আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে জ্বর, গলাব্যথা, সর্দি-কাশির পাশাপাশি পেটের গোলমালে ভুগছেন অনেকে। কারও জ্বরের সঙ্গে দুর্বলতা ও গা ম্যাজম্যাজ করছে, আবার কারও ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে ডায়রিয়া, বদহজম কিংবা পেটের অস্বস্তি। এমন অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নেওয়ার পাশাপাশি খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
অসুস্থ অবস্থায় শরীরের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত তরল, সহজপাচ্য খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম। ভারী বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবারের বদলে হালকা খাবার বেছে নিলে অনেকেরই খেতে সুবিধা হয়।
গলাব্যথা ও কাশিতে কী খেতে পারেন
গলা খুসখুস করা বা ব্যথা থাকলে উষ্ণ তরল পানীয় কিছুটা আরাম দিতে পারে। আদা দিয়ে হালকা চা বা গরম পানিতে মধু মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তবে এক বছরের কম বয়সি শিশুকে কখনও মধু দেওয়া উচিত নয়।
হালকা গরম পানিতে লেবু ও মধু মিশিয়েও পান করা যায়। খুব গরম পানীয় না খাওয়াই ভালো, কারণ অতিরিক্ত গরম তরল গলার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
আদা বা তুলসী দিয়ে তৈরি হালকা পানীয়ও অনেকে গলাব্যথা ও সর্দির সময়ে খান। তবে এগুলোকে সংক্রমণ সারানোর ওষুধ হিসাবে না দেখে আরামদায়ক পানীয় হিসাবেই বিবেচনা করা উচিত।
শরীর দুর্বল হলে সহজপাচ্য খাবার
জ্বরের সময় খাওয়ার ইচ্ছে কমে যেতে পারে। তাই একবারে অনেকটা খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়া যেতে পারে।
পাতলা ডাল, হালকা সবজির স্যুপ, নরম ভাত, খিচুড়ি কিংবা সেদ্ধ খাবার এ সময়ে উপযোগী হতে পারে। মুগ ডাল ও নরম সবজি দিয়ে তৈরি পাতলা খিচুড়ি যেমন সহজে খাওয়া যায়, তেমনই এতে কার্বোহাইড্রেট ও কিছুটা প্রোটিনও পাওয়া যায়।
দই সহ্য হলে অল্প পরিমাণে সাধারণ দই খাওয়া যেতে পারে। তবে ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যা থাকলে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর সমস্যা বাড়ছে কি না, তা লক্ষ্য করা দরকার।
পেট খারাপ হলে পানিই প্রথম
ডায়রিয়া বা বমি হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যেতে পারে। তাই শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না, পানিশূন্যতা ঠেকানোও জরুরি।
এ ক্ষেত্রে পরিমাণমতো পানি পান করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে খাবার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। একসঙ্গে অনেকটা পানি পান করতে কষ্ট হলে অল্প অল্প করে বারবার পান করা ভালো।
পেটের সমস্যা থাকলে নরম ভাত, কলা, টোস্ট বা হালকা খিচুড়ির মতো সহজপাচ্য খাবার অনেকের জন্য আরামদায়ক হতে পারে। খাবার সহ্য হচ্ছে কি না, সেটাও খেয়াল রাখা জরুরি।
যে খাবারগুলো আপাতত এড়িয়ে চলবেন
অসুস্থ অবস্থায় তেলেভাজা ও অতিরিক্ত মশলাদার খাবার না খাওয়াই ভালো। ফাস্টফুড, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার এবং খুব ভারী খাবারও এড়িয়ে চলতে পারেন।
ডায়রিয়া বা পেটের গোলমালের সময় অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার হজমে অস্বস্তি বাড়াতে পারে। একইভাবে রাস্তার খোলা জায়গায় তৈরি শরবত বা কাটা ফল খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা দরকার, কারণ পরিষ্কার পানি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত না হলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। ফ্রিজে দীর্ঘক্ষণ রাখা বা বাসি খাবারও অসুস্থ অবস্থায় না খাওয়াই নিরাপদ।
‘ডিটক্স’ পানীয় নিয়ে সতর্ক থাকুন
জ্বর বা পেটের অসুস্থতা সারাতে বিভিন্ন ধরনের ‘ডিটক্স’ পানীয়ের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে রোগ সারিয়ে দেয় এমন দাবি সব ধরনের পানীয়ের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
অসুস্থ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, পুষ্টিকর ও সহনীয় খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা। শুধু ঘরোয়া পানীয়ের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
সাধারণ জ্বর বা পেটের সমস্যা অনেক সময় কয়েক দিনের মধ্যে কমে যায়। কিন্তু জ্বর দীর্ঘদিন থাকলে, বারবার বমি, রক্তমিশ্রিত পায়খানা বা প্রচণ্ড পেটব্যথা কিংবা শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি কোনও রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার সময় আরও বেশি সতর্ক থাকা দরকার।
খাবার শরীরকে সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু জ্বর বা সংক্রমণের মূল কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার বিকল্প নয়। তাই উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।