সমসাময়িক সাহিত্য ও দর্শন চর্চার একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ডেভিড আর্ন্ডট। ইয়েল ও ডিপ স্প্রিংস কলেজে সাহিত্য ও দর্শনে পড়াশোনা শেষে তিনি ইউসি আরভাইনে তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন জঁ ফ্রাসোয়া লিওতার ও জ্যাক দেরিদার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি 'ফিলোসফি অব রাইটিংস' গ্রন্থে লেখালেখিকে চিন্তা ও অনুশীলনের একটি দার্শনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখান। লিটহাভ ডটকম তার এই বইয়ের মূল বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন শাহরিয়ার হিরাজ।
নিজেকে সময় দাও
প্রত্যেকদিন আমাদের নানান কাজ করতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয়, সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। ফলে ছোটোখাটো কাজেই আমরা মূলত মজে থাকি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যায়।
ভালো লিখতে পারার জন্য আমাদের আলাদা করে সময় বের করতে হবে। দৈনন্দিন জীবন থেকে নিজের জন্য সময় বের করতে হবে, চিন্তা-ভাবনাকে গুছিয়ে আনতে হবে, যেমন আছে তেমন ভাবেই সবকিছু দেখতে হবে এবং সেসব কথায়/লেখায় প্রকাশ করতে হবে। প্রত্যেকদিন লেখার অভ্যাস কাজে শৃঙ্খলা ও সাধনা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই অভ্যাস সত্যিকারের বোঝাপড়ার দিকে ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ে যায়।
মার্কাস অরেলিয়াসের কথা ভাব। তিনি রোমের সম্রাট হওয়ার পরেও লেখার জন্য আলাদা করে সময় বের করতেন। তিনি মনে করতেন লেখালেখি সত্তাকে দৃঢ় করার একটি উপায়। দার্শনিক পিয়ের হাদোত বলেন, “'মেডিটেশনস' বইটি লেখার সময় মার্কাস আসলে সব বিষয়ে নির্বিকার হওয়ার চর্চা করতেন…প্রতিদিন লেখা হলো এক ধরনের পুনরাবৃত্ত অনুশীলন, যা বারবার শুরু করতে হয়। কারণ প্রকৃত দার্শনিক সেই ব্যক্তি যিনি জানেন তিনি পুরোপুরি জ্ঞান এখনো অর্জন করতে পারেননি।” যদি রোমের সম্রাট লেখার জন্য সময় বের করতে পারে, তাহলে তুমিও পারবে।
লেখালেখি সময়সাপেক্ষ কাজ। ভালোভাবে লিখতে চাইলে ধারণার চেয়েও বেশি সময় খরচ করা লাগবে। তাই ভবিষ্যতে কখন লিখতে বসবে এটা ঠিক করা অবান্তর। লেখার সময় এখনই।
একই সঙ্গে পড়ো ও লেখো
পড়া আর লেখাকে আলাদা করা উচিত না। এই বিষয়টিকে উল্লেখ করে সেনেকা তার এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “শুধু লেখা বা শুধু পড়া দুটোই ক্ষতিকর। শুধু লেখা আমাদের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়, আর শুধু পড়া আমাদেরকে দুর্বল করে ফেলে। তাই দুটো কাজ পালা করে করতে হবে, যাতে পড়া থেকে পাওয়া জ্ঞান লেখার মাধ্যমে নিজের ভেতরে গ্রহণ করা যায়।” প্রথমে পড়া শেষ করব, তারপর লিখব—এভাবে ভাবা ভুল।
কোনো লেখা ভালোভাবে পড়তে চাইলে সেটি নিয়ে লিখতে শুরু করো। গুরুত্বপূর্ণ বাক্য দাগিয়ে রাখো, নোট করো, পাশে মন্তব্য লেখো, আর নিজের লেখার জন্য প্রয়োজনীয় ভাবনাগুলো টুকে রাখো। যদি কোনো লেখা তোমার খুব ভালো লাগে তবে তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হুবহু কপি করো। এতে তার লেখার ধরন তুমি শিখতে পারবে।
আবার কোনো লেখা ভালোভাবে লিখতে চাইলে সেটি বারবার পড়তে হবে। কারণ লেখার সময় আমরা সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়ি।
একাধিক খসড়া
