বয়সবাদকে হারিয়ে কীভাবে দীর্ঘায়ু হবেন

বয়স বাড়া মানেই কি সক্ষমতা কমে যাওয়া? নতুন কিছু শেখার বয়স কি সত্যিই একসময় শেষ হয়ে যায়? গবেষণা বলছে, এমন অনেক ধারণাই বাস্তবতার চেয়ে সামাজিক স্টেরিওটাইপের ফল। বরং বয়সকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস এমনকি দীর্ঘায়ুর সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

বয়সের ভিত্তিতে কাউকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা, অনুভূতি বা আচরণকে বলা হয় এজিজম বা বয়সবাদ। তবে এই বৈষম্য শুধু অন্যের কাছ থেকে আসে না, সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা মানুষ নিজের বয়স সম্পর্কেও বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বয়সবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজিজম মানুষের নিজেদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিতে পারে। বয়স বাড়ছে মানেই দুর্বল হয়ে যাওয়া, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হারানো কিংবা জীবনের আনন্দ কমে যাওয়া—এ ধরনের ধারণা ধীরে ধীরে আচরণ ও জীবনযাপনে প্রভাব ফেলতে পারে।যেকোনো বয়সের মানুষই বয়সবাদী ধারণার শিকার হতে পারেন। তবে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে প্রবীণদের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সী ২ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় ৯৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা দৈনন্দিন জীবনে কোনও না কোনও ধরনের বয়সবাদী আচরণের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।

বয়স সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা অনেক সময় শৈশবেই তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছর বয়স থেকেই শিশুরা পরিবার, গণমাধ্যম ও আশপাশের পরিবেশ থেকে বার্ধক্য সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট ধারণা গ্রহণ করতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই বয়স বাড়াকে জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে শেখানো জরুরি।

ম্যাকমাস্টার ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন এজিংয়ের বৈজ্ঞানিক পরিচালক পারমিন্দর রায়নার ভাষায়, “বার্ধক্য কোনও ধ্বংসাত্মক শক্তি নয়, এটি আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি অসাধারণ অর্জন।”

বয়স নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা মানুষ অনেক সময় অজান্তেই নিজের মধ্যে ধারণ করেন। একে ‘স্টেরিওটাইপ এমবডিমেন্ট’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

যেমন, কোনও প্রবীণ ব্যক্তি যদি মনে করেন, ‘এই বয়সে আর নতুন কিছু শেখা সম্ভব নয়’, তাহলে তিনি নতুন শেখার সুযোগ এড়িয়ে যেতে পারেন। এতে আত্মবিশ্বাস কমে গিয়ে তার কার্যক্রমের পরিধিও সংকুচিত হতে পারে। অর্থাৎ, সামাজিক ধারণাই একসময় আত্মপূরণকারী ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে।

গবেষণায় ‘স্টেরিওটাইপ থ্রেট’-এর কথাও উঠে এসেছে। বয়স সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার কথা মনে করিয়ে দিলে কোনো কাজে বয়স্ক মানুষের পারফরম্যান্স খারাপ হতে পারে। এর পেছনে বয়স নিয়ে তৈরি উদ্বেগ ও অন্যের বিচার করার ভয় কাজ করতে পারে।

বয়স্ক মানুষদের নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো বয়স বাড়লেই সবাই দুর্বল ও নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বাস্তবে অধিকাংশ প্রবীণ মানুষ নিজেদের পরিচিত পরিবেশে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করেন, পরিবার ও সমাজে অবদান রাখেন এবং বিভিন্ন কাজে সক্রিয় থাকেন।

কিছু মানুষের অবশ্যই জটিল স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সেটিকে সব প্রবীণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বয়সের চেয়ে ব্যক্তির প্রকৃত সক্ষমতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

