সেই ভাবনা থেকেই পালিত হয় ‘বি লেট ফর সামথিং ডে,’ বাংলায় যাকে বলা যায় ‘কোনও কিছুর জন্য দেরি করার দিন।’
দিনটির বার্তা অবশ্যই সব কাজে ইচ্ছা করে দেরি করা নয়। বরং সময়ের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর না হয়ে জীবনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। কোথাও পৌঁছাতে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গেল, পথে কোনও সুন্দর দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন কিংবা ব্যস্ততার মাঝখানে নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করলেন এসব নিয়েও যেন অযথা অপরাধবোধে ভুগতে না হয়, সেই কথাই মনে করিয়ে দেয় এই বিশেষ দিন।
ঘড়ির কাঁটার বাইরে একদিন
এই দিনটি বিশেষ করে তাদের জন্য মজার একটি উপলক্ষ, যারা সব সময় সময়ের হিসাব নিয়ে চলেন। প্রতিটি মিনিটের হিসাব রাখতে রাখতে অনেক সময় জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলোই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। এই দিনটি তাই অন্তত কিছু সময়ের জন্য ঘড়ির তাড়া থেকে দূরে থাকার কথা বলে।
চাইলে দিনের শুরুতেই নিজের ব্যস্ত সময়সূচি কিছুটা হালকা করে নিতে পারেন। ঘড়ির দিকে বারবার তাকানোর বদলে কাজগুলো একটু ধীরে করুন। কোথাও যাওয়ার পথে পছন্দের কোনো দোকান চোখে পড়লে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে ঘুরে দেখতে পারেন। বাসস্ট্যান্ডে পরিচিত কারও সঙ্গে গল্প করতে করতে বাস চলে এলে পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতেও পারেন। মূল কথা হলো, প্রতিটি মুহূর্তকে শুধু ‘পরবর্তী কাজটি কখন করতে হবে’ এই চিন্তায় নষ্ট না করা।
দেরি হোক, তবে বুঝেশুনে
দিনটির নাম শুনে অবশ্যই মনে করা উচিত নয় যে গুরুত্বপূর্ণ সব কাজেই ইচ্ছা করে দেরি করতে হবে। অফিস, পরীক্ষা, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক কিংবা এমন কোনো কাজ যেখানে আপনার দেরির কারণে অন্য কেউ সমস্যায় পড়তে পারেন এসব ক্ষেত্রে সময় মেনে চলাই জরুরি।
কারণ আপনার কয়েক মিনিটের দেরি কখনো কখনো অন্য অনেক মানুষের সময়সূচিকে পিছিয়ে দিতে পারে। তাই এই দিনটির আসল শিক্ষা হলো, কোথায় কিছুটা সময় নিজের জন্য নেওয়া যায় আর কোথায় সময়নিষ্ঠ থাকা জরুরি সেই পার্থক্য বুঝে চলা।
কীভাবে শুরু হলো এই দিবস
দেরি করা বা কাজ ফেলে রাখার প্রবণতাকে সাধারণত ভালো চোখে দেখা হয় না। কিন্তু দিনটি সেই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে এক দিনের জন্য একটু ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। দিনটির সূচনা আমেরিকার কাজ ফেলে রাখার প্রবণতাসম্পন্নদের ক্লাব-এর উদ্যোগে বলে উল্লেখ করা হয়।
ছোটখাটো বিলম্ব যে সব সময় খারাপ ফল বয়ে আনে, এমনও নয়। কখনও কোনও ব্যক্তির দেরি হয়ে যাওয়ার কারণেই নতুন কারও সঙ্গে পরিচয় হতে পারে, অপ্রত্যাশিত কোনও সুযোগ তৈরি হতে পারে কিংবা এমন একটি সাক্ষাৎ ঘটতে পারে, যা অন্যথায় হয়তো কখনোই হতো না। জীবনের সব ঘটনা যে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই দিবসের উদ্দেশ্য তাই দেরি করাকে অভ্যাসে পরিণত করা নয়। বরং সময়ের প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসে জীবনে স্বস্তি ও স্বাধীনতার জায়গা তৈরি করা।
সময়ের চাপ কমান
