তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে কী করবেন, কী করবেন না

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক 
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১

শরতের আকাশে মেঘ। গত কয়েকদিন রাজধানীতে মুষলধারে বৃষ্টিও হয়েছে। কোথাও টানা, কোথাও অল্প সময়ের ঝুম বৃষ্টি। তবু গরমের অস্বস্তি কাটছে না। বৃষ্টির পর কিছুটা স্বস্তি মিললেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। বৃষ্টি থামার পরই আবার ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। 

সাধারণত এ সময়ে বৃষ্টির প্রবণতা থাকলেও বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা খুব বেশি কমছে না। বরং বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকায় তাপমাত্রা যতটা দেখা যাচ্ছে, মানুষের কাছে তার চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে। 

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শুধু বৃষ্টি হলেই গরমের অস্বস্তি কমে না। বৃষ্টির পর বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেলে আর্দ্রতা বেশি থাকে। এতে শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের তাপ বের হতে সময় লাগে এবং গরম বেশি অনুভূত হয়। বিশেষ করে বাতাসের গতি কম থাকলে এই অস্বস্তি আরও বাড়ে। 

আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নেত্রকোনা ও ফেনীতে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সংস্থাটির স্কেল অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। সেই হিসাবে নেত্রকোনা ও ফেনীসহ অন্তত দেশের চারটি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। অন্য দুটি জেলার মধ্যে নীলফামারীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রংপুরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

বিভাগভিত্তিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার হিসাবে ঢাকা বিভাগে গতকাল অধিকাংশ স্থানে তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। সর্বোচ্চ ছিল ফরিদপুরে ৩৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মৃদু তাপপ্রবাহের কাছাকাছি। দেশের অন্যান্য বিভাগগুলোর চিত্রও প্রায় একইরকম। 

তাপমাত্রার আগামী পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে অধিদফতর বলছে, আগামী ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। তবে ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। 

আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই সময় বাতাসে আদ্রতার পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে একের পর এক লঘুচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হলেও তা এত যথেষ্ট নয় যে, গরম কমে আসবে। সব মিলিয়ে এই সময় বৃষ্টির পর পর আবারও ভ্যাপসা গরম লাগতে শুরু করে। এই গরম আরও কিছুদিন থাকতে পারে।” 

শীতকাল না আসা পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টিও হবে, আবার ভ্যাপসা গরমও থেকে যেতে পারে বলে তিনি জানান। 

এই অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ডায়রিয়া, হিট স্ট্রোকসহ নানা ধরনের অসুস্থতার ঝুঁকি এড়াতে সচেতন থাকা জরুরি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, গরমে সুস্থ থাকতে যা করবেন এবং যা এড়িয়ে চলবেন— 

পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করুন 

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ওয়ানাইজা রহমান জানান, গরমে মারাত্মক পানিশূন্যতা হয়। এ সময় শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বেরিয়ে যায়। এতে পানির পাশাপাশি লবণ বা ইলেকট্রোলাইটসের অভাবও দেখা দেয়। ইলেকট্রোলাইটস হচ্ছে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের সম্মিলন। শরীর থেকে এসব খনিজ কমে গেলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। 

এ সময় শরীরের কোষ সজীব রাখতে প্রচুর পানি খেতে হবে। ইলেকট্রোলাইটসের অভাব পূরণ করতে খাবার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। শরীরে পানি কম হলে প্রস্রাব হলুদ হবে, পরিমাণে কম হবে এবং জ্বালাপোড়া করবে। যতক্ষণ না প্রস্রাব স্বাভাবিক রঙ ফিরে পাবে, ততক্ষণ পর্যাপ্ত পানি, ডাব ও শরবতের মতো তরল পদার্থ খেতে হবে। 

হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন 

হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হবে। হালকা রঙ সূর্যের তাপকে আকর্ষণ করে না। সুতির নরম পোশাক পরলে ত্বকের ঘাম দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। 

রাতে শোয়ার সময়ও ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরে ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

ব্যায়ামের সময় বদলান 

গরমের কারণে ব্যায়াম বন্ধ করার দরকার নেই, তবে রুটিনে কিছুটা পরিবর্তন আনা যেতে পারে। এমন ব্যায়াম করতে হবে, যা অতিরিক্ত ঘামের কারণ হবে না। সাঁতার কাটা যেতে পারে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে ইনডোর ওয়ার্কআউট বেছে নেওয়া যায়। ভোরে বা সন্ধ্যার মতো দিনের শীতলতম অংশেও ওয়ার্কআউট করা যেতে পারে। 

প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাবেন না 

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কামরুজ্জামান নাবিল কাজ না থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত। 

একান্তই বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে ছাতা নিয়ে বের হতে হবে এবং চোখ রক্ষায় সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে। খুব ভিড় হয় এমন এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। 

