আমরা ভালো নেই... 

সামিনা আক্তার (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি ব্যাংকে অল্প বেতনের চাকরি করেন। থাকেন বোনের সংসারে। মাস্টার্স পাস করেছেন প্রায় চার বছর আগে। ছোট বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু তার বিয়ে হচ্ছে না। বারবার পাত্রী হিসেবে সামনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্লান্ত তিনি। এখন বিয়ের কথা শুনলেই ঘুমাতে পারেন না। মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করেন। বোনকে কয়েকবার বলার চেষ্টা করেও পারেননি। বাবা-মাও তাকে বোঝেন না। শেষ পর্যন্ত এক সহকর্মীর পরামর্শে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন সামিনা। চিকিৎসক জানান, এটি  মানসিক অসুস্থতা। এখন তার চিকিৎসা চলছে।

অন্যদিকে শায়লা জামান (ছদ্মনাম) সন্তানের কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সংসারে মন দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে আনন্দ পান না তিনি। সারাক্ষণ বিষণ্ন বোধ করেন। স্বামী-সন্তান কেউই তার এই বিষণ্নতা বুঝতে পারেন না। সবাই তাকে পাগল ভাবতে শুরু করেন। পরে তার স্বামীই তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক জানান, এটিও মানসিক অসুস্থতা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন খারাপ করে থাকা, চুপ হয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ ভয়াবহ উত্তেজিত হয়ে যাওয়াটা আসলে ইচ্ছাকৃত কিছু নয়। এটি একটি অসুস্থতা; মানসিক অসুস্থতা।

এখনও আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্বহীন মনে করা হয়। খানিকটা বিষণ্নতা, উদ্বেগকে মানুষ পাত্তা দেয় না। সহ্য করতে করতে যখন আর পেরে ওঠে না, তখনই যায় চিকিৎসকের কাছে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। দিন দিন এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

প্রায় প্রতি পাঁচ জনে একজন মানসিক রোগে আক্রান্ত

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রতি পাঁচ জনে একজন কোনও না কোনও মানসিক রোগে আক্রান্ত। ২০২৬ সালের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যচিত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে বিষণ্নতায় আক্রান্ত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, উদ্বেগজনিত রোগে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, শারীরিক উপসর্গজনিত ব্যাধিতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য মনোবিকারজনিত ব্যাধিতে ১ শতাংশ, আবেশ-বাধ্যতামূলক ব্যাধিতে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং দ্বিমেরু ব্যাধিতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া মাদকাসক্তির হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।

এসব রোগের প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা বুঝতে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের উপস্থিতির চিত্রও দেখতে হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ৪০০ শয্যার বিপরীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বহির্বিভাগে ৭৬ হাজার ৮৩০ জন, অন্তর্বিভাগে ৫ হাজার ১০৩ জন এবং জরুরি বিভাগে ৭ হাজার ২৩২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে টেলিসাইকিয়াট্রি সেবা নিয়েছেন ৪৮৪ জন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৯ হাজার ৬৪৯ জন। গড়ে প্রতিদিন একটি হাসপাতালে মানসিক সমস্যা নিয়ে এসেছেন ২৪৫ জনের বেশি মানুষ।

বিষণ্নতা শুধু মন খারাপ নয়

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্নতা থেকেই শুরু হয় বেশিরভাগ মানসিক সমস্যা। বিষণ্নতা শুধু মন খারাপ থাকা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ, কোনও কাজে আগ্রহ বা আনন্দ কমে যাওয়া, ঘুম ও খাওয়ার পরিবর্তন, ক্লান্তি, আত্মমূল্যবোধ কমে যাওয়া কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হলে সেটি বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে।

মানসিক রোগের পেছনে একক কোনও কারণ কাজ করে না। ব্যক্তির জৈবিক ও জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, দীর্ঘস্থায়ী চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ, দারিদ্র্য, সহিংসতা, বৈষম্য, ট্রমা, সম্পর্কের সংকট, কর্মক্ষেত্রের চাপসহ নানা বিষয় একসঙ্গে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এসব ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, প্রেম এবং প্রেম পরবর্তী হতাশা থেকে তারা আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার অনেকে চাকরি না পেয়ে দিনের পর দিন বেকার থাকা অবস্থায় সামাজিক ও পারিবারিক চাপে পড়ে বিষণ্ণতায় ভোগেন। যার শেষ পরিণতি অনেক সময় আত্মহত্যায় রূপ নেয়।

ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ ইনিস্টিটিউটের চিকিৎসক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, মানসিক রোগের চিকিৎসা মূলত তিন ধরনের হয়—একটা বায়োলোজিক্যাল, সাইকোলোজিক্যাল আর সোশিয়াল। সোশিয়ালটা পারিবারিক সহযোগিতা। বায়োলোজিক্যাল আর সাইকোলোজিক্যালটা চিকিৎসার অংশ। বাকিটা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে করতে হয়৷ তিনি বলেন, কেউ যদি বিষণ্নতায় ভোগে পরিবারের সবাইকে আগে বুঝতে হবে, সে কেন বিষণ্ন। যদি সব সময় বিষণ্ন থাকে, তবে তাকে সময় দিতে হবে। তাকে একা রাখা যাবে না। তাকে সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। সে যেন কখনোই একা বোধ না করে। তাকে রোগী হিসেবে না, বন্ধু হিসেবে বোঝাতে হবে যে বিষণ্নতা একটা রোগ। এটারও চিকিৎসা হতে পারে।

হরমোনাল সমস্যা; নতুন করে আলোচনায় এসেছে ডোপামিন

মানুষের শরীরে এক ধরনের হরমোন আছে, যা শরীরে আনন্দ তৈরি করে। প্রাথমিকভাবে বলা হয়, ভালো থাকার জন্য আনন্দে বাঁচার জন্য হরমোন তৈরি হওয়া জরুরি। কিন্তু এই হরমোন বাইরে থেকে নয়। নিজের শরীরের ভেতরেই তৈরি হয়। আগে আমরা নিজেদের বিনোদনের জন্য যে পরিমাণ সময় দিতাম, এখন কাজের চাপের কারণে নিজেকেও সেই সময়টুকুও দেওয়া হয় না। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, মা-বাবাও প্রায়শই প্রয়োজনীয় সময় পান না। এতে শরীরে ডোপামিন উৎপাদন কমে আসে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, ডোপামিন নিজেকে সুস্থ রাখার মূল মন্ত্র। আপনি হাসিখুশি থাকলে ডোপামিন রিলিজ হয়, তাতে আপনি আনন্দে থাকেন। খেলাধুলা, সামাজিক অনুষ্ঠান, আড্ডা, গল্প—যা আপনার ভালো লাগে, তাতে কিছুটা নিজেকে সময় দেওয়া উচিত। এমনকি আপন মানুষের সাথে সময় কাটালেও ডোপামিন বাড়ে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, ভালো থাকার জন্য আমাদের অনেক ক্রাইটেরিয়া বা কম্পোনেন্ট কাজ করে। শরীর এবং মন নিয়েই আমাদের অস্তিত্ব, আর মনই আমাদের চালিকাশক্তি। আমাদের সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মনের সম্পর্ক রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যের সংযুক্ততাও রয়েছে।

তিনি বলেন, কাজেই মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে আমাদের মন ভালো থাকতে হবে। আর সেই মন ভালো রাখার জন্য যে পরিবেশ দরকার, সেই পরিবেশ ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের চাহিদা, আত্মকেন্দ্রিকতা কিংবা মানবিক বিষয়গুলোর অবনতি—এসব কারণে খুব একটা ভালো থাকা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বলতে আমরা শুধু মানসিক অসুখকেই বুঝি না। মানসিক অসুখের বাইরেও মানসিক স্বাস্থ্যের বিস্তৃতি অনেক গভীরে। মন ও শরীর নিয়েই আমাদের অস্তিত্ব। আমাদের সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মনের সম্পর্ক আছে। কাজেই মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব বিবেচনা করলে মানসিক স্বাস্থ্যের যে অবনতি বা অবক্ষয় ঘটছে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে আসলে কোনও মানুষই যে একেবারে খুব ভালো আছে, তা বলা যাবে না।