বোকা প্রশ্নে লজ্জা কীসের, আজ তো সেই দিন!

“নাকটা কি সত্যিই মুখের ঠিক মাঝখানে?” “রিমোটের ব্যাটারি শেষ হয়ে এলে আমরা বোতামটা আরও জোরে চাপি কেন?” “ছবি তোলার সময় পনির কী বলে?”

প্রশ্নগুলো শুনে হয়তো মনে হতে পারে, এসব আবার কেমন প্রশ্ন! কিন্তু এমন প্রশ্নই করার দিন আজ। কারণ আজ ‘বোকা প্রশ্ন করুন দিবস’। নাম শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং এই দিবসের মূল কথাই হলো বোকা বলে কোনও প্রশ্ন নেই, প্রশ্ন না করাটাই বরং সবচেয়ে বড় ভুল।

আমরা সবাই কখনও না কখনও এমন কোনও প্রশ্ন মাথায় আসার পর চুপ করে গেছি। মনে হয়েছে, প্রশ্নটি করলে সবাই হয়তো হাসবে। বিষয়টি তো এত সহজ, এটি না জানার জন্য লজ্জা পাওয়াই স্বাভাবিক! আর সেই লজ্জাতেই প্রশ্নটি আর করা হয় না। অথচ উত্তরটি জানার সবচেয়ে সহজ পথ ছিল একবার জিজ্ঞেস করা।

‘বোকা প্রশ্ন করুন দিবস’ ঠিক এই ভয়টাই কাটাতে উৎসাহ দেয়। প্রশ্ন যত অদ্ভুতই হোক, মনে এলে করে ফেলুন। কারণ জানার ইচ্ছেটাই আসল। কেউ প্রশ্ন না করলে নতুন কিছু শেখার দরজাও খুলবে না।

বোকা প্রশ্নের ইতিহাস

১৯৮০-এর দশকে একদল শিক্ষক লক্ষ্য করেন, বোকা শোনানোর ভয়েই অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করছে না। তাই শিক্ষার্থীদের সংকোচ কাটিয়ে নিজেদের কৌতূহল প্রকাশের সুযোগ করে দিতে তাঁরা চালু করেন এই বিশেষ দিবস।

উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে দিবসটি প্রতিবছর পালিত হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে এর প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাজ্য ও ভারতেও।

প্রশ্ন করতে ভয় কেন?

স্কুলজীবনের কথা মনে করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ক্লাসে শিক্ষক বললেন, “কারও কোনও প্রশ্ন আছে?” তখন অনেকেরই মাথায় একসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরত। কিন্তু হাত ওঠেনি। মনে হতো, সবাই কী ভাববে! পাশে বসা বন্ধুটি যদি হেসে ফেলে? শিক্ষক যদি বলেন, “এটাও জানো না?”

ফলে প্রশ্নটি মাথাতেই থেকে গেল। অথচ একটি প্রশ্নের উত্তর হয়তো পুরো বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করতে পারত।

এই দিবসের উদ্দেশ্য তাই শুধু শিশুদের বেশি প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা নয়, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রশ্ন করলে কেউ হাসবে না বা কাউকে ছোট করা হবে না। বরং প্রশ্নকে দেখা হবে শেখার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে।

শিক্ষকদের জন্যও প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা কোথায় আটকে আছে, কোন বিষয়টি বুঝতে পারছে না কিংবা কোথায় আরও ব্যাখ্যা দরকার এসব বুঝতে প্রশ্ন বেশ কাজে দেয়। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর একটি ‘বোকা’ প্রশ্নও কখনও কখনও শিক্ষককে পুরো ক্লাসের শেখার ঘাটতি বুঝিয়ে দিতে পারে।

‘কেন’ থেকেই শেখার শুরু

শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় শব্দগুলোর একটি বোধ হয় ‘কেন’। এই কেনের যেন শেষ নেই। আকাশ নীল কেন? বৃষ্টি হয় কেন? চাঁদ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে কেন? পিঁপড়া এত ছোট হয়েও এত ভারী জিনিস টানে কীভাবে?

বড়রা হয়তো কোনও কোনও প্রশ্নে বিরক্ত হন, কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শেখার শুরু। কোনও বিষয় নিয়ে যত প্রশ্ন, তত নতুন উত্তর পাওয়া যায়। আর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জ্ঞান বাড়ে, চিন্তার জগৎও বড় হয়।

শুধু শিশুরাই নয়, বড়দেরও প্রশ্ন করা উচিত। কারণ বয়স বাড়লেই জানার সব শেষ হয়ে যায় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন অনেক বিষয় আসে, যার উত্তর খুঁজতে আবারও প্রশ্ন করতে হয়।

প্রশ্ন যখন একেবারেই আজব

এই দিবসে প্রশ্নের কোনও ধরাবাঁধা সীমা নেই। প্রশ্ন হতে পারে জীবনের অর্থ নিয়ে, আবার হতে পারে নাক নিয়ে!

কেউ হয়তো জানতে চাইবেন, “কোনও জিনিসের নাম এমন হলো কেন?” আবার কেউ এমন প্রশ্নও করতে পারেন, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রশ্নকর্তার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে যাবেন আশপাশের মানুষ।

এমন প্রশ্নে হাসি পেতে পারে, কিন্তু হাসির আড়ালেই থাকে কৌতূহল। আর কৌতূহল থেকেই তো নতুন কিছু জানার শুরু।

প্রশ্ন দিয়েই হোক উদ্‌যাপন

এই দিবস পালনের জন্য বিশেষ আয়োজনের প্রয়োজন নেই। গোসল করতে করতে মাথায় আসা অদ্ভুত প্রশ্নটি আজ আর চেপে রাখবেন না। কোনও বিষয় নিয়ে কৌতূহল থাকলে বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা যিনি বিষয়টি জানেন, তাকে জিজ্ঞেস করুন।

আরও মজার করে উদ্‌যাপন করতে চাইলে বন্ধুদের সঙ্গে একটি ছোট আয়োজন করা যায়। সবাই নিজেদের অদ্ভুত প্রশ্ন কাগজে লিখে একটি পাত্রে রাখতে পারেন। এরপর একে একে প্রশ্ন তুলে পড়া হবে। কে জানে, একটি প্রশ্ন থেকেই হয়তো শুরু হয়ে গেল ঘণ্টাখানেকের হাসি-আড্ডা!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া যায়। একটি মজার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন। তাতে যেমন হাসি-ঠাট্টা হবে, তেমনি জানা হয়ে যেতে পারে নতুন কোনো তথ্যও।

তাই আজ যদি মাথায় এমন কোনো প্রশ্ন আসে, যেটাকে নিজের কাছেই বোকা মনে হচ্ছে, প্রশ্নটি করে ফেলুন। উত্তরটি হয়তো আপনাকে অবাক করবে। আর উত্তর না পেলেও অন্তত এটুকু নিশ্চিত আজ আপনি বোকা প্রশ্ন করার দিনটিকে যথাযথ সম্মান জানিয়েছেন!