ঠান্ডা কম্প্রেস করতে পারেন 

নিজেকে শীতল রাখতে ঠান্ডা কম্প্রেস করা যেতে পারে। ঠান্ডা পানিতে একটি ওয়াশক্লথ ভিজিয়ে অথবা বরফ দিয়ে একটি ব্যাগ ভরে কপালে, ঘাড়ের পেছনে বা কব্জিতে রাখা যায়। বরফ ব্যবহার করলে বরফ ও ত্বকের মাঝে একটি তোয়ালে রাখতে হবে। 

ডায়রিয়া এড়াতে খাবারে সতর্ক থাকুন

এ সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। তাই পরিবারের সদস্যরা পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কিনা এবং নিরাপদ খাবার খাচ্ছেন কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. ওয়ানাইজা রহমান।

বিশেষ করে অতিরিক্ত তেল-মশলার খাবার ও বাসি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। গরমে আরামদায়ক পোশাকের মতো আরামদায়ক খাবার নির্ধারণ করে খাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। শিশুদের জন্য ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, চপ, কাটলেট, নাগেটসের মতো খাবার না দিয়ে চিড়া, দই, তরমুজ, বাঙ্গি, লেবুজাতীয় ফল বেশি করে দিতে হবে। 

শরীরের ভাঁজে ঘাম জমতে দেবেন না

গরমে শরীরে ঘাম জমে ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে, বিশেষ করে কুঁচকিতে, আঙুলের ফাঁকে ও যৌনাঙ্গে ঘাম জমে ছত্রাক সংক্রমণের পথ তৈরি করে। 

তাই শরীরের ভাঁজগুলোতে ঘাম জমতে দেওয়া যাবে না। যতবার সম্ভব গোসল করে ঘাম ধুয়ে ফেলতে হবে। তা না হলে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। 

হঠাৎ হিমশীতল পানি পান করবেন না 

প্রচণ্ড গরমে চলার পথে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি পান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় হঠাৎ ঠান্ডা পানি খেলে গলা ব্যথাসহ বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। বাইরে থেকে ঘেমে ঘরে ফিরেও সঙ্গে সঙ্গে হিমশীতল পানি খাওয়া ঠিক নয়। 

হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়ান

ইউনাইটেড হাসপাতাল লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার ডা. ফজলে রাব্বী খান জানান, তীব্র গরমে রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা ছাড়াও পর্যাপ্ত পানি না পান করার কারণে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি না পান করলে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে লবণ ও তরল বেরিয়ে গিয়ে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। ফলে শরীর অবসন্ন ও পরিশ্রান্ত হয়ে যায়। 

কিছু ওষুধ, যেমন মূত্রবর্ধক, বিটা-ব্লকার্স কিংবা অ্যান্টি-কলিনার্জিক্স, অতিরিক্ত মদ্যপান বা মাদক সেবনও শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 

শিশু, বয়স্ক মানুষ অর্থাৎ ৬৫ বছরের বেশি বয়সী, স্থূল ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা এবং হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের এই ঝুঁকি বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

প্রয়োজনে গোসল করুন একাধিকবার

গরমে প্রয়োজনে একাধিকবার গোসল করা যেতে পারে। শরীরে ট্যালকম পাউডার ব্যবহার না করাই ভালো।

সব মিলিয়ে বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি থেকে এখনই পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না। তাই পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান, আরামদায়ক পোশাক পরা, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া এবং খাবার ও শরীরের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সতর্ক থাকাই এ সময়ে সুস্থ থাকার জন্য জরুরি।

/ইউএস/ 
সম্পর্কিত
বায়ুদূষণের শীর্ষে কিনশাসা, চতুর্থ স্থানে ঢাকা
আজ কেমন থাকবে আবহাওয়া
কেমন থাকবে আজকের আবহাওয়া
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, জিএম প্রত্যাহার
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, জিএম প্রত্যাহার
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের বড় উল্লম্ফন
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের বড় উল্লম্ফন
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে নিয়োগ, দ্রুত আবেদন করুন
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডে নিয়োগ, দ্রুত আবেদন করুন
ছাত্রদল নেতার মোটরসাইকেল আটকানোয় এসপির কার্যালয় ঘেরাও  
ছাত্রদল নেতার মোটরসাইকেল আটকানোয় এসপির কার্যালয় ঘেরাও  
সর্বাধিক পঠিত
মদিনায় ১১০ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান
মদিনায় ১১০ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে কক্সবাজারে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে কক্সবাজারে
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ‘ন্যক্কারজনক’, দ্রুত অপরাসরণ চায় ছাত্রদল
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ‘ন্যক্কারজনক’, দ্রুত অপরাসরণ চায় ছাত্রদল
ডোপ টেস্টে পজিটিভ আসায় পুলিশ সুপার বরখাস্ত
ডোপ টেস্টে পজিটিভ আসায় পুলিশ সুপার বরখাস্ত
পুলিশের খাবার পৌঁছানোর দৃশ্য বদলে দিলো নতুন ভ্যান
পুলিশের খাবার পৌঁছানোর দৃশ্য বদলে দিলো নতুন ভ্যান