সাদা লবণ না খনিজ লবণ হৃদস্বাস্থ্যের জন্য কোনটি ভালো?

সাদা লবণের বদলে খনিজ লবণ খাওয়া এখন অনেকের কাছেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খনিজ লবণকে ঘিরে নানা দাবি দেখা যায়। কেউ মনে করেন এটি রক্তচাপ কমায়, কেউ আবার মনে করেন হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমিয়ে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সত্যিই কি সাধারণ লবণের বদলে খনিজ লবণ খেলে হৃদস্পন্দনের হার কমে যায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। লবণের ধরন পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিদিন মোট কতটুকু লবণ বা সোডিয়াম গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটিই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাদা কিংবা খনিজ লবণ দুটিতেই প্রধান উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড। তাই একই পরিমাণ সোডিয়াম গ্রহণ করলে শুধু লবণের ধরন বদলানোর কারণে হৃদস্পন্দনে বড় ধরনের পরিবর্তন হওয়ার প্রমাণ নেই।

সাদা লবণ ও খনিজ লবণের পার্থক্য

সাধারণ খাবার লবণ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধিত হয়। এতে প্রায় ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকতে পারে। অনেক দেশে, বিশেষ করে ভারতে, আয়োডিনের ঘাটতি প্রতিরোধে সাধারণ লবণে আয়োডিনও যোগ করা হয়। লবণ যাতে সহজে দলা না বাঁধে, সে জন্য অ্যান্টি-কেকিং উপাদানও ব্যবহার করা হতে পারে।

অন্যদিকে, খনিজ লবণ বা রক সল্ট তুলনামূলক কম প্রক্রিয়াজাত অবস্থায় পাওয়া যায়। এতে সামান্য পরিমাণে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও আয়রনের মতো খনিজ থাকতে পারে। তবে এসব খনিজের পরিমাণ এত বেশি নয় যে, খনিজ লবণকে কোনও নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ডা. অংশুমান কৌশলের মতে, রক সল্ট বা পিংক সল্টকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাসায়নিক যৌগ মনে করা একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। হিমালয়ান পিংক সল্ট, সেল্টিক সল্ট কিংবা স্থানীয় খনিজ লবণ সব ক্ষেত্রেই শরীর মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড হিসেবেই এগুলো প্রক্রিয়াজাত করে।

অর্থাৎ, সোডিয়ামের মোট পরিমাণের দিক থেকে শরীরের জন্য দামি রক সল্ট ও সাধারণ লবণের মধ্যে খুব বড় পার্থক্য নেই। ফলে শুধু সাদা লবণের বদলে খনিজ লবণ ব্যবহার করলেই হৃদ্‌যন্ত্র বেশি সুরক্ষিত থাকবে এমন ধারণা ঠিক নয়।

বেশি সোডিয়াম কীভাবে হৃদ্‌যন্ত্রে প্রভাব ফেলে?

শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম গেলে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে শরীর বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। এর ফলে রক্তের মোট পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং ধমনির দেয়ালে চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ করলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে, যা হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে হৃদ্‌স্পন্দনের হার শুধু লবণ খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, পানিশূন্যতা, কিছু ওষুধ এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও হৃদ্‌স্পন্দনের হারকে প্রভাবিত করতে পারে।

লবণ বদলালেই কি হৃদস্পন্দন কমবে?

সাদা লবণের পরিবর্তে খনিজ লবণ খেলেই বিশ্রাম অবস্থায় হৃদ্‌স্পন্দনের হার কমে যাবে, এমন প্রমাণ নেই। দৈনিক মোট সোডিয়াম গ্রহণ যদি একই থাকে, তাহলে শুধু লবণের ধরন পরিবর্তন করে হৃদ্‌স্পন্দনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়।

খনিজ লবণে সামান্য পটাশিয়াম থাকলেও সেই পরিমাণকে উচ্চ রক্তচাপ বা দ্রুত হৃদ্‌স্পন্দনের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং অতিরিক্ত খনিজ লবণ খেলেও শরীরে সোডিয়াম বেড়ে যেতে পারে।

খনিজ লবণ মানেই ইচ্ছেমতো খাওয়া নয়

অনেকের মধ্যে ধারণা রয়েছে, খনিজ লবণ যেহেতু প্রাকৃতিক, তাই এটি যত ইচ্ছা খাওয়া যায়। বাস্তবে এমনটা নয়। খনিজ লবণেও যথেষ্ট সোডিয়াম থাকে। সালাদ, ফল কিংবা রান্না করা খাবারের ওপর বেশি করে খনিজ লবণ ছড়িয়ে খেলে মোট সোডিয়াম গ্রহণ বরং বেড়ে যেতে পারে।

ফোর্টিস হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের পরিচালক ও ইউনিট হেড ডা. যোগেশ কে. ছাবরা সতর্ক করেছেন, খনিজ লবণকে নিরাপদ মনে করে বেশি ব্যবহার করলে শরীরে আগের চেয়ে বেশি সোডিয়াম ঢুকতে পারে। এর ফলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি রক্তচাপও দীর্ঘসময় বেশি থাকতে পারে।

ম্যাক্স হেলথকেয়ারের সিটিভিএস বিভাগের প্রিন্সিপাল কনসালট্যান্ট ডা. ঋত্বিক রাজ ভূঁইয়ার মতে, দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্‌যন্ত্রের চাপ ও হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন মোট লবণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আয়োডিনের কথাও মনে রাখতে হবে

খনিজ লবণের জনপ্রিয়তার কারণে অনেকেই আয়োডিনযুক্ত সাধারণ লবণ পুরোপুরি বাদ দিচ্ছেন। এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন। অপরিশোধিত খনিজ লবণে সাধারণত বাড়তি আয়োডিন যোগ করা হয় না। অথচ থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য।

থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদ্স্পন্দনের স্বাভাবিক হার বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে। আয়োডিনের ঘাটতি থেকে থাইরয়েডের কার্যকারিতায় সমস্যা তৈরি হলে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ধীর বা দ্রুত হতে পারে।

তাই আয়োডিনযুক্ত লবণ পুরোপুরি বাদ দেওয়ার আগে খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়োডিন পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে আসলেই কী করবেন?

হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু লবণের ধরন পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে মোট লবণ গ্রহণ কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন মোট লবণ গ্রহণ ৫ গ্রামের কম রাখা উচিত।

শুধু রান্নার লবণ নয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, রেডিমেড সস ও বেকারি খাবার থেকেও শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম ঢুকতে পারে। তাই এসব খাবারের পরিমাণ কমানোও জরুরি।

অন্যদিকে, খনিজ লবণে থাকা সামান্য খনিজের ওপর নির্ভর না করে কলা, ডাবের পানি, পালংশাক, ডাল ও মিষ্টি আলুর মতো খাবার থেকে পটাশিয়াম নেওয়া যেতে পারে। তবে কিডনির রোগ থাকলে পটাশিয়াম বাড়ানোর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নিয়মিত শরীরচর্চাও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত হাঁটা, সাঁতার বা সাইক্লিংয়ের মতো ব্যায়াম নিয়মিত করার পাশাপাশি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম হৃদ্‌স্পন্দন ও সামগ্রিক হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?

বিশ্রাম অবস্থায় হৃদস্পন্দন নিয়মিতভাবে প্রতি মিনিটে ১০০ বারের বেশি থাকলে তা ট্যাকিকার্ডিয়া হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এমনটা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এ ছাড়া হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা, বুকে অস্বস্তি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

সবশেষে মনে রাখা জরুরি, সাদা লবণ থেকে খনিজ লবণে বদল করাই হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখার মূল চাবিকাঠি নয়। কোন লবণ খাচ্ছেন তার পাশাপাশি কতটা খাচ্ছেন, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস কেমন, শরীরচর্চা করছেন কি না এবং কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে কি না এসব বিষয়ই হৃদস্বাস্থ্যের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ থাকলে শুধু লবণ পরিবর্তন করে চিকিৎসা বন্ধ করা কখনোই উচিত নয়।

সূত্র: এনডিটিভি