প্রতিদিন অসংখ্যবার হাত ব্যবহার করি আমরা। খাবার খাওয়া, রান্না করা, বাইরে চলাফেরা, বিভিন্ন জিনিস স্পর্শ করা সব কাজেই হাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ হাত পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে অনেকেই তাড়াহুড়ো করেন। কেউ শুধু পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নেন, কেউ আবার সাবান ব্যবহার করলেও আঙুলের ফাঁক, নখের নিচ কিংবা হাতের উল্টো পিঠ পরিষ্কার করতে ভুলে যান। এতে হাতে থাকা জীবাণু থেকে যেতে পারে। এই জীবাণুই পরে খাবার, চোখ, নাক কিংবা মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
হাত ধোয়া ব্যক্তিগত পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোরও সহজ উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের নির্দেশনায় হাতের সব অংশ ভালোভাবে সাবান দিয়ে পরিষ্কার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ও সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
দৈনন্দিন কাজের সময় বিভিন্ন বস্তু ও পৃষ্ঠ স্পর্শ করার মাধ্যমে হাতে জীবাণু জমতে পারে। অপরিষ্কার হাতে খাবার ধরলে বা সেই হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করলে জীবাণু শরীরে প্রবেশের সুযোগ পায়। তাই হাত দেখতে পরিষ্কার হলেই যে তা জীবাণুমুক্ত, এমন ভাবা যাবে না।
বিশেষ করে খাবার তৈরি ও খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর এবং কাশি-হাঁচির পর হাত পরিষ্কার করা জরুরি। শিশুদের পরিচর্যার সময়ও হাত ধোয়ার অভ্যাস সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হাত ধোয়ার জন্য পরিষ্কার প্রবাহমান পানি ও সাবান ব্যবহার করুন। শুধু হাতের তালুতে সাবান মাখলেই হবে না, প্রতিটি অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
পরিষ্কার প্রবাহমান পানিতে দুই হাত ভিজিয়ে নিন। এরপর হাতের সব অংশে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাবান ব্যবহার করুন। এক হাতের তালুর সঙ্গে অন্য হাতের তালু ভালোভাবে ঘষে ফেনা তৈরি করুন। এতে হাতের সামনের অংশ পরিষ্কার হবে। এক হাতের তালু দিয়ে অন্য হাতের উল্টো পিঠ আঙুলসহ ঘষুন। এরপর একইভাবে অন্য হাতও পরিষ্কার করুন।
দুই হাতের আঙুল পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে তালু ও আঙুলের ফাঁক ভালোভাবে ঘষুন। হাত ধোয়ার সময় এই অংশটি প্রায়ই অবহেলিত থাকে। আঙুলগুলো পরস্পরের সঙ্গে আটকে এক হাতের তালুর বিপরীতে অন্য হাতের আঙুলের পেছনের অংশ ঘষুন। এরপর এক হাত দিয়ে অন্য হাতের বুড়ো আঙুল ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিষ্কার করুন। আঙুলের ডগা ও নখের আশপাশ ভালোভাবে ঘষুন। নখের নিচে ময়লা জমে থাকতে পারে বলে এই অংশ পরিষ্কার করাও জরুরি।
সবশেষে পরিষ্কার প্রবাহমান পানিতে হাত ভালোভাবে ধুয়ে সাবান সরিয়ে ফেলুন। এরপর পরিষ্কার তোয়ালে বা একবার ব্যবহারযোগ্য টিস্যু দিয়ে হাত শুকিয়ে নিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রচলিত নির্দেশনায় পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০–৬০ সেকেন্ড সময় রাখার কথা বলা হয়েছে।
দিনের সব সময় হাত ধোয়ার প্রয়োজন না হলেও কিছু নির্দিষ্ট সময়ে এই অভ্যাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— খাবার তৈরি করার আগে এবং রান্নার সময় হাত নোংরা হলে, খাওয়ার আগে কিংবা অন্য কাউকে খাওয়ানোর আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুর ডায়াপার বদলানো বা মল পরিষ্কার করার পর, কাশি, হাঁচি বা নাক ঝাড়ার পর এবং ময়লা-আবর্জনা ধরার পর কিংবা হাতে দৃশ্যমান ময়লা থাকলে।
এসব সময়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিজের পাশাপাশি পরিবারের অন্যদেরও সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
কোনও কারণে সাবান ও পানি হাতের কাছে না থাকলে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে হাতে দৃশ্যমান ময়লা বা তেল থাকলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়াই সবচেয়ে ভালো। স্যানিটাইজার ব্যবহার করলেও হাতের সব অংশে ভালোভাবে লাগিয়ে শুকানো পর্যন্ত ঘষতে হবে।
শুধু বড়রা হাত ধুলেই চলবে না, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের এই অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার নিয়ম শেখানো, হাত ধোয়ার জায়গায় সাবান ও পানি রাখা এবং বড়দের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করা যেতে পারে। শিশুদের হাত ধোয়ার সময় প্রয়োজনে বড়দের সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
হাত ধোয়া খুব সাধারণ একটি অভ্যাস হলেও এর গুরুত্ব অনেক। সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিত হাত পরিষ্কার করলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে। তাই শুধু বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসে নয়, প্রতিদিনের জীবনেই হাত ধোয়াকে পরিচ্ছন্নতার অপরিহার্য অংশ করে তোলা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)।