শিশুর শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়তে যা করবেন

শিশুদের পর্যাপ্ত শাকসবজি খাওয়ানো অনেক বাবা-মায়ের কাছেই কঠিন মনে হয়। বিশেষ করে নতুন খাবারের প্রতি অনীহা থাকলে ব্রোকলি, পালংশাক বা অন্য সবজি খাওয়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তবে গবেষণা বলছে, খাবারের সঙ্গে শিশুর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় ছোট কিছু পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে তার খাবারের পছন্দ ও অভ্যাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শিশুরা সাধারণত ছোট বয়স থেকেই মিষ্টি স্বাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এমনকি মায়ের বুকের দুধেও প্রাকৃতিক চিনি থাকায় এর স্বাদ কিছুটা মিষ্টি। ফলে শক্ত খাবার শুরু করার পর সবজির মতো তুলনামূলক কম মিষ্টি খাবারের সঙ্গে শিশুকে পরিচিত করানো অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।

তবে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারসহ বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুর চিন্তাশক্তি, মনোযোগ, আচরণ ও পড়াশোনার ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা জরুরি।

গবেষণার আলোকে বাড়িতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে।

১. বারবার বিভিন্ন সবজির সঙ্গে পরিচয় করান

শিশুর ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বায়োসাইকোলজির অধ্যাপক ম্যারিয়ন হেথারিংটনের মতে, প্রাক্-বিদ্যালয় বয়সে শিশুর সবজির প্রতি পছন্দ তৈরি করার ভালো সুযোগ থাকে। কোনও সবজি প্রথমবার খেতে না চাইলে সেটি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে কয়েক দিন পর আবার দেওয়া যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন কোনও খাবার গ্রহণ করার আগে শিশুর একই খাবারের সঙ্গে একাধিকবার পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় এই সংখ্যা পাঁচ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

তবে বয়সভেদে পার্থক্য রয়েছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের তুলনামূলক কমবার পরিচিত করালেই কোনো খাবার গ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে নতুন খাবার নিয়ে অনীহা বা ‘ফুড নিওফোবিয়া’ বেশি দেখা যেতে পারে।

খাবারের সঙ্গে পরিচয়ের এই প্রক্রিয়া জন্মের আগেও শুরু হতে পারে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, গর্ভাবস্থায় মা যেসব খাবার খান, সেসব খাবারের কিছু স্বাদ অ্যামনিওটিক তরলের মাধ্যমে ভ্রূণের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং পরবর্তীতে শিশুর খাবারের পছন্দ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

২. খাবারের শুরুতেই সবজি দিন

শিশুকে কোনও খাবার ‘স্বাস্থ্যকর’ বলে বোঝানোর চেয়ে সেটিকে ‘সুস্বাদু’ হিসেবে উপস্থাপন করা বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে শুধু খাবারটি কীভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে তা নয়, কখন পরিবেশন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

খাবারের শুরুতে সবজি পরিবেশন করলে শিশু তখন বেশি ক্ষুধার্ত থাকে। ফলে সবজি খাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। খাবারের শুরুতেই পছন্দের বা বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খেয়ে ফেললে পরে সবজি খাওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

তাই মটরশুঁটি, গাজর, ব্রোকলি বা অন্য সবজি খাবারের শুরুতেই দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশুর ক্ষুধার সময় স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সবজি শুধু দুপুর বা রাতের খাবারেই রাখতে হবে এমন নয়। সকালের নাশতাতেও মাশরুম ও পালংশাক দিয়ে অমলেট বা জুকিনি দিয়ে মাফিন তৈরি করা যেতে পারে।

২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের আটটি শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের সামনে সকালের নাশতায় সবজি দেওয়া হলে তারা ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে তা খেয়েছে।

৩. প্লেটে স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়ান

সবজি খাবারের শুরুতে দেওয়া সম্ভব না হলে খাবারের অনুপাত পরিবর্তন করা যেতে পারে। অর্থাৎ বেশি ক্যালরিযুক্ত উপাদানের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে সবজির পরিমাণ বাড়ানো।

গাজর, জুকিনি বা অন্যান্য সবজি কুচি করে সসের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আবার মূল খাবারের পাশে অতিরিক্ত সবজি রাখা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্লেটে মাংসের তুলনায় সবজির অনুপাত বাড়ালে শিশুরা মোট খাবারের পরিমাণ খুব বেশি পরিবর্তন না করেই বেশি সবজি খেতে পারে। এমনকি শিশুর প্লেটে ফল ও সবজির পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিলে এগুলো খাওয়ার পরিমাণও বাড়তে দেখা গেছে।

