গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তস্বল্পতা শুধু মায়ের স্বাস্থ্যের জন্যই উদ্বেগের বিষয় নয়, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও এর প্রভাব থাকতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতায় ভোগা মায়েদের সন্তানদের মোট মস্তিষ্কের আয়তন গড়ে রক্তস্বল্পতামুক্ত মায়েদের সন্তানদের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ কম ছিল। মস্তিষ্কের নড়াচড়া, শেখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাহী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশেও পার্থক্য পাওয়া গেছে।
গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রি, সাইকোলজি অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব কেপটাউনের গবেষকেরা পরিচালনা করেন। কেপটাউনে ৩৯৪টি মা-শিশু জুটিকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। শিশুদের তিন মাস থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মস্তিষ্কের স্ক্যান করা হয়।
মস্তিষ্কের কোন অংশে পার্থক্য?
গবেষণায় পুটামেন, কডেট নিউক্লিয়াস এবং কর্পাস ক্যালোসাম- মস্তিষ্কের এই তিনটি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। এসব অঞ্চল নড়াচড়া, শেখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, নির্বাহী কার্যক্ষমতা এবং মস্তিষ্কের দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। যেমন, ১২ মাস বয়সে রক্তস্বল্পতায় ভোগা মায়েদের সন্তানদের কর্পাস ক্যালোসামের আয়তন প্রায় ৪ শতাংশ কম ছিল। ২৪ মাস বয়সে এই ব্যবধান বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া বেশির ভাগ মায়ের রক্তস্বল্পতা ছিল মৃদু মাত্রার।
এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় টডলার ও স্কুলপড়ুয়া শিশুদের নিয়ে করা গবেষণাতেও একই ধরনের মস্তিষ্কীয় পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকদের মতে, নতুন গবেষণার ফলাফল শিশুদের বিকাশসংক্রান্ত কিছু আগের পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিতে পারে। তবে এই গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি ভবিষ্যতের জ্ঞানীয় সমস্যার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ রক্তস্বল্পতা শনাক্ত করা?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগেছেন। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। রক্তস্বল্পতার সবচেয়ে সাধারণ পুষ্টিগত কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি, যদিও সংক্রমণ, প্রদাহ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও অন্যান্য কারণেও রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
রক্তস্বল্পতায় শরীরের টিস্যুতে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্ট।
গবেষকদের মতে, প্রজননক্ষম নারীদের রক্তস্বল্পতা শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গর্ভাবস্থায় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন, মাত্রা ও পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সহজলভ্য এমআরআই প্রযুক্তিতে গবেষণা
এই গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, গবেষকেরা বহনযোগ্য ‘লো-ফিল্ড’ এমআরআই স্ক্যানার ব্যবহার করেছেন। প্রচলিত হাসপাতালের এমআরআই যন্ত্রের তুলনায় এসব স্ক্যানার তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ও সহজে বহনযোগ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তিতেও শিশুদের মস্তিষ্কের একই ধরনের পার্থক্য শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সীমিত সুযোগ-সুবিধার এলাকাতেও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য উদ্যোগের প্রভাব মূল্যায়ন করা সহজ হতে পারে।
সব মিলিয়ে গবেষণাটি গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে গবেষণাটি মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্য শনাক্ত করেছে; এসব পার্থক্য প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ শেখার ক্ষমতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে একই ধরনের প্রভাব ফেলবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।