সুন্দর ত্বকের যত্নে কতগুলো পণ্য দরকার? জানুন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বাজারে এত ধরনের স্কিন কেয়ার পণ্য এবং সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য পরামর্শের ভিড়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন যে, আসলে ত্বকের যত্নে কতগুলো পণ্য প্রয়োজন? বিশেষজ্ঞদের মতে, জটিল রুটিন নয়, বরং নিয়মিত ও সঠিক কয়েকটি ধাপই সুস্থ ত্বকের জন্য যথেষ্ট।

মুখের ত্বকের যত্নের মৌলিক বিষয়গুলো কী

ওষুধের দোকানের স্কিন কেয়ার পণ্যের তাক দেখলেই বোঝা কঠিন হয়ে যায় কোনটি প্রয়োজন আর কোনটি নয়। সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের পরামর্শ এই বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফাইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের চর্মরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমাদ আমিন বলেন, “এখন সবাই স্কিন কেয়ার নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, ফলে মানুষ প্রচুর তথ্যের মধ্যে পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।”

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর স্কিন কেয়ার রুটিনের মূল ভিত্তি হলো তিনটি বিষয়:

  • মুখ পরিষ্কার করা (ক্লেনজিং)
  • ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখা (ময়েশ্চারাইজিং)
  • সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা নেওয়া (সান প্রোটেকশন)

মুখ পরিষ্কার করুন

নিয়মিত মুখ ধোয়া শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়, ত্বকের সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

লুইজিয়ানার মেটেইরির চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্যাট্রিসিয়া ফ্যারিস বলেন, মুখ পরিষ্কার করলে অতিরিক্ত তেল, ময়লা, মৃত ত্বককোষ, মেকআপ এবং পরিবেশের দূষণকারী কণা দূর হয়।

এসব জমে থাকলে ত্বকের রোমকূপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ব্রণ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দূষণের কারণে তৈরি ফ্রি র‌্যাডিক্যাল ত্বকের বার্ধক্য দ্রুত করতে পারে।

ওহাইওর পেরিসবার্গের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হোপ মিচেল বলেন, বেশিরভাগ মানুষের জন্য দিনে দুইবার মুখ ধোয়া যথেষ্ট। তবে শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে দিনে একবার মুখ পরিষ্কার করাই ভালো।

অতিরিক্ত মুখ ধুলে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে লালচে ভাব, চুলকানি, শুষ্কতা ও র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।

ত্বকের ধরন অনুযায়ী ক্লেনজার বেছে নিন

  • শুষ্ক ত্বক: হাইড্রেটিং ক্লেনজার ব্যবহার করুন।
  • তৈলাক্ত ত্বক: জেল-ভিত্তিক বা ফোমিং ক্লেনজার ভালো।
  • সংবেদনশীল ত্বক: মৃদু ও সুগন্ধিবিহীন ক্লেনজার ব্যবহার করুন।

ডা. ফ্যারিস বলেন, ভালো ফল পেতে সবসময় দামি পণ্য কেনার প্রয়োজন নেই। Neutrogena, CeraVe এবং La Roche-Posay-এর মতো সহজলভ্য ব্র্যান্ডের পণ্যও কার্যকর হতে পারে।

ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন

প্রতিদিন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক হওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং সূক্ষ্ম বলিরেখা কম দৃশ্যমান হতে পারে।

ডা. ফ্যারিস বলেন, “ক্লেনজারের মতো ময়েশ্চারাইজারও ত্বকের ধরন অনুযায়ী বেছে নিতে হবে।”

কোন ত্বকে কোন ময়েশ্চারাইজার

  • তৈলাক্ত ত্বক: হালকা ও তেলমুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
  • শুষ্ক ত্বক: ঘন ক্রিমজাতীয়, ‘হাইড্রেটিং’ বা ‘ফর ড্রাই স্কিন’ লেখা পণ্য বেছে নিন।
  • ব্রণপ্রবণ ত্বক: নন-কোমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন, যা রোমকূপ বন্ধ করে না।

ডা. মিচেলের মতে, বেশিরভাগ মানুষের জন্য দিনে দুইবার ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। শীতকালে বা ত্বক বেশি শুষ্ক হলে আরও বেশি বার ব্যবহার করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, “ত্বক যদি টানটান বা খসখসে লাগে, তাহলে এটি আর্দ্রতার প্রয়োজনের সংকেত।”

সকালে ও রাতে একই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যায়। তবে দিনের ময়েশ্চারাইজারে যদি সানস্ক্রিন থাকে, তাহলে রাতে আলাদা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো।

সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন

ত্বকের ধরন বা রং যাই হোক না কেন, সবার জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

ডা. আমিন বলেন, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (ইউ-ভি রে) ত্বকের কোলাজেন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ফ্রি র‌্যাডিক্যাল তৈরি বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে ত্বকে সূক্ষ্ম রেখা ও বলিরেখা দ্রুত দেখা দিতে পারে।

অতিরিক্ত সূর্যালোকে ত্বকে মেলানিন উৎপাদন বেড়ে সানস্পট বা কালচে দাগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে।

সঠিক সানস্ক্রিন কীভাবে বেছে নেবেন

ডা. আমিনের পরামর্শ, ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন, যা ইউভিএ ও ইউভিবি দুই ধরনের রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়। আর এসপিএফ কমপক্ষে ৩০ হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, এমন সানস্ক্রিন বেছে নিন যেটি আপনার পছন্দ হয় এবং আপনি প্রতিদিন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

সানস্ক্রিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে অনেক পণ্যের এসপিএফ ১৫ হওয়ায় তা পর্যাপ্ত সুরক্ষা নাও দিতে পারে। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে আলাদা সানস্ক্রিন ব্যবহার করাই ভালো।

অতিরিক্ত পণ্য কি সত্যিই দরকার

ক্লেনজার, ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন এই তিনটিই মূল ভিত্তি। তবে ত্বকের নির্দিষ্ট সমস্যা বা লক্ষ্য অনুযায়ী কেউ চাইলে সিরাম, এক্সফোলিয়েন্ট, আই ক্রিম বা টোনার যোগ করতে পারেন।

ডা. ফ্যারিস বলেন, “আপনি কী অর্জন করতে চান, তার ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহার করবেন।”

এসব পণ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, রেটিনল বা বিভিন্ন অ্যাসিড ত্বকের বার্ধক্য কমাতে ও অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে সাহায্য করতে পারে।

একাধিক পণ্য ব্যবহার করলে সঠিক ক্রম হলো:

১. ক্লেনজার
২. সিরাম ও আই ক্রিম
৩. ময়েশ্চারাইজার
৪. সানস্ক্রিন

নতুন পণ্য ব্যবহারে সতর্কতা

ডা. ফ্যারিসের পরামর্শ, স্কিন কেয়ার রুটিনে নতুন কোনো পণ্য যোগ করলে একবারে একটি পণ্য ব্যবহার করুন এবং অন্তত তিন সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করুন।

তিনি বলেন, একসঙ্গে অনেক পণ্য ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালা, শুষ্কতা বা অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কোনো পণ্যে সমস্যা হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন

ডা. আমিন বলেন, কয়েকটি পণ্য ব্যবহার করেও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া যায়, তাহলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞ আপনার ত্বকের ধরন ও সমস্যার ভিত্তিতে কোন উপাদান বা পণ্য উপকারী এবং কোনগুলো শুধু প্রচারণার অংশ তা বুঝতে সাহায্য করতে পারেন। তাই সুস্থ ত্বকের জন্য অনেক পণ্য নয়, বরং সঠিক পণ্য ও নিয়মিত যত্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।