রোজ রক্ত পাতলা হওয়ার ওষুধ খাচ্ছেন? বাড়তে পারে বিপদ

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। তাই অনেকেই আগেভাগে সতর্ক হতে প্রতিদিন কম মাত্রার অ্যাসপিরিন খেতে শুরু করেন। কারও কারও ধারণা, এই ওষুধ রক্ত পাতলা রাখবে, ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত অ্যাসপিরিন খাওয়ার অভ্যাস কি আদৌ নিরাপদ? বিশেষ করে ষাটোর্ধ্বদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস থেকেই বাড়তে পারে গুরুতর রক্তক্ষরণের ঝুঁকি।

অ্যাসপিরিন রক্তের প্লেটলেটের কার্যকারিতা কমিয়ে জমাট বাঁধার প্রবণতা হ্রাস করে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তবে যাদের আগে হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ইতিহাস নেই, তাদের ক্ষেত্রে কেবল প্রতিরোধের উদ্দেশে নিয়মিত অ্যাসপিরিন খাওয়ার সুফল সব সময় ঝুঁকির চেয়ে বেশি হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস টাস্ক ফোর্সের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের প্রথমবার হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঠেকাতে নতুন করে অ্যাসপিরিন শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয় না। কারণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তক্ষরণের আশঙ্কাও বাড়ে।

কাদের ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন প্রয়োজন হতে পারে?

যাদের আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, স্ট্রোক হয়েছে কিংবা করোনারি স্টেন্ট বা বাইপাস সার্জারি হয়েছে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই চিকিৎসক নিয়মিত কম মাত্রার অ্যাসপিরিন দিতে পারেন। একে বলা হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিরোধ। তবে রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, রক্তক্ষরণের ঝুঁকি এবং অন্যান্য ওষুধের কথা বিবেচনা করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলেই যে প্রত্যেককে অ্যাসপিরিন খেতে হবে, এমন নয়।

কী কী বিপদ হতে পারে?

অ্যাসপিরিনের অন্যতম বড় ঝুঁকি হল পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্তক্ষরণ। নিয়মিত সেবনে কারও কারও পেটে জ্বালা, আলসার কিংবা পাকস্থলী থেকে রক্তপাত হতে পারে। মলের রং কালো হয়ে যাওয়া, রক্তবমি বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

শুধু পাকস্থলী নয়, মস্তিষ্কের ভেতরেও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে বয়স বেশি হলে, আগে থেকে আলসার বা রক্তক্ষরণের ইতিহাস থাকলে কিংবা রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধের অন্য ওষুধ খেলে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা লিভারের অসুখ থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন খাওয়া উচিত নয়।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও অ্যাসপিরিন নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমে যেতে পারে এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। অ্যাসপিরিন সেই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তাই জ্বর বা ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ খাবেন না।

স্ট্যাটিন কি রক্ত পাতলা করার ওষুধ?

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি অ্যাসপিরিন ও স্ট্যাটিন এক ধরনের ওষুধ নয়। অ্যাসপিরিন রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা কমায়, আর স্ট্যাটিন রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসক স্ট্যাটিন দিতে পারেন। এই ওষুধের প্রয়োজনীয়তা ও মাত্রা রোগীভেদে আলাদা। তাই অ্যাসপিরিনের মতো স্ট্যাটিনকেও নিজের ইচ্ছায় শুরু বা বন্ধ করা ঠিক নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাসপিরিন খেলে নিজে থেকে তা বন্ধ করবেন না। আবার বয়স ষাট পেরিয়েছে বলেই প্রতিদিন অ্যাসপিরিন খেতে হবে, এমন ধারণাও ভুল। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি, আগের রোগের ইতিহাস, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বিচার করেই চিকিৎসক ঠিক করবেন কোন ওষুধ প্রয়োজন। সুস্থ হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাবার, ধূমপান এড়ানো এবং রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।