এ ছাড়া খাবারের সময় বিভিন্ন ধরনের সবজি থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে প্রিস্কুল বয়সী শিশুরা বেশি সবজি খেতে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার কম খেতে পারে।

৪. সবজিকে আকর্ষণীয় করে পরিবেশন করুন

শিশুর খাবারের পছন্দে খাবারের চেহারাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত ও আকর্ষণীয় দেখতে খাবারের প্রতি শিশুর আগ্রহ বেশি হতে পারে।

তাই সবজি বিভিন্ন আকৃতিতে কেটে বা সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লেটে শৈল্পিকভাবে সাজিয়ে দিলে শিশুরা নতুন খাবার গ্রহণে বেশি আগ্রহী হতে পারে।

গাজর, শসা বা অন্যান্য সবজি প্রজাপতি, ফুল কিংবা টেডি বিয়ারের মতো মজার আকৃতিতে কেটে দিলে শিশুর কাছে খাবারটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

শুধু আকৃতি নয়, সবজি সহজে দেখা যায় এবং হাতের কাছে থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক ধরনের সবজি একটি পাত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণে সাজিয়ে দিলে শিশুরা সেগুলো বেশি বেছে নেয় ও খায়।

আবার প্রিস্কুল বয়সী শিশুদের প্লেটে আলাদা অংশে খাবার ভাগ করে দিলে তারা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি সবজি খেয়েছে।

৫. পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খান

শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে বাবা-মায়ের আচরণ বড় ভূমিকা রাখে। বাবা-মা যদি নিয়মিত ফল ও সবজি খান, শিশুর কাছেও এসব খাবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বিপরীতে বাবা-মায়ের অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউজিল্যান্ডের স্কুলশিশুদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর, তারা কেক, চকলেট ও অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর নাশতা তুলনামূলক কম খায়।

সপ্তাহে অন্তত তিনবার পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গেও স্বাস্থ্যকর ওজন ও ভালো খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বাবা-মা নিজেরাও স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে শিশুরাও সেসব খাবার খাওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখায়।

তাই শিশুকে শুধু ‘সবজি খাও’ বলার পরিবর্তে পরিবারের সবাই মিলে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

৬. খাবারকে আনন্দদায়ক করে তুলুন

কোনো খাবার খাওয়ার জন্য শিশুকে অতিরিক্ত চাপ দিলে খাবারের প্রতি তার আনন্দ ও আগ্রহ কমে যেতে পারে। একইভাবে চকলেট, মিষ্টি বা বেশি চর্বিযুক্ত খাবারকে পুরস্কার হিসেবে ব্যবহার করলে এসব খাবারের প্রতি শিশুর আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে।

এর পরিবর্তে শিশুকে নতুন খাবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এক গবেষণায় শিশুদের বিটরুট ও ছোলার মতো খাবার স্পর্শ করতে, গন্ধ নিতে এবং ভালোভাবে দেখতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে খাবারগুলো খেতেই হবে এমন কোনও চাপ দেওয়া হয়নি। এতে শিশুদের অপরিচিত খাবারের প্রতি অনীহা কমে এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো চেখে দেখার আগ্রহ বাড়ে।

শিশুকে বয়স অনুযায়ী রান্নার কাজেও যুক্ত করা যেতে পারে। সবজি ধোয়া, বেছে নেওয়া, মেশানো কিংবা প্লেটে সাজানোর মতো সহজ কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে খাবারের প্রতি তার কৌতূহল বাড়তে পারে।

গবেষণাটির সঙ্গে কাজ করা পরীক্ষামূলক শেফ জোজেফ ইউসুফের মতে, খাবারের অভিজ্ঞতাকে খেলাধুলার মতো করে তোলা এবং বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। চাপমুক্ত ও আনন্দদায়ক পরিবেশে শিশুরা নতুন খাবার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেশি আগ্রহী হয়।

শিশুকে জোর করে সবজি খাওয়ানোর চেয়ে বারবার পরিচিত করানো, খাবারের শুরুতেই সবজি দেওয়া, প্লেটে স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো, আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করা, পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া এবং খাবারকে আনন্দের অংশ করে তোলা এসব ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি