কর্ণফুলী ও ঠেগামুখের গল্প...

বাঁকের পর বাঁকে এগিয়ে গিয়েছে রহস্যময় কর্ণফুলী নদী। নদীর প্রতিটা বাঁকই আমাদের ভীষণ মুগ্ধ করেছে, আমরা বিস্ময়ভরে তাকিয়ে দেখেছি। কখনো ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়েছি, আবার কখনো প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে এগিয়েছি। পুরো দুই দিনের প্রায় পঁচিশ ঘন্টা আমরা কর্ণফুলী নদীতে ভেসে বেড়িয়েছি! চলার পথ ছিল শান্ত, নির্জন ও রোমাঞ্চে ভরা। বলছি শুনুন সেই নির্জনতা আর রোমাঞ্চ স্পর্শ করার গল্প।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম ঠেগামুখ

ঠেগামুখ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম, স্থানীয়রা বলেন থেগামুখ। এখানে চাকমা ও মারমা নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। ঠেগামুখের কথা পত্রিকা পড়ে জেনেছিলাম, সেই জানাটাকে উস্কে দিয়েছিল বন্ধু সমীর মল্লিক। থেগামুখে এখন পর্যন্ত কোনও পর্যটকের পদচিহ্ন পড়েনি শুনে সেখানে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেলাম। শুরু হলো পরিকল্পনা। পরিকল্পনার সঙ্গে সুযোগ হয়ে এলো বাংলা নববর্ষের ছুটি। সহযোগিতা পেলাম সাংবাদিক হরি কিশোর চাকমা, বন্ধু গ্লোরি চাকমা এবং কমিউনিটি ম্যানেজার ও গুগল ড্রাইভার জাবেদ সুলতান পিয়াসের। প্রথমে ১৬ জনের দল ঠিক হলেও অনুমতি না পাওয়ায় ১৬ জন শেষ পর্যন্ত ৯ জনে গিয়ে ঠেকলো। ১৩ তারিখ রাতে আমরা রওনা হলাম রাঙামাটির উদ্দেশ্যে। নববর্ষের দিন আমরা রাঙামাটিতেই ছিলাম। দিনটি গ্লোরি চাকমার আপ্যায়নে কেটেছে। পরদিন ভোরবেলা চলে আসি সমতাঘাট। এখানে আগে থেকেই ঠিক করা মিল্টন চাকমার ট্রলারে চেপে যখন থেগামুখের উদ্দেশ্যে সমতাঘাট ছাড়ি তখন পুব আকাশে মেঘের আনাগোনা! 

ঠেগামুখের পথে...

মেঘেদের আনাগোনা ছিল ঐ পর্যন্তই, বাকিটা বৃষ্টি না পড়ার আফসোস। তবে কর্ণফুলীর সকালটা ছিল দারুণ। সেই দারুণ সকালে অসম্ভব ভালো লাগার পরশ বুলালো শুভলং-এর কাছের বৌদ্ধবিহার। পাহাড় ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধমুর্তিটি সূর্যালোকে ঝিকিমিক করছিল স্বর্ণের মতোই। দূর থেকে বুদ্ধমূতির্র এমন অসাধারণ রূপে সঙ্গীরা সবাই আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে সেখানেই আমরা প্রথম যাত্রা বিরতি নিলাম।

