যে কাজে বয়স বাড়লেও মস্তিষ্ক থাকবে সক্রিয়

জীবনযাপন ডেস্ক
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৭আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৭

বয়স বাড়লেই স্মৃতি দুর্বল হবে, চিন্তার গতি কমবে, একসময় মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হঠাৎ নিচের দিকে নামতে শুরু করবে। বয়স নিয়ে এমন আশঙ্কা অনেকের মনেই কাজ করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কে পরিবর্তন আসে ঠিকই, তবে প্রতিটি পরিবর্তনকে ‘অবনতি’ হিসেবে দেখার কারণ নেই।

বরং জীবনের অভিজ্ঞতা, নতুন কিছু শেখা, শরীরচর্চা, সামাজিক যোগাযোগ, মানসিক চাপ সামলানোর ধরন এবং এমনকি অবসরের পর কী করছেন, এসবের সঙ্গেও মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্ষমতার সম্পর্ক থাকতে পারে।

চিকিৎসক নরম্যান সোয়ান তাঁর নতুন বই ‘দ্য ব্রেন ক্লিফ’-এ মস্তিষ্কের বয়সজনিত পরিবর্তন এবং জ্ঞানীয় ক্ষমতা ধরে রাখার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন কিছু বিষয়, যা প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বেশ খানিকটা আলাদা।

বয়স বাড়ার সঙ্গে নিজের বর্তমান চিন্তাশক্তিকে ২০ বছর বয়সের সঙ্গে তুলনা করা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সোয়ানের মতে, এই তুলনাই অনেক সময় আমাদের ভুল ধারণার দিকে নিয়ে যায়। কারণ ২০-এর দশকের মস্তিষ্কের সঙ্গে ৪০ বা ৫০-এর দশকের মস্তিষ্কের পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু সেই পার্থক্য মানেই মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়। বরং মস্তিষ্কের কাজের ধরন বদলে যায়।

তরুণ বয়সে দ্রুত চিন্তা করা, দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করা কিংবা নতুন সমস্যা দ্রুত সমাধান করার ক্ষমতা বা ‘ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স’ সাধারণত বেশি শক্তিশালী থাকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঞ্চিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আরও সমৃদ্ধ হয়। এটিই ‘ক্রিস্টালাইজড ইন্টেলিজেন্স,’ যার সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত প্রজ্ঞার সম্পর্ক রয়েছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্ক কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেয়, তা বোঝাতে সোয়ান ব্যবহার করেছেন ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ ধারণাটি।

একটি বহুতল ভবনকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে রাখতে যেমন ভেতরে সহায়ক কাঠামো থাকে, মস্তিষ্কও তেমনভাবে বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে। এই নেটওয়ার্কগুলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন কাজ চালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে এই সহায়ক কাঠামো তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মস্তিষ্ক যত কার্যকরভাবে এই কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তত বেশি সময় জ্ঞানীয় ক্ষমতা ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তাই মস্তিষ্ককে বয়সের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই হতে পারে দীর্ঘদিন সুস্থ জ্ঞানীয় ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম চাবিকাঠি।

মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সোয়ান সাতজন ‘কগনিটিভ সুপার-এজার’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা এমন মানুষ, যারা অত্যন্ত বেশি বয়সেও তুলনামূলকভাবে ভালো জ্ঞানীয় ক্ষমতা ধরে রেখেছেন।

তাদের জীবনযাপন একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের মধ্যে ছিলেন ৯৫ বছর বয়সি একজন নিরক্ষর জুতো-সারাইকারী, মিক জ্যাগারকে পরিসংখ্যান শেখানো একজন নারী এবং জাপানের কিউশুতে ৯৪ বছর বয়সেও ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করা একজন নারী।

তবে তাদের মধ্যে একটি মিল সোয়ানের নজর কেড়েছে। তারা মানসিক চাপকে আঁকড়ে ধরে থাকেন না। সমস্যা হলে সমাধানের চেষ্টা করেন এবং একই বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভাবতে থাকেন না।

এই একই বিষয় বারবার মনে ঘুরিয়ে চলাকে বলা হয় ‘রিউমিনেশন’। অর্থাৎ সমস্যার সমাধান না করে একই চিন্তা বারবার মাথায় ঘোরানো।

সোয়ানের মতে, এই অভ্যাস মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অপ্রয়োজনীয় চিন্তায় ব্যস্ত রাখতে পারে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স যেহেতু বয়স বাড়ার সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা কিংবা অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের মতো বিষয় মস্তিষ্কের এই ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে যাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিন্তা বা মানসিক চাপ দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে, তাদের জন্য শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর না করে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির বিভিন্ন পদ্ধতিও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও বয়সের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তবে ৪০ ও ৫০-এর দশককে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি হলো শরীরচর্চা। নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্কের ‘প্লাস্টিসিটি’ বা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে উৎসাহিত করতে পারে। এর ফলে নতুন স্নায়বিক সংযোগ ও সহায়ক কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়াও উপকৃত হতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। প্রদাহ কমাতে সহায়ক খাদ্যতালিকায় বেশি বৈচিত্র্যের সবজি, বিশেষ করে শাকপাতা, বেরিজাতীয় ফল এবং দইয়ের মতো গাঁজন করা খাবার রাখার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে লাল মাংসের পরিমাণ সীমিত রাখার পরামর্শ রয়েছে।

