সৌন্দর্য বাড়ানো, বাড়তি শক্তি কিংবা মানসিক প্রশান্তি—নতুন প্রজন্মের ফাংশনাল ড্রিংকস বা বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্যকর পানীয় এখন নানা আকর্ষণীয় বার্তা নিয়ে বাজারে হাজির। এমনকি হলিউড অভিনেত্রী জিলিয়ান অ্যান্ডারসনেরও রয়েছে নিজের একটি ফাংশনাল ড্রিংকস ব্র্যান্ড।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব পানীয় আসলে শরীরে কতটা প্রভাব ফেলে? এগুলো কি সত্যিই স্বাস্থ্যকর, নাকি কেবল আকর্ষণীয় বিপণনের কৌশল? সম্প্রতি এক গবেষণায় এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে, পাশাপাশি পরীক্ষা করা হয়েছে এসব পানীয়ের স্বাদও।
সুপারমার্কেট বা দোকানে গেলেই এখন দেখা যায়, সাধারণ কোমল পানীয়ের পাশেই উজ্জ্বল রঙের ক্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এসব নতুন ধরনের পানীয়। এগুলো দাবি করছে, মানসিক স্বচ্ছতা বাড়াবে, মনকে শান্ত করবে, কর্মক্ষমতা বাড়াবে কিংবা দুপুরের খাবারের সঙ্গে দেবে বাড়তি শক্তি।
ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যেও এসব পানীয় বেশ জনপ্রিয়। অনেক পডকাস্ট এসব ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ পায়। এমনকি জিলিয়ান অ্যান্ডারসনের ফাংশনাল ড্রিংকস ব্র্যান্ডটির নামও বেশ আলোচিত ‘জি স্পট’।
ফাংশনাল ড্রিংকস কী
আপনি যদি এখনও ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত লেমনেড বা প্রোবায়োটিক ফিজি পানীয় না খেয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, ফাংশনাল ড্রিংকস আসলে কী।
সহজ ভাষায়, যেসব পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নয়, বরং শরীর বা মস্তিষ্কের বাড়তি কোনও উপকার করার দাবি করে, সেগুলোকে বলা হয় ফাংশনাল ড্রিংকস।
এসব পানীয় তৈরি করা হয় বিভিন্ন উদ্দেশ্যে। যেমন—
- মনোযোগ বাড়াতে
- কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে
- মানসিক প্রশান্তির জন্য
- শক্তি বাড়াতে
- প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে
- অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে
- শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে
তবে হাইড্রেশনের বিষয়টি কিছুটা বিভ্রান্তিকর। কারণ শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ পানীয়ের মূল কাজই হলো শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করা।
কার জন্য তৈরি এসব পানীয়
ফাংশনাল ড্রিংকসের প্যাকেট ও ব্র্যান্ডিং দেখলেই বোঝা যায়, কোন ধরনের ক্রেতাকে লক্ষ্য করে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। যেমন, টেনজিং ও নিউটনিকের মতো বেশি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়গুলো তরুণ, ক্লাবপ্রেমী ও গেমারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে বলে মনে হয়।
অন্যদিকে, জোজো প্রিবায়োটিক ড্রিংকস এবং Living Things প্রোবায়োটিক ড্রিংকস উজ্জ্বল গোলাপি বা সবুজ ক্যানের মাধ্যমে তরুণদের নজর কাড়ছে।
আবার গুডরেজ, মাশুস, মিশন ও ওয়াটার জাঙ্কি তুলনামূলক সাদামাটা এক রঙের সরু ক্যান ব্যবহার করে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে।
সেলসিয়াসের মতো এনার্জি ড্রিংকে থাকে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন, যা প্রায় তিন কাপ এসপ্রেসোর সমান। এটি বিশেষ করে ব্যাংকার, ট্রেডার ও হেজ ফান্ড কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়।
দ্রুত বাড়ছে বাজার
প্রতি বোতল বা ক্যানের দাম প্রায় ২ থেকে ৩ পাউন্ড হওয়ায় ফাংশনাল ড্রিংকস এখন সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতন জীবনযাপনের অংশ হিসেবেও এগুলোকে প্রচার করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ফাংশনাল ড্রিংকসের বাজারের মূল্য প্রায় ১১৫ বিলিয়ন পাউন্ড যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার দ্বিগুণ হতে পারে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিনটেলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে আসা প্রতি চারটি নতুন খাবার ও পানীয়ের মধ্যে একটি পণ্যে কোনও না কোনও স্বাস্থ্য উপকারিতার দাবি করা হচ্ছে।
সত্যিই কি এত উপকার করে
বেশিরভাগ ফাংশনাল ড্রিংকস এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন এগুলো শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, জীবনযাপনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
এসব পানীয়তে দাবি করা হয়—
- মাল্টিভিটামিনের সহায়তা
- প্রাকৃতিক শক্তি
- মানসিক প্রশান্তি
- ভেতর থেকে সৌন্দর্য বৃদ্ধি
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একটি ক্যানজাত পানীয় কি সত্যিই এসব উপকার দিতে পারে? উত্তর হলো- কিছু ফাংশনাল ড্রিংকসে যোগ করা হয় ভিটামিন এ, বি১২ ও ডি। আবার থাকে ম্যাগনেশিয়াম, ক্রোমিয়াম ও মলিবডেনামের মতো খনিজ উপাদান।
কিছু পানীয়তে থাকে তথাকথিত অ্যাডাপ্টোজেনিক ও নিউট্রোপিক উপাদান। যেমন—অশ্বগন্ধা, জিনসেং, রেইশি, চাগা ও লায়নস মেইন মাশরুম।
এ ছাড়া অনেক পানীয়তে থাকে গ্রিন টি, ম্যাচা, ক্যাফেইন, এল-থিয়ানিন, সিবিডি, কোলাজেন, প্রোটিন, ফাইবার বা প্রোবায়োটিক।
তবে এসব উপাদান একসঙ্গে যোগ করা হলে তালিকাটি অনেক বড় হয়ে যায় এবং অনেক সময় স্বাদও ভালো থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ডায়েটিশিয়ান সোফি মেডলিন বলেন, ফাংশনাল ড্রিংকসের কিছু ব্যবহারিক সুবিধা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “সাধারণ কোমল পানীয়ের তুলনায় এসব পানীয়তে কিছু বাড়তি উপাদান থাকে। আমি এগুলো নিয়মিত পান করার পরামর্শ দেবো না। তবে যারা কোলা বা অন্য কম স্বাস্থ্যকর পানীয় বেশি পান করেন, তাদের জন্য এটি তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে।”
স্বাস্থ্য দাবির নিয়ন্ত্রণ
আসলে ব্র্যান্ডগুলো তাদের সব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য দাবি করতে পারে না। আইন অনুযায়ী তারা শুধু নির্দিষ্ট অনুমোদিত উপাদানের ভিত্তিতে এমন দাবি করতে পারে। এ কারণেই অনেক ফাংশনাল ড্রিংকের লেবেলে ভিটামিন সি, ডি বা বি১২-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাহলে কি ফাংশনাল ড্রিংকস প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পানীয়কে অলৌকিক স্বাস্থ্যসমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প কোনও ক্যানজাত পানীয় হতে পারে না।