তারপর তো কেবলই ছুটে চলার গল্প। এভাবেই শুভলং, বরকল ও বাঙাল টিলা হয়ে ঠিক  সন্ধ্যায় আমরা ছোট হরিণা পৌঁছালাম আমরা। সীমান্ত এলাকা বলে জোন কমান্ডার লেফটেনেন্ট কর্ণেল ফেরদৌসের পরামর্শে সেদিন আর সামনে না গিয়ে ছোট হরিণাতেই রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নিই। সাজানো গোছানো খুব সুন্দর ছোট হরিণা আর ভূষণ ছড়ার গল্প বলে শেষ করা যাবে না। মনে থাকবে বিজিবির জোন কমান্ডার থেকে শুরু করে নায়েক রহমতসহ প্রতিটি সদস্যের আন্তরিক সহযোগিতার কথা। সেই সঙ্গে ভোলার নয় বাথুয়া রাখাইনকেও। বাথুয়াদার ঘরের রান্না আর তার আতিথিয়েতার গল্পও অনেক। আমরা ভোর চারটায় ছোট হরিণা ছাড়বো বিধায় তিনিও সে রাত আমাদের সঙ্গে জেগে কাটিয়েছেন। এভাবে চলতে চলতে কত জনের কাছেই না আমরা ঋণী হয়ে পড়ি! বাথুয়াদাকে সে কথা বলতে তিনি দুহাত নেড়ে বললেন, ‘আমি মুখ্য-সুখ্য মানুষ তবু বলি দাদা, ভালোবাসার আবার ঋণ হয় নাকি?’

ঠেগামুখের পথে...

ভোর ৪টা, ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। অন্ধকার ভেদ করে আমরা বের হয়ে পড়লাম। ট্রলার চলা শুরু করতেই অনুভব করি স্বপ্নের মত ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে চারদিকে। নিঝুম চারপাশ কিন্তু আমাদের ভেতর উত্তেজনা। সেই উত্তেজনাকে সঙ্গে নিয়ে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার গ্রাম ছোট হরিণা থেকে এগিয়ে চলি বড় হরিণার দিকে। বড় হরিণাতে আমাদের সেদিনের প্রথম যাত্রা বিরতি। বড় হরিণা সীমান্ত চৌকি বা বর্ডার আউটপোস্টে (বিওপি) আমাদের ঠেগামুখ যাত্রা বিষয়ে তথ্য দেওয়া ছিল। আমরা নাম এন্ট্রি করে বিজিবির দেয়া হালকা চা-নাস্তার আতিথিয়তা নিয়ে তবলাবাগ হয়ে ছুটে চলি থেগামুখপানে।

কর্ণফুলী নদী

বড় হরিণা পাড়ি দিতে দিতে কর্ণফুলীর উদ্দামতা মাতোয়ারা করেছিল আমাদের। পাশেই সবুজ গাছে ভরা পাহাড়। পাহাড়ের ধাপে ছোট ছোট বাড়ির মুগ্ধতা। এমন মুগ্ধতার মধ্যে আবার হু হু ঠাণ্ডা বাতাস আমাদের জড়িয়ে ধরলো। আরাম পেয়েই কিনা সঙ্গী সাথীরা ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল! আমি না ঘুমিয়ে সারা রাতের ক্লান্তি সরিয়ে ট্রলারের ছাদে গিয়ে বসলাম, একটু পর দেখি আনিচ মুন্সি চলে এসেছেন। তারপর সঙ্গী হলেন নওরিন আক্তার এবং চিকিৎসক নাদিয়া। এভাবেই এক সময় ঘুম সরিয়ে আরমান, লিওন, জিলানী ও নাসরিনসহ বাকি সবার যায়গা হয়েছে ট্রলারের ছাদ। প্রচণ্ড গরমের দিনেও কেমন কুয়াশা ভেজা প্রকৃতি। এক সময় সূর্যের আলো পাখা মেলতেই কর্ণফুলী নদী  চকচক করে উঠলো। সেই সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। কেবল হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হয় কর্ণফুলীর সেই রূপ। পাখির ডাক আলো ফোটার আগে থেকেই ছিল, এবার শুরু হলো  আমাদের কিচিরমিচির। দু’পাশে পাহাড় আর সে পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মধ্যখানে প্রবাহিত কর্ণফুলী নদী দিয়ে বড় হরিণা পেছনে ফেলে আমাদের ট্রলার এগিয়ে চলল বাংলাদেশের শেষ এবং সীমানা গ্রাম থেগামুখের দিকে।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম ঠেগামুখ