‘এই বয়সে পড়াশোনা করার কী দরকার’, ‘এই পোশাক এই বয়সে মানায় না’ কিংবা ‘এই বয়সে এমন জায়গায় যাওয়া উচিত নয়’ এ ধরনের সামাজিক ধারণাগুলোকেও প্রশ্ন করা প্রয়োজন। কারণ কোন বয়সে কী করা যাবে, তার নির্দিষ্ট কোনও সার্বজনীন সীমা নেই।

বয়সকে ইতিবাচকভাবে দেখার সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্কও পাওয়া গেছে গবেষণায়। ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক বেকা লেভির গবেষণায় দেখা যায়, বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা থাকা ব্যক্তিরা নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীদের তুলনায় গড়ে সাড়ে সাত বছর বেশি বেঁচেছেন।

বিভিন্ন গবেষণায় বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার সঙ্গে স্মৃতিশক্তিরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ইতিবাচক বয়স-দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বায়োমার্কার তুলনামূলক কম এবং স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হিপোক্যাম্পাসের সংকোচনও কম হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

অন্যদিকে বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, জ্ঞানীয় কার্যকারিতায় সমস্যা, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বয়স বাড়ার পরও মানুষ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন ও নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে সক্রিয় থাকতে পারেন। কুইল্টিং বা ডিজিটাল ফটোগ্রাফির মতো নতুন দক্ষতা শেখার সঙ্গে বয়স্ক মানুষের স্মৃতিশক্তির ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্পর্কও গবেষণায় পাওয়া গেছে।

তাই বয়সকে সম্ভাবনার শেষ সীমা হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং নতুন কিছু শেখা, সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা সুস্থভাবে বয়স বাড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বয়সবাদ মোকাবিলায় শুধু ব্যক্তিগত মানসিকতা বদলালেই হবে না। পরিবার, গণমাধ্যম ও সমাজকেও ভূমিকা নিতে হবে।

২০১৬ সালের একটি গবেষণায় ৮৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাদের জীবনে অন্তত একজন সফলভাবে বয়স বাড়ার রোল মডেল রয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই রোল মডেল ছিলেন বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি। ইতিবাচক রোল মডেল থাকা ব্যক্তিদের বার্ধক্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও তুলনামূলক কম ছিল।

বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগও বয়সবাদ কমাতে পারে। একসঙ্গে বসবাস, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগ একাকিত্ব কমানোর পাশাপাশি মানুষকে সক্রিয় ও সংযুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

বেকা লেভি বয়স সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা গড়ে তুলতে এবিসি মেথড-এর কথা বলেছেন।

এ—এওয়ারনেস: নিজের মধ্যে থাকা বয়সভিত্তিক ধারণাগুলো শনাক্ত করুন। এক সপ্তাহ বয়স নিয়ে নিজের বা অন্যের মন্তব্য, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা লিখে রাখতে পারেন।

বি—ব্লেম: কোনও সমস্যার জন্য সরাসরি বয়সকে দায়ী করার আগে দেখুন, সেখানে বয়সবাদ বা বৈষম্য কাজ করছে কি না।

সি—চ্যালেঞ্জ: বয়স নিয়ে প্রচলিত স্টেরিওটাইপকে প্রশ্ন করুন এবং তার সত্যতা যাচাই করুন। ‘বয়স বাড়লেই শেখার ক্ষমতা শেষ’ এমন ধারণাকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।

বার্ধক্য কোনও ধ্বংসাত্মক শক্তি নয়। দীর্ঘ জীবন পাওয়ার সুযোগ আধুনিক সমাজ ও জনস্বাস্থ্যের বড় অর্জন। তাই বয়সকে ভয় বা সীমাবদ্ধতার প্রতীক না বানিয়ে অভিজ্ঞতা, শেখা, সম্পর্ক ও নতুন সম্ভাবনায় পূর্ণ করে তোলাই হতে পারে সুস্থ ও অর্থপূর্ণভাবে বয়স বাড়ার সবচেয়ে ইতিবাচক পথ।