‘রোদ হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে’—শৈশবে হঠাৎ রোদঝলমলে আকাশে বৃষ্টি নামলে এমন ছড়া বা লোককথা কে না শুনেছে! বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, অথচ মাথার ওপর রোদের তেজ; দৃশ্যটাও যেন একটু অন্য রকম। আর আমাদের লোকমুখে সেই অদ্ভুত সুন্দর মুহূর্তের নামই ‘খেঁকশিয়ালের বিয়ে’। কিন্তু সত্যিই কি তখন কোথাও শিয়ালের বিয়ে হয়? এই কথারই বা জন্ম কোথায়?
উত্তরটা সরল নয়। কারণ ‘খেঁকশিয়ালের বিয়ে’ কোনো বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, আবার নিছক অর্থহীন ছড়াও নয়। এর পেছনে আছে প্রকৃতিকে মানুষের কল্পনা দিয়ে বোঝার এক পুরোনো প্রবণতা। আর আশ্চর্যের বিষয়, একই কল্পনা পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা ভাষায়, নানা প্রাণীকে ঘিরে দেখা গেছে।
এক আকাশে রোদ-বৃষ্টি
প্রথমে বিজ্ঞানের কথাই বলা যাক। রোদ ও বৃষ্টি একসঙ্গে হওয়া অস্বাভাবিক মনে হলেও আবহাওয়ার দৃষ্টিতে এটি স্বাভাবিক একটি ঘটনা। বৃষ্টি অনেক সময় স্থানীয় ও বিচ্ছিন্ন মেঘ থেকে আসে। ফলে আকাশের একটি অংশে বৃষ্টির মেঘ থাকলেও অন্য অংশে সূর্য দেখা যেতে পারে।
আবহাওয়াবিদ্যার ভাষায়, শাওয়ার্স সাধারণত বিচ্ছিন্ন ও স্থানীয় প্রকৃতির হয়; তাই একই সময় কাছাকাছি জায়গায় বৃষ্টি ও রোদের ব্যবধান তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শাওয়ার্স সাধারণত পৃথক মেঘ থেকে আসে এবং এক জায়গায় বৃষ্টি হলেও কাছের জায়গা শুকনো থাকতে পারে। অর্থাৎ আকাশে তখন শিয়ালের বিয়ের কোনো আয়োজন চলছে না। চলছে প্রকৃতির নিজস্ব খেলা।
কিন্তু মানুষ তো শুধু প্রকৃতির খেলা দেখে থেমে থাকেনি। যেখানে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা পৌঁছায়নি, সেখানে গল্প পৌঁছেছে। আর সেই গল্পেই বিয়ে বসেছে খেঁকশিয়ালের।
ছড়াটি শুধু ছড়া নয়
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও প্রচলিত লোককথা হিসেবে ‘রোদ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে’ কথাটি এখনও পরিচিত। এই ছড়াটিকে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রচলিত লোককথা হিসেবেই উল্লেখ করা হয়।
বাংলা লেখালেখিতেও এর ব্যবহার নতুন নয়। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও রোদ-বৃষ্টির এমন মুহূর্তেও এটি ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে এটি চৈত্র-বৈশাখের প্রকৃতি, বৃষ্টি ও গ্রামীণ বিশ্বাসের প্রসঙ্গের সঙ্গে এসেছে।
লোকমুখে প্রচলিত এই ছড়ার প্রথম রচয়িতা কে, ঠিক কোন সময় থেকে এটি বাংলায় প্রচলিত হলো, কিংবা কোন অঞ্চল থেকে এর শুরু; তার নির্ভরযোগ্য প্রাচীন দলিল পাওয়া যায় না। ফলে ‘এই ছড়া অমুক দেশ থেকে বাংলায় এসেছে’, এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়া যায় না।
শুধু বাংলার খেঁকশিয়াল নয়
রোদ-বৃষ্টি একসঙ্গে হওয়ার ঘটনাকে শিয়ালের বিয়ের সঙ্গে যুক্ত করার বিশ্বাস পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। জাপানে একে বলা হয়, কিতসুনে নো ইয়োমেইরি। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘শিয়ালের বিয়ে’ বা ‘শিয়াল-কনের বিয়ে’। জাপানি লোকবিশ্বাসে রোদ থাকা অবস্থায় বৃষ্টি নামলে মনে করা হয়, কোথাও গোপনে শিয়ালদের বিয়ের শোভাযাত্রা চলছে।
১৯১৬ সালে প্রকাশিত দ্য অ্যালাইস ফেয়ারি বুক এর ‘দ্য ফক্স ওয়েডিং’ গল্পেও এমন একটি দৃশ্য আছে। সেখানে শিয়াল-কনে বরপক্ষের বাড়িতে যাওয়ার সময় বৃষ্টি পড়ছিল, অথচ সূর্য তখনও জ্বলছিল। বইটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, জাপানে রোদ থাকা অবস্থায় এমন বৃষ্টিকে ‘শিয়ালের বউ তার স্বামীর বাড়ি যাচ্ছে’ বলে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ অন্তত এক শতাব্দী আগে এই বিশ্বাস লিখিত আকারে নথিবদ্ধ ছিল।
তবে বিশ্বাসটি তারও আগে জাপানি লোকজ সংস্কৃতিতে প্রচলিত ছিল। জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে কিতসুনে নো ইয়োমেইরি শুধু রোদ-বৃষ্টির ঘটনাই নয়, শিয়ালের বিয়ের নানা লোককথা ও অতিপ্রাকৃত কাহিনির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
ভারতেও প্রচলিত আছে ‘শিয়ালের বিয়ে’
জাপানের গল্প শুনে মনে হতে পারে, তাহলে কি বাংলার ‘খেঁকশিয়ালের বিয়ে’ সেখান থেকেই এসেছে? এমনটা নিশ্চিত করে বলার মতো প্রমাণ নেই। কারণ দক্ষিণ এশিয়ারও বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের বিশ্বাস পাওয়া যায়। বিহারে রোদ-বৃষ্টিকে বলা হয় ‘সিয়ার কি বিবাহ’—অর্থাৎ শিয়াল বা খেঁকশিয়ালের বিয়ে। মহারাষ্ট্রে মারাঠি ভাষায় আছে ‘কোলহায়সে লাগনা’, অর্থাৎ শিয়ালের বিয়ে। মালয়ালম ভাষাতেও ‘ফক্স’স ওয়েডিং’-এর সমতুল্য লোকপ্রচলন রয়েছে। ওড়িয়া ভাষাতেও রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে শিয়ালের বিয়ের সম্পর্ক পাওয়া যায়।
অর্থাৎ শুধু বাংলায় নয়, একই প্রকৃতির দৃশ্য দেখে বহু সংস্কৃতির মানুষ প্রায় একই ধরনের কল্পকাহিনি তৈরি করেছে। আর সেখানেই লোকবিশ্বাসের আসল মজাটা।
শিয়ালই কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরও একেবারে নিশ্চিত নয়। তবে লোকসংস্কৃতি গবেষণায় একটি আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অস্ট্রোনেশীয় ভাষা ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা ভাষাবিদ রবার্ট ব্লাস্ট ১৯৯৯ সালে অ্যান্থ্রোপোস জার্নালে ‘দ্য ফক্স’স ওয়েডিং’ নামে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জাপানের ‘শিয়ালের বিয়ে’ বিশ্বাসের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ‘সানশাওয়ার’ বা রোদ-বৃষ্টির লোকবিশ্বাস তুলনা করেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো, রোদ-বৃষ্টি একসঙ্গে হওয়ার মতো ঘটনা বহু সংস্কৃতিতে অস্বাভাবিক বা রহস্যময় বলে বিবেচিত হয়েছে। একই সঙ্গে শিয়াল বহু লোককথায় ধূর্ত, ছলনাময় এবং রূপ বদলাতে সক্ষম প্রাণী—অর্থাৎ এক ধরনের ‘ট্রিকস্টার’ চরিত্র। এই দুই বৈশিষ্ট্যের মিল থেকেই হয়তো শিয়ালকে এমন রহস্যময় আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে ব্লাস্টও এটিকে কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করাননি। বরং তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো; এই বিশ্বাসের জন্য একক ও নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এটাই হয়তো লোকবিশ্বাসের সৌন্দর্য। তার জন্মের মুহূর্তটি অনেক সময় হারিয়ে যায়, থেকে যায় শুধু গল্পটি।
পৃথিবীর অন্য আকাশেও অন্য গল্প
১৯৯৮ সালে ভাষাবিদদের একটি আলোচনায় বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় সানশাওয়ার-এর স্থানীয় নাম সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে জাপানি ‘শিয়ালের বিয়ে’র পাশাপাশি কোরিয়ায় পাওয়া যায় ‘শিয়ালের বিয়ের দিন’ কিংবা ‘বাঘের বিয়ের দিন’-এর মতো অভিব্যক্তি। মালায়ালামে আছে ‘শিয়ালের বিয়ে’। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে একই ধরনের আবহাওয়াকে আবার প্রাণীর সন্তান জন্ম দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইউরোপের কিছু লোকবিশ্বাসে সূর্য-বৃষ্টি বা রংধনুর সঙ্গে শিয়ালের সম্পর্কও দেখা যায়।
অর্থাৎ একই আকাশ, কিন্তু গল্প আলাদা। কোথাও শিয়াল বিয়ে করছে, কোথাও বাঘ। কোথাও আবার কোনো ডাইনি মাখন তৈরি করছে। পোলিশ লোকপ্রচলনে সূর্য ও বৃষ্টির সঙ্গে ডাইনি মাখন বানানোর গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রকৃতি একই, কিন্তু মানুষের কল্পনা ভিন্ন।
কেন বিয়ে?