এখানে আমাদের ট্রলার ও এলাকার অন্যান্য ট্রলারের সঙ্গে ভারতের পতাকাবাহী ট্রলার চলতে দেখে দারুণ রোমাঞ্চিত আমরা। মনে মনে ভাবলাম সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বুঝি একেই বলে! এমন আন্তরিকতার মধ্যেই পুরো চলার পথে একটি উপলদ্ধি খুব পীড়া দিয়েছে। সেটা হচ্ছে খাবার পানির বড্ড অভাব এখানে। কতই না চড়াই পার হয়ে এলাকার মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করতে কর্ণফুলীর তীরে ছুটে আসছে! খাবার পানি বলতে স্বচ্ছ নদীর পানিই তাদের ভরসা। সে জন্য এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি বলে জানিয়েছিলেন এলাকার একমাত্র ডাক্তার বিজিবির মেডিক্যাল অফিসার ক্যাপ্টেন সজীব। কর্ণফুলী ও আশেপাশের অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দুচোখ ভরে দেখতে দেখতে এবং নদীতে পানি কম হওয়ায় একটু পর পর মারো ঠেলা হেইয়ো বলতে বলতে এক সময় পৌঁছে যাই বাংলাদেশে সীমানা প্রাচীরের শেষ গ্রাম থেগাদোর বা ঠেগামুখ।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম ঠেগামুখ

পুরো থেগামুখ এলাকা অনাবিল মুগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। সে মুগ্ধতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল থেগামুখ বিওপির প্রবেশমুখের টাইটানিক জাহাজের ডিজাইন। দূর থেকে থেগামুখ চৌকিকে মনে হচ্ছিল যেন একটা আস্ত টাইটানিক জাহাজ দাঁড়িয়ে। ধারনার চেয়ে আধাঘন্টা দেরীতে থেগামুখ পৌঁছানোর কারণে থেগাদোরের জোন কমান্ডার তার উৎকণ্ঠার কথা আমাদের জানালেন। তারপর আমাদের হালকা নাস্তা দিয়ে আপ্যায়িত করলেন। সেই ভোরবেলা বড় হরিণায় একবার চা নাস্তা পেটে পড়েছিল সুতরাং সবাই মোটামুটি ক্ষুধার্ত ছিলাম। বিজিবির দেয়া চা, বিস্কুট, পেঁয়াজু ও সিঙ্গারা তৃপ্তি নিয়েই খেলাম। নাস্তা সেরে এবার আমরা বের হই থেগা গ্রাম ঘুরে দেখতে, পাশেই সাজেকের দিকে বয়ে গেছে থেগা নদী।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম ঠেগামুখ

ঠেগামুখের বাসিন্দা

 