ভালো লেখা মানে বারবার নতুন করে লেখা। কোনো উৎকৃষ্ট রচনা এক খসড়াতে শেষ হয়নি। তলস্তয় ‘আন্না কারেনিনা’ ৬টি পূর্ণ খসড়ায় শেষ করেছিলেন। এলি উইজেলের ‘নাইট’ বইয়ের প্রথম খসড়া ছিল ৮৬২ পৃষ্ঠার, যা পরে তিনি কমিয়ে আনেন ১১৬ পৃষ্ঠায়। প্রতিটি খসড়ায় যতটা সম্ভব ভালো লেখার চেষ্টা করো৷ তারপর আবার লেখো, আউটলাইন নিয়ে নতুন করে ভাবো, অনুচ্ছেদগুলো সাজাও, অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দাও, ভাষা ঝরঝরে করো।
একটি সাধারণ নিয়ম মনে রাখো: লিখতে বসলে পূর্বে যা লিখেছ তা পড়ে দেখো এবং সেটিকে আরও স্পষ্ট ও সাবলীল করো। এতে আগের লেখাও উন্নত হবে, আর পরের লেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে। হেমিংওয়ে ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ লেখার সময় ঠিক এভাবেই লিখতেন। তিনি বলেছেন, “প্রতিদিন আমি আগের অংশটুকু পড়তাম। লিখতে লিখতে এমন একটা সময়ে আমি লেখা বন্ধ করতাম যখন জানি পরে কী ঘটবে।” নিজের লেখা বারবার পড়া ও সংশোধন করাই আমাদের লেখার ভেতরে ফিরে যাওয়ার পথ।
অন্যের পাঠ-প্রতিক্রিয়া নেওয়া
নিজের লেখা নিজে বিচার করা খুব কঠিন। সাধারণত আমরা যা দেখি তাই লিখি। নিজের বোঝাপড়া আর নিজের দৃষ্টিভঙ্গি লেখায় প্রকাশ পায় বলে, সেটিকে নিজের কাছে স্পষ্ট মনে হয়। এই কারণে অন্যের প্রতিক্রিয়া দরকার। অন্যরা আমাদের জানায় আমরা আসলে কেমন লিখছি।
অন্যরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সব দেখে। তাই তারা এমন কিছু দেখতে পায় যা আমাদের চোখে পড়ে না। তবে সব সীমাবদ্ধতায় যে তারা দেখতে পারবে এমন না। কিছু জিনিস তারা দেখতে পারবে, কিছু আংশিক দেখবে আবার কিছু একেবারেই দেখতে পারবে না। এমনকি সবচেয়ে অযৌক্তিক সমালোচনাও কখনো কখনো কাজে আসতে পারে, যদি এটি দেখায় কীভাবে আমাদের লেখা ভুলভাবে পাঠ হতে পারে। লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো অজস্র সমালোচনা থেকে উপযুক্ত বিষয়টি খুঁজে বের করতে পারা। ভুলগুলো ঠিক করো আর যেগুলো আড়ালে থাকছে সেগুলো উপেক্ষা করো।
একই বিষয় সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে লিখতে শিখো
কোনোকিছুকে পুরোপুরি আয়ত্ত করতে হলে সেটিকে বিভিন্ন স্তরে প্রকাশ করতে পারতে হবে। বাক্য, অনুচ্ছেদ, কোনো অংশের সারসংক্ষেপ, পুরো লেখা বা যা লেখা হয়নি সেগুলোর বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকতে হবে। মূল বিষয় হলো একটি জিনিসকে নানান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। কখনো আণুবীক্ষণিক পর্যায়ে আবার কখনো এভারেস্টের চূড়া থেকে দেখতে পারতে হবে।
অ্যাকাডেমিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু সম্পূর্ণ লেখা আয়ত্তে আনা যথেষ্ট নয়, বরং অধ্যায়ের সারাংশ, একশ শব্দের অ্যাবস্ট্রাক্ট থেকে এক বাক্যের সারাংশ সবকিছুই পারতে হবে। আবার একজন চিত্রনাট্যকারের জন্য শুধুমাত্র স্ক্রিপ্ট পুরোপুরি লিখতে পারা যথেষ্ট নয়, বরং এক মিনিটের পিচ, দশ মিনিটের পিচ, স্টোরিবোর্ড, রিল এবং গল্পের সারসংক্ষেপও জানা দরকার। সংক্ষেপে লিখতে জানতে পারা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবে লেখাকে বিভিন্ন স্তরে পরিকল্পনা করা, একই বিষয়কে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তৃত করে লিখতে পারার দক্ষতা আয়ত্ত করতে হবে। কখনো কখনো লিখতে লিখতে পুরো কাজের ধারণা বদলে যেতে পারে, সেই বিষয়েও নিজেকে প্রস্তুত থাকতে হবে। আবার কাজের পরিকল্পনা বদলে গেলে নির্দিষ্ট অংশ কেটে ঠিক করার ধৈর্যও থাকতে হবে।