এখানেও নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। তবে লোককথার কাঠামো থেকে একটি বিষয় অনুমান করা যায়। বিয়ে মানুষের কাছে আনন্দের, উৎসবের, সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। আর রোদ-বৃষ্টি একসঙ্গে হওয়া প্রকৃতির এমন এক মুহূর্ত, যা একই সঙ্গে আলো ও জল, উজ্জ্বলতা ও অন্ধকারকে হাজির করে।
মানুষ হয়তো এই অদ্ভুত বৈপরীত্যকে একটি দৃশ্যমান গল্পে পরিণত করেছে—রোদ উঠেছে, বৃষ্টিও হচ্ছে; নিশ্চয়ই কোথাও কোনো গোপন বিয়ে চলছে। আর সেই গোপন বিয়ের বর-কনে মানুষ নয়, শিয়াল। বাংলার লোককল্পনায় সেটি আরও আপন হয়ে গেছে ‘খেঁকশিয়ালের বিয়ে’।
লোকবিশ্বাস শুধু মানুষের মুখে মুখে থাকে না; একসময় ঢুকে পড়ে সাহিত্য, সিনেমা ও শিল্পে। জাপানের কিতসুনে নো ইওমেইরি-এমনই একটি উদাহরণ। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর ১৯৯০ সালের ‘ড্রিমস’ সিনেমার প্রথম পর্ব ‘সানশাইন থ্রো দ্য রেইন’-এ শিয়ালের বিয়ের লোকবিশ্বাসকে ব্যবহার করেছেন।
বিজ্ঞান কী বলে?
বিজ্ঞান গল্পটিকে বাতিল করে দেয় না; শুধু তার ব্যাখ্যাটা বদলে দেয়। রোদ-বৃষ্টি একসঙ্গে হওয়ার জন্য কোনো শিয়ালের বিয়ের প্রয়োজন নেই। বৃষ্টির মেঘ স্থানীয় ও বিচ্ছিন্ন হতে পারে; একদিকে মেঘ ও বৃষ্টি থাকলেও অন্যদিকে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে। আবহাওয়ার ‘শাওয়ার্স’ সাধারণত এমনই বিচ্ছিন্ন প্রকৃতির।
আর বৃষ্টির ফোঁটার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো গেলে কখনও কখনও দেখা দেয় রংধনু। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সূর্যের আলো বৃষ্টির ফোঁটার মধ্য দিয়ে গেলে আলো প্রতিসরণ, প্রতিফলন ও বিচ্ছুরণের ফলে রংধনু তৈরি হয়। তখন আকাশ যেন সত্যিই কোনো উৎসবের আয়োজন করে। কিন্তু সেই উৎসবের নাম বিজ্ঞান দেয় সানশাওয়ার্স; আর মানুষ এর নাম দিয়েছে—‘খেঁকশিয়ালের বিয়ে’।
তাহলে কথাটির সত্যতা কোথায়?
খেঁকশিয়াল সত্যিই বিয়ে করছে, এই কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু কথাটির সাংস্কৃতিক সত্যতা আছে। এটি প্রকৃতির একটি দৃশ্যকে মানুষের কল্পনা দিয়ে ব্যাখ্যা করার বহু পুরোনো রীতি। আর এর সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো; বাংলার মানুষ যে কল্পনা করেছে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষও প্রায় একই দৃশ্য দেখে প্রায় একই গল্প বানিয়েছে।
তবে এখান থেকে এটাও বলা যাবে না যে বাংলা ছড়াটি জাপান থেকে এসেছে, কিংবা ভারত থেকে বাংলায় এসেছে। বাংলা ছড়ার নির্দিষ্ট উৎস এখনো অজানা। বরং প্রাপ্ত তথ্য থেকে বলা যায়, ‘শিয়ালের বিয়ে’ একটি বিস্তৃত লোকবিশ্বাস, যার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ পৃথিবীর নানা সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছে। তাই পরেরবার আকাশে একদিকে রোদ, অন্যদিকে বৃষ্টি দেখলে হয়তো আপনি বৈজ্ঞানিক কারণটি জানবেন। মেঘ কোথায়, বাতাস কোন দিকে, বৃষ্টির মেঘ কতটা স্থানীয়; এসবের হিসাবও করতে পারবেন।