থেগামুখ সম্পর্কে যেমন ভেবেছিলাম তার উল্টোই দেখলাম। দূর্গম এলাকা হলেও সীমান্তঘেরা থেগামুখ বা থেগাদোর গ্রাম ছিমছাম, বেশ সাজানো গোছানো। এখানে ১০০ পরিবারের বসবাস। তার মানে সব মিলে এখানে একশটির মতো ঘর আছে। একটি চমৎকার বাজার রয়েছে। এখানকার কারবারি বা গ্রাম প্রধানের নাম পুলিন চাকমা। একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন ক্লাস চলছিল। আমাদের দেখে ছাত্ররা বের হয়ে বিস্ময় নয়নে তাকালো, তারপর আমাদের ক্যামেরায় পোজ দেওয়া শুরু করলো! এখানে রেস্ট হাউস বা রাত্রিযাপনেরও ব্যবস্থা আছে। রেস্ট হাউস বলতে এখানকার চাকমা বা মারমাদের ঘর। খাবার হোটেল আছে। খেতে চাইলে আগে থেকে খাবারের ফরমায়েশ দিয়ে রাখতে হবে। রেস্ট হাউসে আশেপাশের এলাকার লোকজন বা পাশের ভারতে মিজোরামের ডেমাক্রির অতিথি ছাড়া অন্য আর কারও থাকার সৌভাগ্য হয়নি। খাবার ব্যবস্থাও তাদেরও জন্যই- জানালেন কারবারি পুলিন চাকমা। সপ্তাহের বুধ ও শুক্রবার এখানে হাট বসে। সে দুদিন এলাকা বেশ সরগরম থাকে। হাটে আসা ক্রেতার বেশিরভাগই ওপার মিজোরামের। ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। আরেকটা মজার তথ্য হলো মিজোরামে বাংলাদেশের কুকুরের কদর খুব বেশি। স্কাই টিভির এন্টিনা প্রতিটি ঘরে ঘরে। বাজারে আছে ভিডিও ও মোবাইলের দোকান। এখানে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করলেও ভারতের মিজোরামের ডেমাক্রির মোবাইল টাওয়ার একেবারে কাছে হওয়ায় সেই নেটওয়ার্ক দিয়ে তারা ছোট হরিণাসহ বরকল হয়ে রাঙামাটি তথা সারাদেশেই যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। আমরা পুরো গ্রাম ঘুরে থেগামুখ বাজারের বটগাছ তলায় বসে কারবারি পুলিন চাকমার আতিথিয়তা নেই। চা-বিস্কিট খাই, সঙ্গে মিজোরামের কোমল পানীয়। এভাবেই ঠেগামুখে ঘন্টা দুয়েক কাটিয়ে লুসাই পর্বতমালা বা মিজোরামের নীল পাহাড়ের জলধারার মিলনস্থল কর্ণফুলী নদীর উৎসমুখ আমাদের সীমানা গ্রাম থেগামুখকে পেছনে ফেলি।

ঠেগামুখ

প্রয়োজনীয় তথ্য

রাঙামাটি থেকে ছোট হরিণা পর্যন্ত লঞ্চ সার্ভিস রয়েছে। ছোট হরিণা পর্যন্তই সাধারণের চলাচলের অনুমতি, তারপর আর অনুমতি নেই। কারণ এরপরের ছয় কিলোমিটার এলাকার পুরোটাতেই আদিবাসিদের বসবাস এবং সীমান্ত এলাকা। এখানে নদীর অর্ধেক বাংলাদেশের বাকি অর্ধেক ভারতের। নো ম্যানস ল্যান্ড বলতে যা বোঝায় পুরো ছয় কিলোমিটার এলাকা সেটাই। সুতরাং বড় হরিণা হয়ে থেগামুখ যেতে হলে অবশ্যই বিজিবির অনুমতি নিতে হবে। সে অনুমতির জন্য আপনাকে রাঙামাটির জিএসও (ইন্টেলিজেন্স) ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেট বরাবর অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। শুধুমাত্র অনুমতি পেলেই আপনি থেগামুখ যেতে পারবেন। দল যত ছোট হবে ততই সুবিধা ও অনুমতি পাওয়ার সুযোগ থাকবে। সুতরাং প্রথমে অনুমতি তারপর রাঙামাটি, তারপর সমতাঘাট বা রিজার্ভ বাজার থেকে ছোট হরিণা হয়ে থেগামুখ। যাত্রাকালে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানি সঙ্গে রাখবেন। থেগামুখে সাধারণের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা নেই আগেই বলেছি। শুধুমাত্র অনুমতি সাপেক্ষে থেগামুখ দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে। এক কিংবা দুই রাত আপনাকে ছোট হরিণা থাকতে হবে। রাত্রিযাপনের জন্য ছোট হরিণার বিদ্যুৎ ও টয়লেটবিহীন রেস্ট হাউসের ছোট্ট ঘরই একমাত্র ভরসা। দুই তিনটা খাবারের হোটেল থাকলেও আগে থেকে ফরমায়েশ না দিলে খাবার পাবেন না। তবে খাওয়া-দাওয়ার জন্য আপনি বাথুয়া রাখাইনের উপরই ভরসা করতেই পারেন। খরচ সর্বসাকুল্যে মাথাপিছু ৬৫০০ টাকা মতো পড়বে।

/এনএ/