বিশ্ব জনসংখ্যার চিত্রে ঘটেছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। জনসংখ্যার কাঠামোয় এই পালাবদলকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জন্মহার কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্সাস ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিক উন্নতির ফলে এই পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি। বরং কয়েক দশক ধরে চলা জনমিতিক প্রবণতার ফল হিসেবেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যার এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আগামী দিনগুলোতে সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা, বয়স্কদের যত্ন এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও জাপান প্রথম দিকের দেশ, যেখানে জনসংখ্যা কমার পাশাপাশি বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়তে শুরু করে। রাশিয়ায় জনসংখ্যা কমার প্রবণতা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। আর জাপানে জনসংখ্যা কমতে শুরু করে ২০০৮ সালে। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব জনসংখ্যা আরও কয়েক দশক ধরে বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জন্মহার কমছে, বাড়ছে মানুষের আয়ু
বিশ্ব জনসংখ্যায় এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি দুটি প্রবণতা বিশেষভাবে কাজ করছে—জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের আয়ু বেড়ে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে মানুষ আগের তুলনায় কম সন্তান নিচ্ছে। জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বয়স পিছিয়ে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবার পরিকল্পনার সুযোগ ও সচেতনতা বাড়ার কারণে অনেক দেশেই জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শুধু উন্নত দেশ নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, উন্নত পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতির কারণে মানুষ আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি বছর বেঁচে থাকছে। ফলে একদিকে যেমন কমছে শিশুর সংখ্যা, অন্যদিকে বাড়ছে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা।
দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যার বার্ধক্যকে মূলত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের কয়েকটি ধনী দেশের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোতেও দ্রুত বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা।
তবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ধক্য নিজেই জীবনের একটি কঠিন পর্যায় হতে পারে। এর সঙ্গে যদি দারিদ্র্য, একাকীত্ব কিংবা দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
পরিবারের আকার ছোট হয়ে আসা এবং সন্তানহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রবীণদের দেখভালের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের জন্য সরকারগুলোকেও প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক নীতি, আবাসন কর্মসূচি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনসংখ্যার এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার হিসাব বদলাচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের সমাজব্যবস্থার চেহারাও পাল্টে দিচ্ছে। শিশু কম আর প্রবীণ বেশি—এমন একটি পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাপন, পরিবার কাঠামো, কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনাও তাই নতুন করে সাজাতে হবে।
সূত্র: এনডিটিভি