নিজের মুখে ব্রণ উঠলে বিরক্তি, অথচ অন্যের ব্রণ ফাটানোর ভিডিও দেখলে মনে হয়, 'আহা, কী শান্তি!' ব্ল্যাকহেডস বেরিয়ে আসার দৃশ্য দেখে কারও গা গুলিয়ে ওঠে, আবার কেউ শেষটা না দেখে উঠতেই পারেন না। কিন্তু এমন অদভুত দৃশ্য দেখতে এত ভালো লাগে কেন?
এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে এএসএমআর-এর মতো অনুভূতি। কাগজের খসখস শব্দ, নখের টোকা কিংবা ফিসফিস করে কথা বলার মতো কিছু শব্দ ও ছন্দবদ্ধ নড়াচড়া অনেকের মনে প্রশান্তি তৈরি করে। ব্রণ ফাটানো বা ব্ল্যাকহেডস তোলার ভিডিওতেও ত্বকের কাছ থেকে তোলা দৃশ্য, একই ধরনের কাজ বারবার করা এবং যন্ত্রের মৃদু শব্দ কিছু দর্শকের কাছে আরামদায়ক মনে হতে পারে।
ব্ল্যাকহেডস বেরোলে মনে শান্তি লাগে কেন?
এই ধরনের ভিডিওতে কখনও দেখা যায় একগুচ্ছ ব্ল্যাকহেডস তোলা হচ্ছে, কখনও ব্রণ বা সিস্ট থেকে জমে থাকা পদার্থ বের করা হচ্ছে। দর্শকেরা অপেক্ষা করেন, কখন সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হবে। শেষে ত্বকের পরিবর্তন চোখে পড়লে তৈরি হতে পারে এক ধরনের তৃপ্তি।
এই প্রবণতা নতুন নয়। মার্কিন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. স্যান্ড্রা লি, যিনি 'ডা. পিম্পল পপার' নামে পরিচিত, ইউটিউবে ব্রণ ও ব্ল্যাকহেডস পরিষ্কারের ভিডিও প্রকাশ করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। পরে একই নামে তাঁর টেলিভিশন অনুষ্ঠানও শুরু হয়।
গুরগাঁওয়ের আর্টেমিস হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী পরামর্শক চিকিৎসক ডা. দীক্ষা কালরার মতে, দৃশ্যমান কোনও সমস্যা দূর হতে দেখলে মনে সাময়িক স্বস্তি তৈরি হতে পারে। ব্রণের ভেতরে জমে থাকা পদার্থ বেরিয়ে আসাকে ছোট একটি সমস্যার সমাধান বলে মনে হয়, যা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দিতে পারে।
চেন্নাইয়ের গ্লেনিগলস হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিকিতা রাভতানি মনে করেন, এর পেছনে কৌতূহলও গুরুত্বপূর্ণ। দর্শকেরা জানতে চান, ত্বক থেকে কী বেরিয়ে আসবে এবং প্রক্রিয়া শেষে ত্বক কেমন দেখাবে। অন্যদিকে, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও লাইফ কোচ ডা. সুজিত পলের মতে, দৃশ্যমান কোনও খুঁত দূর হতে দেখলে নিয়ন্ত্রণ ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তবে তা সাধারণত অল্প সময়ের জন্যই স্থায়ী হয়।
এএসএমআর, নাকি নিছক কৌতূহল?
সব তৃপ্তিদায়ক ভিডিওই এএসএমআর তৈরি করে না। ডা. কালরার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেউ ব্রণ ফাটানোর ভিডিও দেখে মাথার ত্বক থেকে ঘাড় পর্যন্ত শিরশিরে অনুভূতি পেতে পারেন, আবার কারও ভালো লাগার কারণ নিছক দৃশ্যটি দেখা। ডা. রাভতানির মতে, শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, তা দেখার আগ্রহও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে।
সমাজমাধ্যম এই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একটি ভিডিও দেখার পর একই ধরনের আরও ভিডিও সামনে আসে। দর্শকেরা দেখেন, মন্তব্য করেন, অন্যদের পাঠান। এভাবেই জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। কেউ এগুলিকে বিনোদন হিসেবে দেখেন, কেউ দৈনন্দিন চাপ থেকে মন সরানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন।
তবে যাদের আগে থেকেই ত্বক খোঁটাখুঁটি করার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বারবার এমন ভিডিও দেখা নিজের ত্বকেও একই কাজ করার তাগিদ বাড়াতে পারে। ত্বক খোঁটার পর সাময়িক স্বস্তি পাওয়া এই অভ্যাসকে আরও জোরদার করে। তাগিদ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠলে তা স্কিন-পিকিং ডিসঅর্ডার বা এক্সকোরিয়েশন ডিসঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভিডিও দেখে তৃপ্তি, নিজের ত্বকে পরীক্ষা নয়
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞকে ব্ল্যাকহেডস বের করতে দেখা আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজে ব্রণ চেপে ধরা এক বিষয় নয়। প্রদাহযুক্ত ব্রণ চেপে ধরলে ত্বকের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, প্রদাহ বাড়তে পারে এবং সংক্রমণ, কালচে দাগ ও স্থায়ী ক্ষতচিহ্নের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ডা. রাভতানি জানান, মাঝেমধ্যে ত্বক খোঁটাখুঁটি করা মানেই মানসিক সমস্যা নয়। তবে এতে ক্ষত তৈরি হলে, মানসিক অস্বস্তি বাড়লে কিংবা চেষ্টা করেও অভ্যাসটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ডা. সুজিত পলও সতর্ক করেন, বারবার ত্বক খোঁটাখুঁটি করলে প্রদাহ, সংক্রমণ ও স্থায়ী দাগ হতে পারে।
তাই পর্দায় ব্ল্যাকহেডস বেরিয়ে আসার দৃশ্য দেখে মনে মনে 'অবশেষে!' বলে তৃপ্তি পেতেই পারেন। তবে নিজের মুখে একই অভিযান শুরু না করাই ভালো। ত্বক থেকে ব্রণ বা ব্ল্যাকহেডস নিরাপদে পরিষ্কার করতে প্রশিক্ষিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি