অনেকের কাছেই প্রতিদিন একই খাবার খাওয়ার অভ্যাস একঘেয়ে মনে হতে পারে। তবে এই অভ্যাসেরও কিছু সুবিধা আছে। পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফুড মনোটনি’- অর্থাৎ একই ধরনের খাবার বারবার খাওয়া। এটি দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে পারে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে এবং প্রতিদিন কী খাবেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝামেলা কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের তালিকা যদি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত, বেশি চর্বিযুক্ত, লবণাক্ত বা চিনিযুক্ত খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি, খাদ্য অধ্যয়ন ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মেরিয়ন নেসলে বলেন, “যদি একই খাবার বারবার খাওয়া হয়, কিন্তু সেটি যদি সুষম ও স্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে এতে সমস্যা নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুষম খাবারে থাকা উচিত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান জুলিয়া জুমপানো বলেন, এ ধরনের খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। এমনকি কেউ যদি প্রতিদিন একই খাবার খেতে পছন্দ করেন, তবুও খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য থাকা জরুরি।
স্বাস্থ্যকর খাবারই মূল বিষয়
মায়ো ক্লিনিক কলেজ অব মেডিসিনের পুষ্টি ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ডোনাল্ড হেনসরুড বলেন, প্রতিদিনের নাশতায় তাজা ফলের সঙ্গে দই বা ওটমিল খাওয়া রুটি ও ডিমের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর।
দুপুরের খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ প্রক্রিয়াজাত মাংস হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, সাদা পাউরুটিতে উপকারী আঁশ বা ফাইবারের পরিমাণ কম।
রাতের খাবারে সবজি ও ব্রাউন রাইসের সঙ্গে গ্রিল করা মাছ বা মুরগির মাংস খাওয়া বার্গার ও ফ্রাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। ড. হেনসরুডের পরামর্শ, ভূমধ্যসাগরীয় বা ড্যাশ ডায়েটের মতো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস থেকে নিজের খাবারের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
কেন মানুষ একই খাবার খেতে পছন্দ করে
অনেক সময় এর কারণ হলে যে খাবার খুব সহজে তৈরি করা ও খাওয়া যায় মানুষ সেগুলো পছন্দ করে। ড. নেসলের ভাষায়, “এর পেছনে আরও জটিল কোনও কারণ নাও থাকতে পারে।” আবার কেউ কেউ ওজন কমানো বা নিয়ন্ত্রণের জন্য একই ধরনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস বেছে নেন।
ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন একই ধরনের খাবার খেয়েছেন, তারা ১২ সপ্তাহে বেশি বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া মানুষের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি ওজন কমিয়েছেন।
ড. হেনসরুড বলেন, ‘‘একই ধরনের খাবার খাওয়ার একটি সুবিধা হলো আপনাকে ক্যালরি গুনতে হয় না।” কারণ খাবারের বিকল্প যত বাড়ে, অনেক সময় খাওয়ার পরিমাণ ও ক্যালরিও বেড়ে যায়।
আরেকটি বিষয় হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি। জুমপানো বলেন, ‘‘প্রতিদিন নতুন মেনু তৈরি করা, বাজার করা ও রান্নার পরিকল্পনা করা অনেকের জন্য ক্লান্তিকর হতে পারে।”
সামান্য বৈচিত্র্য আনা ভালো
যদিও একই খাবার খাওয়া সহজ, তবুও বিশেষজ্ঞরা খাবারে কিছুটা বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দেন।
ড. হেনসরুড বলেন, “একদিন দইয়ের সঙ্গে ব্লুবেরি খান, পরের দিন স্ট্রবেরি বা কলা যোগ করুন। চাইলে ওটস বা বাদামও মেশাতে পারেন। এক রাতে পালং শাক খান, পরের রাতে গাজর।”
তবে কোনও একটি খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া ঠিক নয়। এতে ক্ষতিকর উপাদান বেশি পরিমাণে শরীরে জমতে পারে। যেমন, অতিরিক্ত মাছ খেলে পারদের সংস্পর্শ বাড়তে পারে। একইভাবে বেশি লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ড. হেনসরুডের পরামর্শ, “শুধু বৈচিত্র্যের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে আপস করবেন না। স্বাস্থ্যকর খাবার সব সময়ই বৈচিত্র্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
তিন বেলাই কি একই খাবার খাওয়া উচিত
প্রতিদিন তিন বেলাই একই খাবার খাওয়ার বিষয়ে জুমপানো বলেন, ‘‘এটি আদর্শ খাবার না। পুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতি যেন না হয়, তাই প্রতিদিন অন্তত এক বা দুই ধরনের খাবারে পরিবর্তন আনা উচিত।’’
তিনি আরও বলেন, “শরীরের মাইক্রোবায়োম বিভিন্ন ধরনের খাবার পছন্দ করে।”
২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নাশতা হলো এমন একটি খাবার যা মানুষ সবচেয়ে বেশি একইভাবে খেয়ে থাকে। ওই গবেষণার অন্যতম লেখক বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারি মোরওয়েজ বলেন, নাশতা সাধারণত দিনের একটি কার্যকরী অংশ। মানুষকে কাজ বা স্কুলে যেতে হয়, তাই প্রতিদিন একই নাশতা খাওয়া সহজ।
তবে দিনের বেলা যত এগোয়, মানুষ খাবারে বৈচিত্র্য ও সামাজিক অভিজ্ঞতা বেশি খুঁজতে শুরু করে। ড. মোরওয়েজ বলেন, “নাশতা হলো সকালের কাজের পথে একটি ধাপ, কিন্তু দুপুর ও রাতের খাবার অনেক সময় নিজেই একটি উপভোগের বিষয়।”
একই নাশতায় বছর পার
ড. মোরওয়েজ নিজেও কয়েক বছর ধরে একই নাশতা খাচ্ছেন। তার নাশতা হলো ভ্যানিলা প্রোটিন পাউডার, কলা, পালং শাক ও অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি স্মুদি। তিনি বলেন, এত বছর পরও এতে তিনি বিরক্ত হননি।
ড. নেসলও প্রতিদিন একই নাশতা খান। তবে দুপুর ও রাতের খাবারে তিনি পরিবর্তন আনেন। তার নাশতায় থাকে এক বাটি শ্রেডেড হুইট, সামান্য চিনি, স্কিম মিল্ক এবং নিজের বারান্দায় চাষ করা ব্লুবেরি বা স্ট্রবেরি।
প্রতিদিন একই খাবার খাওয়া ভালো না খারাপ তার উত্তর নির্ভর করে খাবারের মানের ওপর। একই খাবার হলেও যদি তা সুষম, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে তা হতে পারে সহজ ও কার্যকর খাদ্যাভ্যাস। তবে শরীরের চাহিদা পূরণে সামান্য বৈচিত্র্য রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।