মুখ হঠাৎ লাল হয়ে যাওয়া, গরম অনুভূতি, ত্বকে ছোট ছোট ফুসকুড়ি এসব সমস্যা অনেকের বয়স বাড়ার সঙ্গে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি রোসেশিয়া নামের দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের সমস্যার একটি সাধারণ চিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার বার্মিংহামের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জুলি সি. হার্পার বলেন, “রোসেশিয়া থাকলে অনেকের ক্ষেত্রে ৪০ বা ৫০ বছর বয়সে উপসর্গ আরও বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দেখা যায়।”
তার মতে, দীর্ঘদিন বিভিন্ন ট্রিগারের সংস্পর্শে থাকার কারণে ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এই প্রদাহ রক্তনালির চারপাশের টিস্যুকে দুর্বল করে দেয়। ফলে রক্তনালি ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে মুখে স্থায়ী লালভাব দেখা দিতে পারে।
রোসেশিয়ার কারণে শুধু মুখ লাল হওয়াই নয়, ব্রণের মতো ফুসকুড়ি, ত্বকের শুষ্কতা, টানটান ভাব ও জ্বালাপোড়াও হতে পারে।
নিউইয়র্কের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেরি লেজার বলেন, রোসেশিয়ার উপসর্গ সাধারণত বাড়ে ও কমে। অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে ফ্লেয়ার-আপ হতে পারে। সূর্যের আলো, ঝাল খাবার, অ্যালকোহল, গরম পানীয়, ঠান্ডা আবহাওয়া, মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিশ্রম অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।
শিকাগোর নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দিনা এলরাশিডি জানান, রোসেশিয়ার কারণে চোখে খসখসে ভাব বা চুলকানি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নাকের ত্বক মোটা হয়ে যাওয়ার সমস্যাও দেখা যায়।
তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক পাতলা ও শুষ্ক হয়ে যায়। ফলে আগে যে লালভাব কম চোখে পড়ত, সেটিও বয়সের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
রোসেশিয়া কেন বাড়ে
ডা. হার্পারের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিক ত্বক পরিবর্তন, সূর্যের ক্ষতি এবং দীর্ঘদিনের প্রদাহ সব মিলিয়ে ত্বকের কোলাজেন ফাইবার দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে রক্তনালি স্থায়ীভাবে প্রসারিত হয়ে ত্বকের উপরিভাগে দৃশ্যমান হতে পারে।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের সময় উপসর্গ বাড়তে দেখা যায় বলে জানান ডা. লেজার। তবে ডা. হার্পার বলেন, হরমোনের সঙ্গে রোসেশিয়ার সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন
ডা. লেজারের মতে, রোসেশিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক পদ্ধতি একসঙ্গে অনুসরণ করতে হয়।
নিজের ট্রিগার চিনুন
ডা. হার্পার বলেন, “প্রত্যেক মানুষের ট্রিগার আলাদা হতে পারে।” তাই কোন খাবার, আবহাওয়া বা অভ্যাসে সমস্যা বাড়ে তা খেয়াল করে প্রয়োজন অনুযায়ী তা এড়িয়ে চলা উচিত।
কোমল প্রসাধনী ব্যবহার করুন
ডা. হার্পার জানান, গ্লিসারিন বা ডাইমেথিকোনযুক্ত ময়েশ্চারাইজিং ক্লিনজার ত্বককে আরাম দিতে পারে।
ডা. এলরাশিডির মতে, সালফারযুক্ত ক্লিনজার ও ক্রিম প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে ডা. লেজার সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ও স্ক্রাব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন, কারণ এগুলো সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা বাড়াতে পারে।
সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
ডা. এলরাশিডি বলেন, সূর্যের আলো রোসেশিয়ার অন্যতম বড় ট্রিগার। তাই প্রতিদিন SPF ৩০ বা তার বেশি ক্ষমতার সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি।
ডা. লেজারের মতে, জিঙ্ক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডযুক্ত মিনারেল সানস্ক্রিন অনেকের ত্বকে তুলনামূলকভাবে বেশি সহনীয়।
প্রয়োজন হলে ওষুধ ও লেজার চিকিৎসা
ডাক্তাররা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রিমোনিডিন জেল, অক্সিমেটাজোলিন ক্রিম, অ্যাজেলেইক অ্যাসিড, আইভারমেকটিন ক্রিম বা মেট্রোনিডাজল ব্যবহার করতে বলতে পারেন।
ডা. লেজার জানান, কিছু ক্ষেত্রে কম মাত্রার মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকও ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া লেজার থেরাপি রক্তনালি ছোট করতে এবং মুখের লালভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। ডা. এলরাশিডি বলেন, সাধারণত লেজার চিকিৎসা ওষুধের সঙ্গে মিলিয়ে করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
ডা. হার্পারের পরামর্শ, মুখের লালভাব বা রোসেশিয়ার উপসর্গ বাড়লে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে দেরি করা উচিত নয়। কারণ সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।