প্রতিটি কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার তাগিদ অনেকের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনে হয় সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে, কাজ বাকি রয়েছে কিংবা কোথাও পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তখন অযথা উদ্বেগ তৈরি হয় এবং স্বাভাবিক গতিতেও কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই মাঝে মাঝে নিজের জন্য কিছুটা বিরতি নেওয়া দরকার। চারপাশের পরিবেশ উপভোগ করা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, এক কাপ চা নিয়ে কিছুক্ষণ নিরিবিলি বসে থাকা কিংবা পছন্দের কোনো কাজে সময় দেওয়া এসব ছোট বিরতিই ব্যস্ত জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারে।
নিজের যত্ন নিন
এই দিনে শুধু সময়সূচির গতি কমানো নয়, শরীর ও মনকেও একটু বিশ্রাম দেওয়া যেতে পারে। চাইলে আরামদায়ক ম্যাসাজ নিতে পারেন কিংবা এমন কোনও রিল্যাক্সেশন ট্রিটমেন্ট বেছে নিতে পারেন, যা আপনাকে কিছুটা প্রশান্তি দেবে।
এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করা কোনো আরামদায়ক ট্রিটমেন্টও বেছে নিতে পারেন। তবে মূল বিষয় ট্রিটমেন্ট নয়, বরং নিজের জন্য কিছুটা নিরিবিলি সময় বের করা। সেই সময়ে কাজের তালিকা, অফিসের চাপ কিংবা পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে চিন্তা না করে বর্তমান মুহূর্তটিকে উপভোগ করার চেষ্টা করুন।
কমিয়ে দিন দিনের ব্যস্ততা
দিবসটি পালন করতে চাইলে দিনের সময়সূচিই কিছুটা হালকা করে নেওয়া যায়। একসঙ্গে অনেক কাজ রাখার বদলে প্রতিটি কাজের জন্য একটু বাড়তি সময় হাতে রাখুন। এতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যাওয়ার চাপ কমবে।
পথে সুন্দর কোনও দৃশ্য চোখে পড়লে কয়েক মুহূর্ত থামুন। পছন্দের কোনো জায়গায় একটু বেশি সময় কাটান। প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথোপকথন শেষ করার জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না। অর্থাৎ, দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছানোর দৌড়ে পরিণত না করে নিজের গতিতে চলার চেষ্টা করুন।
কীভাবে পালন করবেন
এই দিবসটি পালনের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। এমন একটি কাজ বেছে নিন, যেখানে কয়েক মিনিট দেরি হলে কারও অসুবিধা হবে না। সেই সময়টুকু নিজের জন্য ব্যবহার করুন। সকালে একটু ধীরে নাশতা করতে পারেন, হাঁটতে বেরিয়ে কিছুটা বেশি সময় নিতে পারেন কিংবা দীর্ঘদিন পর পছন্দের কোনো বই পড়তে বসতে পারেন।
চাইলে ফোনের নোটিফিকেশন কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দিতে পারেন। ঘড়ির দিকে বারবার না তাকিয়ে নিজের শরীর ও মনের কথা শুনুন। তবে গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়সীমা এবং অন্য মানুষের সময়ের প্রতি সম্মান অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ‘কোনও কিছুর জন্য দেরি করার দিন’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন শুধু সময়মতো এক কাজ শেষ করে আরেক কাজে ছুটে যাওয়ার নাম নয়। সব সময় ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে আমরা অনেক সময় চারপাশের ছোট ছোট আনন্দ দেখতে ভুলে যাই। তাই এই দিনে একটু ধীর হোন, নিজের জন্য সময় রাখুন, অপ্রয়োজনীয় তাড়াহুড়ো কমান এবং মনে রাখুন কখনও কখনও জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করার জন্য কয়েক মিনিট দেরি করাও সার্থক হতে পারে।









