অন্ধকারে ভূতের ভয় পেলে শরীরে কী ঘটে জানেন?

রাত গভীর। চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ খাটের নীচে খসখস শব্দ, জানলার পাশে অচেনা ছায়া! মুহূর্তে বুক ধড়ফড়, হাত-পা ঠান্ডা, গলা শুকিয়ে কাঠ। ভূতে বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, এমন পরিস্থিতিতে ভয় পেতে পারেন যে কেউ। কিন্তু জানেন কি, ভূতের ভয় শুধু মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, শরীরের ভেতরেও শুরু হয় নানা প্রতিক্রিয়া? মস্তিষ্ক বিপদের সংকেত পেলেই শরীরকে সতর্ক করে দেয়। তখন কী কী ঘটে?

অজানা কিছুকে ভয় পাওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। অন্ধকার ঘর, নির্জন জায়গা, পুরনো বাড়ি কিংবা ভূতের গল্প- এসব অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। ভূত বা অতিপ্রাকৃত সত্তার প্রতি তীব্র ভয়কে মনস্তত্ত্বে বলা হয় ‘ফ্যাসমোফোবিয়া’। তবে মাঝেমধ্যে ভূতের গল্প শুনে ভয় পাওয়া আর এই ধরনের ফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়া এক বিষয় নয়। ভয় যদি দৈনন্দিন জীবন, ঘুম বা স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূতের ভয় হোক বা অন্য কোনও বিপদের আশঙ্কা তীব্র ভয় তৈরি হলে শরীরের ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্ক পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক মনে করে শরীরকে লড়াই, পালানো কিংবা স্থির হয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। এই প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফাইট, ফ্লাইট অর ফ্রিজ রেসপন্স’। ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হতে পারে, হাত-পা কাঁপতে থাকে, ঘাম হয়, পেশিতে টান ধরে। কারও কারও গলা শুকিয়ে যায়, কথা আটকে আসে, বমি বমি ভাব হয় কিংবা পেটে অস্বস্তি দেখা দেয়। অর্থাৎ ভয় পাওয়ার মুহূর্তে শরীর যেন সত্যিকারের বিপদের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

ভূতের ভয় বেশি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে ঘুমের উপরেও। অনেকে আলো নিভিয়ে ঘুমোতে পারেন না, বার বার দরজা-জানলা পরীক্ষা করেন। ঘরের কোণে রাখা জামাকাপড় কিংবা পর্দার নড়াচড়াকেও সন্দেহজনক মনে হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে।

আবার ঘুম ভেঙে ঘরের মধ্যে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা, অথচ হাত-পা নাড়াতে বা চিৎকার করতে না পারার অভিজ্ঞতাও অনেকের হয়। একে বলা হয় ‘স্লিপ প্যারালিসিস’। ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি সময়ে মস্তিষ্ক সচেতন হয়ে উঠলেও শরীরের পেশি কিছুক্ষণের জন্য নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। তখন কারও মনে হতে পারে, বুকের উপর কেউ বসে রয়েছে কিংবা ঘরে অদৃশ্য কেউ উপস্থিত। অভিজ্ঞতাটি ভীতিকর হলেও এর সঙ্গে ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। ভূতের উপস্থিতির প্রমাণ নয়।

তবে ভয় পেলেই যে আতঙ্কে ডুবে থাকতে হবে, এমন নয়। প্রথমেই নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, অন্ধকারে দেখা প্রতিটি ছায়া বা শোনা প্রতিটি শব্দের পেছনে বাস্তব কোনও কারণ থাকতে পারে। ঘুমের আগে ভয়ের সিনেমা বা গল্প এড়িয়ে চলা, নিয়মিত সময়ে ঘুমোনো এবং ভয় পেলে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস কাজে আসতে পারে। অন্ধকারে একা থাকতে অসুবিধা হলে জোর করে নিজেকে সেই পরিস্থিতিতে ফেলার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু ভয় যদি এতটাই তীব্র হয় যে একা থাকা, ঘুমোনো কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা হলে মনোবিদ বা মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা এক্সপোজার থেরাপির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

ভূত আছে কি নেই, সেই বিতর্ক থাকুক অন্য দিনের জন্য। তবে ভূতের ভয় যে শরীরের ভেতর রীতিমতো তোলপাড় চালাতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই মাঝরাতে পর্দা নড়ে উঠলে চাদরের নীচে মুখ লুকোনোর আগে একবার জানলাটা দেখে নিন। কে জানে, ভূত নয়, হয়তো হাওয়াই দিচ্ছে!