মস্তিষ্ককে সব সময় কোনও কঠিন কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে, এমন ধারণাও পুরোপুরি ঠিক নয়।

গবেষণায় ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ নামে মস্তিষ্কের একটি ব্যবস্থার কথা বলা হয়। আমরা যখন কোনও নির্দিষ্ট কাজে গভীরভাবে মনোযোগ দিচ্ছি না, তখনও মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে না। বরং এই সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নতুন ধরনের যোগাযোগ তৈরি হতে পারে।

‘কগনিটিভ সুপার-এজার’দের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সোয়ানের কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল জিনের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার ফলাফল।

কোন মানুষ কত দ্রুত জ্ঞানীয় ক্ষমতা হারাবেন কিংবা কখন তথাকথিত ‘ব্রেন ক্লিফ’-এর কাছে পৌঁছাবেন এ ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণই সবকিছু নির্ধারণ করে না। বরং পরিবেশ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরনও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এর একটি উদাহরণ তিনি পেয়েছেন নিউ জার্সির এক শতবর্ষী নিউরোসাইকিয়াট্রিস্টের জীবনে। এত বেশি বয়সেও তিনি নতুন দক্ষতা শেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকার ক্লাসে গিয়ে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন এবং পরিবারের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখছিলেন।

নতুন কিছু শেখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা এসবই মস্তিষ্ককে নিয়মিত কাজের মধ্যে রাখে।

বইটির একটি অধ্যায়ের নাম ‘ডোন্ট রিটায়ার’। নামটি শুনে মনে হতে পারে, সোয়ান বুঝি সবাইকে আজীবন চাকরি করে যেতে বলছেন। বিষয়টি আসলে তা নয়।

তাঁর বক্তব্য হলো, কাজ বা অর্থপূর্ণ কর্মকাণ্ড মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। গবেষণায় অবসরের পর জ্ঞানীয় ক্ষমতা কমে যাওয়ার গতি বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

কেউ চাকরি ছেড়ে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হলে, নতুন কোনও দক্ষতা শিখলে, নতুন শখ তৈরি করলে কিংবা নিয়মিত সামাজিক ও মানসিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলে মস্তিষ্ক তখনও সক্রিয় থাকে।

সমস্যা তখনই, যখন অবসর মানে হয়ে যায় সারাদিন সোফায় বসে থাকা, কোনও নতুন কিছু না করা এবং জীবন থেকে মানসিক চ্যালেঞ্জ সরিয়ে দেওয়া।

মস্তিষ্কের বয়সজনিত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজের জীবনযাপনেও পরিবর্তন এনেছেন সোয়ান। তিনি এখন নিজের মানসিক চাপ ও অযথা চিন্তা করার প্রবণতা নিয়ে বেশি সচেতন। সমস্যা হলে সেটি নিয়ে দীর্ঘ সময় পড়ে না থেকে সমাধানের চেষ্টা করেন। অ্যালকোহল গ্রহণ কমিয়েছেন, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়েও আরও সতর্ক হয়েছেন।

খাদ্যতালিকায় শাকপাতা, বেরিজাতীয় ফল ও দইয়ের উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। মাঝারি থেকে তুলনামূলক বেশি মাত্রার শরীরচর্চাকেও দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত অংশ করেছেন।

বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্ক বদলাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে অবনতি হিসেবে দেখার বদলে, মস্তিষ্ক কীভাবে নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে নিচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়াই হয়তো আরও ইতিবাচক পথ।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

/এমএএল/
সম্পর্কিত
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাটলফিশের মিলনমেলা এবার যেন নিস্তব্ধ সমুদ্র
বাঁহাতি তো অনেক, কিন্তু পুরোপুরি বাঁহাতি কতজন?
বয়সবাদকে হারিয়ে কীভাবে দীর্ঘায়ু হবেন
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
ট্যুরিস্ট হয়েও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যায় যেসব দেশে
ট্যুরিস্ট হয়েও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা যায় যেসব দেশে
ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে ‘নতুন তথ্য নেই’: ভারত
ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে ‘নতুন তথ্য নেই’: ভারত
বিএনপি আমলের বদলি-পদোন্নতি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান: আসিফ মাহমুদ 
বিএনপি আমলের বদলি-পদোন্নতি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান: আসিফ মাহমুদ 
সর্বাধিক পঠিত
বাঁধনের ওপর হামলা: আসিফ নজরুল বললেন, ‘ব্যবস্থা নিলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে’
বাঁধনের ওপর হামলা: আসিফ নজরুল বললেন, ‘ব্যবস্থা নিলে শূন্য হাতে ফিরতে হবে’
সৌদি আরবে কোনও নদী নেই, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে ৩৭ মিলিয়ন মানুষ
সৌদি আরবে কোনও নদী নেই, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে ৩৭ মিলিয়ন মানুষ
বাঁধনের ওপর হামলা: মনিরুলকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলো তার পরিবার
বাঁধনের ওপর হামলা: মনিরুলকে নিয়ে বিপদে পড়ে গেলো তার পরিবার
সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, মধুতে চিনির সিরাপ: সংসদে সানসিলা
সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, মধুতে চিনির সিরাপ: সংসদে সানসিলা
পরীমণির বায়োপিকে কাজ করতে চান দীঘি
পরীমণির বায়োপিকে কাজ করতে চান দীঘি