হার্ট অ্যাটাক নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—হার্ট অ্যাটাক নাকি শুধু রাতের বেলাতেই হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। হার্ট অ্যাটাক দিনের বা রাতের যেকোনো সময়ই হতে পারে। বরং হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ভর করে একজন ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, পারিবারিক ইতিহাস এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানের ওপর।
বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। একসময় এটি মূলত বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল এ প্রবণতার জন্য দায়ী।
হার্ট অ্যাটাক কি শুধু রাতে হয়
চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাক নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দিনের যেকোনো সময় ঘটতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের জৈবিক ঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম), হরমোনের ওঠানামা ও রক্তচাপের পরিবর্তনের কারণে দিনের বিভিন্ন সময়ে ঝুঁকির তারতম্য থাকতে পারে। তবে শুধু রাতেই হার্ট অ্যাটাক হয়—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে বেশ কয়েকটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন-
১. হৃদরোগীদের বেশি বিশ্রাম নেওয়া উচিত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে। তবে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যায়াম ক্ষতিকর হতে পারে।
২. তরুণদের হার্ট অ্যাটাক হয় না
এটি একটি ভুল ধারণা। যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, তবুও পারিবারিক ইতিহাস, ধূমপান, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চাপের কারণে তরুণদেরও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
৩. বুকে ব্যথা মানেই হার্ট অ্যাটাক
বুকে ব্যথার অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে শুধু বুকেই নয়, কাঁধ, হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা ওপরের পেটেও ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিও লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়।
৪. উচ্চ রক্তচাপই হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র কারণ
উচ্চ রক্তচাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হলেও একমাত্র নয়। ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. বুকের বাম পাশে ব্যথা না হলে হার্ট অ্যাটাক নয়
চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা বুকের বাম, ডান বা মাঝখানে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা হাত, চোয়াল, ঘাড় কিংবা কাঁধেও অনুভূত হয়।
৬. ফিট মানুষদের হার্ট অ্যাটাক হয় না
শারীরিকভাবে ফিট থাকা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। পারিবারিক ইতিহাস, নীরব উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য অজানা ঝুঁকির কারণেও সুস্থ ও ফিট ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ লক্ষণ
চিকিৎসকদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি—
- বুকের মাঝখানে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি
- ব্যথা কাঁধ, হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া
- শ্বাসকষ্ট
- ঠান্ডা ঘাম
- বমিভাব
- মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা
- হঠাৎ ক্লান্তি অনুভব করা
এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ হার্ট ফাউন্ডেশন – হৃদরোগ ও প্রতিরোধ বিষয়ক সচেতনতা তথ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) – হৃদরোগ ও ঝুঁকির কারণ সম্পর্কিত প্রতিবেদন, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ) – হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ ও কারণ, মায়ো ক্লিনিক – হৃদরোগের উপসর্গ ও চিকিৎসা নির্দেশিকা, স্বাস্থ্য অধিদফতর (বাংলাদেশ) – অসংক্রামক রোগ ও হৃদরোগ প্রতিরোধ গাইডলাইন।