অফিসের কাজের ব্যস্ততায় স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। কখনও সকালের নাশতা বাদ যায়, কখনও দ্রুত দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। আবার কখনও একের পর এক মিটিংয়ের ফাঁকে চা-বিস্কুটের ওপর নির্ভর করতে হয়। ক্লান্তি এলে হাত চলে যায় ভাজাপোড়া বা মিষ্টিজাতীয় খাবারের দিকে।
অথচ অফিসে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার জন্য জটিল কোনো ডায়েট অনুসরণ করা কিংবা পছন্দের খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া জরুরি নয়। বরং নিয়মিত তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও শক্তি জোগায় এমন সুষম খাবার খাওয়াই মূল কথা।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তি হলো পর্যাপ্ততা, ভারসাম্য, পরিমিতি ও বৈচিত্র্য। বেশি করে শাকসবজি, ফল, শস্য, ডাল এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস বেছে নেওয়া এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে আনা হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
অফিসে কী খাওয়া উচিত?
কর্মদিবসে একটি সুষম খাবারের জন্য প্লেটের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রাখুন শাকসবজি। সঙ্গে রাখুন ভালো মানের প্রোটিনের উৎস এবং পরিমিত পরিমাণে কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার।
শাকসবজি ও ফল
প্রধান খাবারে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি রাখুন। যেমন বিভিন্ন শাক, শিম, ফুলকপি, কুমড়া, লাউ, টমেটো, শসা ও অন্যান্য মৌসুমি সবজি।
সম্ভব হলে ফলের জুসের পরিবর্তে আস্ত ফল খান। কারণ আস্ত ফলে আঁশ থাকে এবং সাধারণত তা বেশি সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।
কার্বোহাইড্রেট
পূর্ণশস্য বা কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিন। যেমন আটার রুটি, ওটস, লাল চাল এবং অন্যান্য পূর্ণশস্য। ডাল, ছোলা ও শিমজাতীয় খাবারও আঁশ ও নানা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস।
সাদা ভাত বা সাদা পাউরুটিও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি ও প্রোটিন রাখুন এবং পরিশোধিত বা প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট যেন বেশি পরিমাণে খাওয়া না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
প্রোটিন
প্রধান খাবারে মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, শিম, ছোলা, বাদাম বা বীজের মতো প্রোটিনের উৎস রাখুন।
কিছু সহজ উদাহরণ:
ভাত + ডাল + মাছ + প্রচুর শাকসবজি
রুটি + শাকসবজি + ডিম বা মুরগি + সালাদ
স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নিন
পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করুন এবং অস্বাস্থ্যকর ও ট্রান্স ফ্যাট কমিয়ে দিন। নিয়মিত অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, বেকারি পণ্য ও প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
মনে রাখবেন, ভাজাপোড়াজাতীয় খাবার প্রতিদিনের নাশতা যেন না হয়ে ওঠে, বরং মাঝেমধ্যে খাওয়া যেতে পারে।
চা, কফি ও নাশতা
চা ও কফি দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হতে পারে। সমস্যা সাধারণত চা-কফির সঙ্গে আমরা কী খাচ্ছি, সেখানে। প্রতিবার চায়ের বিরতিতে বিস্কুট, কেক, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার না খেয়ে বেছে নিতে পারেন— আস্ত ফল, অল্প পরিমাণ লবণবিহীন বাদাম, ভাজা ছোলা বা চানা, টক দই এবং সেদ্ধ ডিম
পানি পানকে অগ্রাধিকার দিন এবং চিনিযুক্ত পানীয় সীমিত করুন।
লবণের দিকে নজর রাখুন
শুধু খাবারে বাড়তি লবণ যোগ করলেই শরীরে অতিরিক্ত লবণ প্রবেশ করে না। প্রক্রিয়াজাত খাবার, বিভিন্ন সস, ইনস্ট্যান্ট খাবার ও লবণাক্ত নাশতাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ থাকতে পারে।
তাই খাবারে বাড়তি লবণ দেওয়ার আগে স্বাদ দেখে নিন এবং অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার কমিয়ে দিন।
‘বেটার প্লেট’ নিয়ম
পরবর্তী দুপুরের খাবারের আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন—আমি কি খাবারে শাকসবজি রেখেছি; ভালো মানের প্রোটিনের কোনো উৎস কি রেখেছি; কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার পরিমাণ কি পরিমিত; চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে কি পানি পান করছি; আমি কি সত্যিই ক্ষুধার কারণে খাচ্ছি, নাকি সামনে খাবার আছে বলেই খাচ্ছি?
মনে রাখুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অর্থ কম খাওয়া নয়, বরং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।
খাবারে বেশি করে শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য ও ডাল রাখুন; স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস বেছে নিন; স্বাস্থ্যকর চর্বি পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন এবং অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত নাশতা কমিয়ে দিন। নিয়মিত ছোট ছোট পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে আপনার স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কর্মদিবস যতই ব্যস্ত হোক, আপনার প্লেটে আপনার স্বাস্থ্যের জন্যও একটু জায়গা থাকা দরকার।
লেখক: মেডিক্যাল অ্যাডভাইজার, স্কলাসটিকা