দিনে তিন বেলা নাকি ছোট ছোট খাবার? কোন খাদ্যাভ্যাস ভালো

ভালো স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য দিনে তিনটি প্রধান খাবার খাওয়া উচিত, নাকি সেগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে খাওয়া ভালো— এই প্রশ্নটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কোনও একক উত্তর নেই যা সবার জন্য প্রযোজ্য। বরং এটি ব্যক্তির জীবনধারা, শারীরিক কার্যকলাপ, স্বাস্থ্যগত লক্ষ্য এবং ক্ষুধার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ভেরিওয়েল হেলথের’ তথ্য অনুযায়ী, যে খাদ্যতালিকা ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন ও শারীরিক চাহিদার সঙ্গে মানানসই তাই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

খাবার বেশি ভাগে খেলে কি বিপাকক্রিয়া বাড়ে

অনেকেই মনে করেন, দিনে কয়েকবার অল্প অল্প করে খেলে শরীর বেশি ক্যালোরি পোড়ায়। তবে গবেষণা বলছে, বিষয়টি তেমন নয়।

২০১৯ সালে ‘আমেরিকান কলেজ অব নিউট্রিশনে’ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, খাবার হজম করতে কিছু শক্তি খরচ হলেও তা খুবই সামান্য। দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ একই থাকলে খাবার কয়বার খাওয়া হচ্ছে তা বিপাকক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে না।

উদাহরণস্বরূপ, ২ হাজার ক্যালোরি গ্রহণকারী ব্যক্তি তা তিন বেলা বা ছয় ভাগে খেলেও মোট বিপাক হার প্রায় একই থাকে।

অন্যদিকে, ‘ক্লিনিকাল ইনভেস্টিগেশন’ জার্নালে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বয়স, হরমোন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা এবং ভালো ঘুম শক্তি বিপাককে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।

ওজন কমানো নির্ভর করে ক্যালোরি ভারসাম্যের ওপর

গবেষণা অনুযায়ী, খাবারের সংখ্যা নয়— মোট ক্যালোরি গ্রহণ ও ব্যয়ই ওজন নিয়ন্ত্রণে মূল ভূমিকা রাখে।

ওজন কমাতে হলে শরীরকে গ্রহণ করা ক্যালোরির চেয়ে বেশি ক্যালোরি পোড়াতে হয়, যা সাধারণত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক কার্যকলাপ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভব।

খাবারের গুণগত মানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

২০২৪ সালে ‘জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেনে’ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘসময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে, চিনি ও পরিশোধিত শ্বেতসারযুক্ত খাবার দ্রুত হজম হয়, যা দ্রুত শক্তি দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষুধা ফিরিয়ে আনে।

সবার জন্য এক নিয়ম নয়

খাদ্য গ্রহণের ধরন ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হতে পারে। যেমন-ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স রয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে খাবার ছোট ছোট ভাগে খাওয়া রক্তে শর্করার হঠাৎ ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। খাবারের মধ্যে দীর্ঘ বিরতির কারণে হতে পারে এমন হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধ করতেও সাহায্য করতে পারে।

অন্যদিকে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দিনে কতবার খাওয়া হচ্ছে তা রক্তে শর্করার মাত্রায় বড় কোনও পার্থক্য তৈরি করে না। এ ক্ষেত্রে খাবারের গুণগত মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কার জন্য কোন পদ্ধতি উপযুক্ত

১. যাদের দীর্ঘসময় পেট ভরা থাকে এবং ব্যস্ত সময়সূচি থাকে তাদের দিনে ৩ বেলা খাবার উপযুক্ত।

২. যারা ঘন ঘন ক্ষুধা অনুভব করেন বা শক্তি ধরে রাখতে চান তাদের ছোট ছোট ভাগে খাবার উপযুক্ত।

৩. যাদের উচ্চ শক্তি চাহিদা রয়েছে তাদের বিভক্ত খাবার বেশি উপকারী হতে পারে।

৪. যারা অতিরিক্ত স্ন্যাকস কমাতে চান তাদের জন্য নির্দিষ্ট ৩ বেলা খাবার ভালো বিকল্প।

পরিশেষে বলা যায়, খাবারের সংখ্যা নয়, বরং খাবারের গুণগত মান, ক্যালোরি ভারসাম্য এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনই স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তথ্যসূত্র

  • ‘ভেরিওয়েল হেলথ’ খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা বিষয়ক বিশ্লেষণ
  • ‘আমেরিকান কলেজ অব নিউট্রিশন’ খাবারের ফ্রিকোয়েন্সি ও বিপাকক্রিয়া বিষয়ক গবেষণা (২০১৯)
  • ‘জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেন’ খাদ্যের গুণগত মান ও তৃপ্তি বিষয়ক গবেষণা (২০২৪)
  • ‘আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (এডিএ)’ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও খাবারের সময়সূচি নির্দেশিকা
  • ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডিজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে)’ বিপাক ও পুষ্টি বিষয়ক তথ্য