ত্বকের ক্যানসারের টিকায় দারুণ সাফল্যের দাবি মডার্নার

ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকা। মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ওপর পরিচালিত এক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর এই টিকা গ্রহণকারীদের দুই বছরের মধ্যে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি টিকা না নেওয়া রোগীদের তুলনায় ৪২ শতাংশ কম ছিল। তবে রোগীরা শেষ পর্যন্ত বেশি দিন বেঁচে থাকেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত হয়নি।

ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মার্ক ও মডার্না পরীক্ষামূলক টিকাটির তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ করেছে। গবেষণার ফলাফল প্রথমে মাদ্রিদে ইউরোপীয় সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির কংগ্রেসে উপস্থাপনের কথা থাকলেও কিছু তথ্য ফাঁস হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই তা প্রকাশ করা হয়।

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যানসার রিসার্চের নবনির্বাচিত সভাপতি ডা. রবার্ট ভন্ডারহাইড বলেন, মেলানোমায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এটি নতুন পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে বলে সবাই আশাবাদী। তাঁর মতে, গবেষণায় পাওয়া ফলাফল ক্যানসার চিকিৎসায় বড় ধরনের অগ্রগতির সমপর্যায়ের।

কীভাবে কাজ করে এই টিকা?

গবেষণায় মেলানোমায় আক্রান্ত ১ হাজার ১৩৭ জন রোগী অংশ নেন। তাদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর পেমব্রোলিজুমাব (কিট্রুডা) নামের একটি ইমিউনোথেরাপির ওষুধ দেওয়া হয়। এই ওষুধ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার নির্দিষ্ট বাধা দূর করে, যাতে শরীরের প্রতিরোধী কোষ ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।

অংশগ্রহণকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরীক্ষামূলক এমআরএনএ টিকা দেওয়া হয়। তাদের মোট ৯টি ডোজ দেওয়া হয়েছিল। বাকি এক-তৃতীয়াংশ পান প্লাসিবো বা কার্যকর উপাদানবিহীন বিকল্প।

টিকাটির বিশেষত্ব হলো, এটি প্রত্যেক রোগীর টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি করা হয়। এতে রোগীর টিউমারে থাকা সর্বোচ্চ ৩৪টি নির্দিষ্ট ‘নিওঅ্যান্টিজেন’ বা নতুন ধরনের প্রোটিনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর উদ্দেশ্য, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ওই প্রোটিনগুলো শনাক্ত করতে শেখানো, যাতে তা ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে।

মার্কের অনকোলজি ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. মার্জোরি গ্রিন বলেন, “এই টিকার মাধ্যমে কার্যত শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার শনাক্ত করে তা ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এমন কিছু করার স্বপ্ন দেখেছি আমরা।”

তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব টিকাটির নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে আবেদন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

এখনও নিশ্চিত নয় দীর্ঘমেয়াদি সুফল

গবেষণায় ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি কমার প্রমাণ মিললেও, টিকাটি রোগীদের সামগ্রিক আয়ু বাড়ায় কি না, তা এখনও জানা যায়নি। একই টিকার আগের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাতেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সামগ্রিক বেঁচে থাকার হার’ বা ওভারঅল সারভাইভাল ক্যানসারের চিকিৎসা কতটা কার্যকর, তা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। রোগীরা কত দিন বেঁচে থাকছেন, তা পর্যবেক্ষণ করে এই ফল নির্ধারণ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওষুধ বা টিকার নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের জন্যও এ ধরনের তথ্য প্রয়োজন হয়।

অন্য ক্যানসারেও কি কাজে আসবে?

মেলানোমার পাশাপাশি অগ্ন্যাশয় ও মস্তিষ্কের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় একই ধরনের টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, মেলানোমায় পাওয়া সাফল্য অন্য ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একইভাবে দেখা যাবে না।

মেলানোমা ইমিউনোথেরাপিতে তুলনামূলক ভালো সাড়া দেয়। অন্যদিকে, অনেক ধরনের ক্যানসার এ চিকিৎসায় ততটা সাড়া দেয় না। ফলে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকা অন্যান্য ক্যানসারে কতটা কার্যকর হবে, তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণার ফল ক্যানসার চিকিৎসায় আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে টিকাটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, রোগীদের আয়ুতে এর প্রভাব এবং অন্যান্য ক্যানসারে এর উপযোগিতা নিশ্চিত করতে আরও তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস