যেভাবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছিল রোলাঁ মুরের ‘গ্যালাক্সি’ ড্রেস

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ফ্যাশনজগতে আলোড়ন তোলা পোশাক ‘গ্যালাক্সি’ ড্রেস। বিয়ন্সে, হ্যালি বেরি, ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামসহ বহু তারকার পরনে দেখা গেছে এটি। কীভাবে একটি সাধারণ জিপার থেকে জন্ম নেওয়া এই পোশাক হয়ে উঠল ফ্যাশন-ইতিহাসের অংশ, সেই গল্পই তুলে ধরেছেন এর ডিজাইনার রোলাঁ মুরে।

১৯৯৮ সালে লন্ডন ফ্যাশন উইকে নিজের প্রথম কালেকশন প্রদর্শনের পর দ্রুত ও সাশ্রয়ী উপায়ে মানসম্মত পোশাক তৈরির পথ খুঁজছিলেন মুরে। একটি ব্রিটিশ পোশাক তৈরির স্টুডিওতে তিনি জানতে পারেন, লম্বা সেলাই করলেই যে খরচ বেড়ে যাবে, এমন নয়। এই উপলব্ধি থেকেই একটি টপকে পূর্ণাঙ্গ পোশাকে রূপ দেওয়ার ধারণা পান তিনি। এর ফল ‘গ্যালাক্সি’ শরীরের গড়নের সঙ্গে মানানসই, পেছনে বড় জিপারযুক্ত একটি ড্রেস।

পোশাকটির নকশায় ছিল স্পষ্ট নেকলাইন, কোমরে আঁটসাঁট গড়ন এবং একই সঙ্গে আরাম ও দৃঢ়তার ছাপ। মুরের ভাষায়, তিনি নারীদের জন্য পুরুষদের স্যুটের সমতুল্য একটি পোশাক তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাঁর নতুন আত্মজীবনী ‘আমি রোলাঁ মুরে—যে কসাইয়ের ছেলে পোশাক পরিয়েছেন বিশ্বকে’-এ এই নকশার পেছনের ভাবনা ও অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে।

‘গ্যালাক্সি’ ড্রেসের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল। স্কারলেট জোহানসন, নাওমি ওয়াটস ও ডিটা ভন টিজের মতো তারকারাও এটি পরেছেন। মৌসুম অনুযায়ী রং ও কাপড় বদলে মুরে বারবার পোশাকটি নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। একসময় ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের মেন্টর হিসেবেও কাজ করেন তিনি। বেকহ্যামের শুরুর দিকের নকশায়ও এই ড্রেসের অবয়বের প্রভাব দেখা যায়।

পোশাকটির পেছনের জিপার ছিল নকশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুরে একে শক্তি ও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখতেন। তবে ওয়েলসের রাজকুমারী ক্যাথরিন ও ‘হাউস অব কার্ডস’ সিরিজের অভিনেত্রী রবিন রাইটের জন্য তৈরি সংস্করণে নিরাপত্তা ও চরিত্রের প্রয়োজনে জিপার বাদ দেওয়া হয়েছিল।

মুরের মতে, ফ্যাশন সব সময় তার সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। বর্তমানে ট্রাম্প-ঘরানার কয়েকজন নারীর পোশাকে শরীরঘেঁষা শিথ ড্রেসের জনপ্রিয়তা নিয়েও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর মতে, পোশাকের ধরন সমাজের মনোভাব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে।

তবে ‘গ্যালাক্সি’ ড্রেসের পেছনে ছিল মুরের ব্যক্তিগত জীবন ও শৈশবের অভিজ্ঞতাও। গ্রামীণ ফ্রান্সে কসাইয়ের ছেলে হিসেবে বেড়ে ওঠা, মায়ের পোশাক পরার দৃশ্য এবং বাবার কাজের নিখুঁত দক্ষতা তাঁর নকশার ভাবনায় প্রভাব ফেলেছিল। আজেদিন আলাইয়া ও ইয়োহজি ইয়ামামোতোর কাজ থেকেও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি।

২০০৫ সালে বাজারে আসা পোশাকটি ২০১৫ সালেও নতুন কিনতে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ পাউন্ড খরচ হতো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার ১৫১ টাকা। এখন পুনর্বিক্রয়ের ওয়েবসাইটে এর দাম ২০০ পাউন্ডের কিছু বেশি, যা বাংলাদেশি ৩৩ হাজার ৪৬ টাকা। পোশাকটির মূল নকশায় নতুন উৎপাদন বন্ধ হলেও, এর প্রভাব রয়ে গেছে ফ্যাশনজগতে।

মুরে এখন আর নিজের ব্র্যান্ডের নেতৃত্বে নেই। কোভিড মহামারির পর ২০২১ সালে ব্র্যান্ডটি প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে যায় এবং পরে মালিকানা বদলায়। বর্তমানে নিজেকে কুইয়ার শিল্পী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মুরে মনে করেন, ‘গ্যালাক্সি’ তাঁকে শিখিয়েছে, ডিজাইনারের স্বাক্ষর তাঁর নাম নয়, বরং তাঁর নিজস্ব কৌশল।

তাঁর আত্মজীবনীটি ২২ অক্টোবর কোয়ার্কাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে ‘গ্যালাক্সি’ ড্রেসের সাফল্যের পাশাপাশি একজন স্বাধীন ডিজাইনার হিসেবে মুরের উত্থান, অভিজ্ঞতা ও ফ্যাশনজগতের পরিবর্তনের গল্প উঠে এসেছে।