সকালের ব্যায়াম নিয়ে অনেকেরই আলাদা অভ্যাস আছে। কেউ ঘুম থেকে উঠেই জুতা পরে হাঁটা বা দৌড়াতে বেরিয়ে পড়েন, আবার কেউ সামান্য কিছু না খেয়ে ব্যায়াম করার কথাই ভাবতে পারেন না। বিশেষ করে ওজন কমাতে চান এমন অনেকের ধারণা, খালি পেটে শরীরচর্চা করলে শরীর দ্রুত চর্বি পোড়ায়। কিন্তু সত্যিই কি খালি পেটে ব্যায়াম করলে বাড়তি চর্বি বেশি ঝরে? নাকি এতে শরীরের ওপর উল্টো চাপ তৈরি হতে পারে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, সুস্থ মানুষের জন্য খালি পেটে ব্যায়াম করা সম্ভব। তবে এটি সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। ব্যায়ামের ধরন, তীব্রতা, সময়কাল, ব্যক্তিগত শারীরিক সক্ষমতা এবং দিনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস সবকিছুর ওপর নির্ভর করে খালি পেটে ব্যায়াম আপনার জন্য কতটা কার্যকর হবে।
রাতে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা না খেয়ে ঘুমানোর পর সকালে শরীরে জমা কার্বোহাইড্রেট বা গ্লাইকোজেনের মজুত কিছুটা কমে যায়। বিশেষ করে লিভারে থাকা গ্লাইকোজেনের পরিমাণ কম থাকায় শরীরকে শক্তি জোগাতে বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আসে। এ সময় ইনসুলিনের মাত্রাও তুলনামূলক কম থাকে এবং শরীর শক্তির জন্য সঞ্চিত চর্বি থেকে বেশি ফ্যাটি অ্যাসিড ব্যবহার করতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই ‘ফাস্টেড কার্ডিও’ বা খালি পেটে কার্ডিও করার ধারণাটি জনপ্রিয় হয়েছে। হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার হাঁটা, হালকা জগিং কিংবা সহজ যোগব্যায়ামের সময় খালি পেটে থাকলে শরীর কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় চর্বি থেকে তুলনামূলক বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে।
তবে ব্যায়ামের সময় শরীর বেশি চর্বি ব্যবহার করছে মানেই যে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের চর্বি বেশি কমবে, তা নয়। ওজন ও শরীরের চর্বি কমানোর ক্ষেত্রে পুরো দিনের ক্যালোরি গ্রহণ ও ব্যয়ের ভারসাম্য, খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খালি পেটে ব্যায়ামের সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো এভাবে ব্যায়াম করলে শরীর দ্রুত চর্বি পোড়ায়। ব্যায়ামের সময়ের হিসেবে বিষয়টি আংশিক সত্য হলেও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ক্ষেত্রে ছবিটা ভিন্ন।
খালি পেটে হালকা বা মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করলে শরীর তাৎক্ষণিক শক্তির জন্য তুলনামূলক বেশি চর্বি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু দিনের অন্য সময়ে শরীরের শক্তি ব্যবহারের ধরনও বদলে যায়। ফলে শুধু ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের একটি ব্যায়াম সেশনে বেশি চর্বি ব্যবহৃত হয়েছে বলেই শেষ পর্যন্ত শরীরের মোট চর্বি বেশি কমার সম্পর্ক নেই।
গবেষণাতেও দেখা গেছে, খালি পেটে ব্যায়াম করলে ব্যায়ামের সময় ফ্যাট অক্সিডেশন বা চর্বি থেকে শক্তি উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু মোট ক্যালোরি গ্রহণ একই থাকলে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওজন বা চর্বি কমানোর ক্ষেত্রে খালি পেটে ব্যায়ামের বিশেষ বাড়তি সুবিধা সবসময় পাওয়া যায় না।
ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. পুষ্পিন্দর সিং বাজাজের মতে, হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার কার্ডিওর ক্ষেত্রে খালি পেটে ব্যায়াম একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে। তবে উচ্চ তীব্রতার ব্যায়াম, ভারী ওজন তোলা কিংবা অ্যাথলেটিক কন্ডিশনিংয়ের সময় শরীরে পর্যাপ্ত গ্লাইকোজেন না থাকলে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা কমতে পারে। এতে দ্রুত পেশিতে ক্লান্তি আসার পাশাপাশি ব্যায়ামের সময় শরীরের ভঙ্গি ঠিক রাখতে সমস্যা এবং চোটের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, ব্যায়ামের আগে খাবার খাবেন কি না সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ওজন কমানোর চিন্তা না করে ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খালি পেটে ব্যায়াম সবার জন্য আরামদায়ক নাও হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘসময় বা উচ্চ তীব্রতার শরীরচর্চার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব কিংবা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
শরীরে গ্লাইকোজেনের মজুত কম থাকা অবস্থায় ভারী ওজন তোলা বা দ্রুতগতির ব্যায়াম করলে পেশির ওপরও বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
খালি পেটে ব্যায়ামের সঙ্গে শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ারও পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে, দীর্ঘদিন মানসিক চাপ থাকলে কিংবা শরীর আগে থেকেই ক্লান্ত থাকলে কঠিন ব্যায়াম আরও বেশি কষ্টকর মনে হতে পারে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত হাঁটা, হালকা সাইক্লিং, সহজ মোবিলিটি এক্সারসাইজ কিংবা হালকা যোগব্যায়ামের মতো কম তীব্রতার শরীরচর্চা অনেক সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক খালি পেটেই করতে পারেন। যদি ব্যায়ামের সময় শরীর স্বাভাবিক ও সতেজ লাগে, তাহলে আলাদা করে খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
তবে ভারী ওজন তোলা, পাওয়ারলিফটিং, হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং বা এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দৌড়ানোর মতো কঠিন ব্যায়ামের ক্ষেত্রে আগে কিছু খাওয়া বেশি উপযোগী হতে পারে। এসব ব্যায়ামে দ্রুত শক্তির প্রয়োজন হয় এবং কার্বোহাইড্রেট গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
সকালে এমন কঠিন ব্যায়াম করার পরিকল্পনা থাকলে ব্যায়ামের প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে হালকা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যেতে পারে। কলা বা সহজপাচ্য অন্য কোনও হালকা খাবার এ ক্ষেত্রে উপযোগী হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যায়ামের সময় নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা। খালি পেটে শরীরচর্চা করতে গিয়ে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বল লাগা, বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি হলে জোর করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে বিরতি নিয়ে পানি পান করতে হবে এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা খাবার গ্রহণ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত সুস্থ থাকার জন্য শুধু খালি পেটে ব্যায়াম করার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়ামের মাত্রা ঠিক রাখাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনডিটিভি









