চোখের চারপাশে হলুদ পিণ্ড জমছে? কারণ ও করণীয় জেনে নিন

আয়নায় মুখ দেখার সময় চোখের পাতার আশপাশে ছোট ছোট হলুদ দাগ বা উঁচু হয়ে থাকা অংশ চোখে পড়ছে? শুরুতে তেমন সমস্যা না হলেও ধীরে ধীরে এগুলো বড় বা বেশি দৃশ্যমান হলে অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।

চোখের পাতার ত্বকে এ ধরনের নরম, হলুদাভ জমাটকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় জ্যানথেলাসমা। এটি সাধারণত ব্যথাহীন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয়। তবে শরীরে চর্বি বা লিপিডের মাত্রা অস্বাভাবিক থাকলে এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই এমন দাগ দেখা দিলে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে না দেখে রক্তের কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানোও যুক্তিযুক্ত।

কেন এমন হয়?

জ্যানথেলাসমায় ত্বকের নিচে চর্বিযুক্ত পদার্থ জমা হয়। অনেকের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকলে এর সঙ্গে জ্যানথেলাসমার সম্পর্ক দেখা যায়। তবে সবার ক্ষেত্রেই যে কোলেস্টেরল বেশি থাকবে, এমন নয়।

বয়স, বংশগত প্রবণতা এবং শরীরের বিপাকীয় কিছু সমস্যাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শুধু চোখের পাতার দাগ দেখে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

কোলেস্টেরল কমালেই কি দাগ চলে যাবে?

এখানেই একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা ও প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের মাধ্যমে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে সামগ্রিক হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।

তবে একবার জ্যানথেলাসমা তৈরি হয়ে গেলে শুধু কোলেস্টেরল কমালেই সেটি পুরোপুরি মিলিয়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। দাগ বা পিণ্ডের আকার ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

দেখতে না চাইলে কী করা যায়?

জ্যানথেলাসমা দূর করার জন্য চিকিৎসকেরা কয়েক ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কোনটি উপযুক্ত হবে, তা ত্বকের অবস্থা, পিণ্ডের আকার ও চোখের পাতার অবস্থান দেখে বিশেষজ্ঞ ঠিক করেন।

১. কেমিক্যাল পিল: নির্দিষ্ট ধরনের রাসায়নিক, যেমন ট্রাইক্লোরোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড ব্যবহার করে জমাট অংশটি ধীরে ধীরে অপসারণের চেষ্টা করা হয়। চোখের আশপাশের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এই চিকিৎসা অবশ্যই প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে করানো প্রয়োজন।

২. লেজার চিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্যান্য ধরনের লেজার ব্যবহার করে জ্যানথেলাসমার অংশটি অপসারণ করা হয়। ক্ষত কতটা গভীর হবে এবং পরে দাগ থাকবে কি না এসব বিষয় চিকিৎসার আগে বিবেচনা করা হয়।

৩. ক্রায়োথেরাপি: অতি ঠান্ডা পদার্থ ব্যবহার করে আক্রান্ত কোষের চিকিৎসা করা হয়। পদ্ধতিটি কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হলেও চোখের পাতার মতো সংবেদনশীল জায়গায় এটি করার জন্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন জরুরি।

৪. রেডিওফ্রিকোয়েন্সি: রেডিওফ্রিকোয়েন্সি শক্তি ব্যবহার করে জমাট অংশ অপসারণের একটি পদ্ধতিও রয়েছে। নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক এটি বিবেচনা করতে পারেন।

৫. অস্ত্রোপচার: পিণ্ড বড় হলে বা চোখের পাতার গঠনে সমস্যা তৈরি করলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা বাদ দেওয়া হতে পারে। তবে চিকিৎসার পরেও কিছু ক্ষেত্রে একই জায়গায় আবার জ্যানথেলাসমা দেখা দিতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

চোখের পাতায় নতুন কোনো হলুদ দাগ বা পিণ্ড দেখা দিলে নিজে থেকে কোনো ক্রিম, অ্যাসিড বা রাসায়নিক ব্যবহার করবেন না। বিশেষ করে চোখের খুব কাছের ত্বকে ঘরোয়া উপায়ে এটি পোড়ানোর চেষ্টা করলে চোখ ও ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।

প্রথমবার এমন দাগ দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি থাকলে সেগুলোও নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

জ্যানথেলাসমা সাধারণত জরুরি সমস্যা নয়। তবে এটি দেখা গেলে শরীরের সামগ্রিক বিপাকীয় ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো একবার যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।