আত্মবিরোধ থেকে আধুনিকতার শিখরে টমাস মান

অনুবাদ : নাসরুল্লাহ শারাফাত
০৬ জুন ২০২৬, ১০:৪৬আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ১০:৪৭

১৯৫০ সালে, এই ম্যাগাজিনের (দ্য নিউ ইয়র্কার) 'ব্রিফলি নোটেড' বিভাগের একজন সমালোচক টমাস মানের সাহিত্যকে তুড়িতেই নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। জার্মান এই ঔপন্যাসিকের বিপুল গদ্যরচনার ভাণ্ডার থেকে নির্বাচিত ‘দ্য টমাস মান রিডার’ সংকলনটি সম্পর্কে সমালোচক লিখেছিলেন, “এই তিন লক্ষ শব্দের সাহিত্যস্তম্ভ পাঠের পর সামগ্রিক ধারণা হয় যে মান একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক বটে, তবে হয়তো অতটাও বড় লেখক নন।” লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যাসিফিক প্যালিসেডসের ১৫৫০ সান রেমো ড্রাইভে বসবাসকারী এক নিউ ইয়র্কার গ্রাহক এই মন্তব্যে বিরক্ত হয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং টমাস মান। এক বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি ব্যঙ্গের সুরে লিখেছিলেন, “হ্যাঁ, আমি নিশ্চয়ই একজন ‘বড় লেখক’, তবে ‘অতটা বড়’ নই।”

‘টোনিও ক্রোগার’ ও ‘ডেথ ইন ভেনিস’-এর স্রষ্টা তখন খ্যাতির শিখরে অবস্থান করছিলেন। তবু তরুণ প্রজন্মের বহু সমালোচক তাঁকে মধ্যবিত্ত অতীতের এক ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করতেন, এমন এক লেখক যিনি বি-বপ সংগীত ও পরমাণু বোমার যুগে আর প্রাসঙ্গিক নন। একজন সমালোচক তো তাঁকে সেইসব “সাহিত্যিক মনোলিথ”-দের মধ্যে স্থান দিয়েছিলেন, “যারা নিজেদের লেখালেখির উপযুক্ত সময়কে অতিক্রম করেও বেঁচে থেকেছেন।”

কিন্তু জার্মানিতে এই রায় গ্রহণযোগ্য হয়নি। ১৯৫০ সালের দিকে মান নিজ দেশে ছিলেন অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল যে নাৎসিবাদ কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়; এর শিকড় জার্মান জাতীয় মানসের গভীরে প্রোথিত। ১৯৩৩ সালে নির্বাসনে যাওয়ার পর তিনি আর কখনও জার্মানিতে স্থায়ীভাবে ফিরে যাননি। ১৯৫৫ সালে সুইজারল্যান্ডে তাঁর মৃত্যু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জার্মান জাতির দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর সুদূরপ্রসারী বিশ্লেষণ, যেখানে তিনি নিজেকেও অব্যাহতি দেননি, আর বিতর্কের বিষয় রইল না। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, তাঁর সাহিত্য প্রতিটি নতুন প্রজন্মেই নতুন পাঠক খুঁজে পেয়েছে। তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে ঘিরে জার্মান ভাষায় রচিত গবেষণা ও জীবনীসাহিত্যের পরিমাণ এত বিপুল যে তা প্রায় কেনেডি পরিবারকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাহিত্যসম্ভারের সমতুল্য। তবে কিছু গভীর দুর্ভেদ্যতা মান নিজের চারপাশে তৈরি করেছিলেন। বের্টোল্ট ব্রেখট তাঁকে একবার “কড়কড়ে কলার তোলা ভদ্রলোক” বলে অভিহিত করেছিলেন, যা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগেরই প্রতিধ্বনি, তবু জার্মান গদ্যের দাবার ছকে তাঁর অসামান্য দক্ষতাকে অস্বীকার করা যায় না। যায় না তাঁর ঐতিহাসিক মহত্ত্বকে ছিনিয়ে নেয়া। সত্যি বলতে, বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে জার্মানির ভাগ্য ও পরিণতি নিয়ে কোনো গুরুতর আলোচনা টমাস মানকে পাশ কাটিয়ে করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে আমেরিকায় একজন শিক্ষার্থী খুব সহজে মানকে না পড়েও লিবারেল-আর্টস শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারে। সাধারণ পাঠকেরাও স্বাভাবিকভাবেই ‘বুডেনব্রুকস’-এর হ্যানসিয়াটিক অবক্ষয়, ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’-এর স্যানেটোরিয়াম-ভিত্তিক দার্শনিক বিতর্ক, ‘ডক্টর ফস্টাস’-এর সংগীততাত্ত্বিক শয়তানতত্ত্ব কিংবা ‘যোসেফ অ্যান্ড হিজ ব্রাদার্স’-এর বাইবেলীয় পুরাণনির্মাণে ডুব দিতে ইতস্তত বোধ করেন। আশির ও নব্বইয়ের দশকে অবশ্য তাঁর ডায়েরি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, কারণ সেসব ডায়েরি তাঁর সমলিঙ্গীয় আকাঙ্ক্ষার ব্যাপকতা উন্মোচন করেছিল। পরপর চারটি জীবনী প্রকাশিত হয়। নফ প্রকাশনা সংস্থা জন ই. উডসের অনুবাদে তাঁর প্রধান উপন্যাসগুলোর চমৎকার নতুন সংস্করণ বের করে। কিন্তু পরে আবার সেই পুরোনো ধারণাই ফিরে আসে, মেঘ এসে সূর্যকে ঢেকে দিলে যেমন এক মৌন নিষ্প্রভতা তৈরি হয়, ঠিক তেমন। সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি বই, কল্ম টোইবিনের উপন্যাস ‘দ্যা ম্যাজিশিয়ান’(স্ক্রিবনার) এবং ‘রিফ্লেকশন অফ এ নন-পলিটিক্যাল ম্যান’-এর পুনর্মুদ্রণ, সম্ভবত সেই ধারণাকে খুব একটা বিরক্ত করবে না। প্রথমটি মানের জীবন অবলম্বনে লেখা আকর্ষণীয় কিন্তু দর্পহীন এক সাহিত্যিক কল্পনা; দ্বিতীয়টি তাঁর রক্ষণশীল রাজনৈতিক ইশতাহার, যা আজও সমস্যাসংকুল বলে মনে হয়।

টমাস মান
যেহেতু আমি নিজে আঠারো বছর বয়স থেকে প্রায় অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় মানের রচনার প্রতি আসক্ত, তাই সংশয়বাদীদের মন জয় করার জন্য হয়তো আমি উপযুক্ত ব্যক্তি নই। তবু আমি নিশ্চিত জানি কেন বছরের পর বছর বারবার তাঁর কাছে ফিরে যাই। প্রথমত, তিনি অসাধারণ গল্পকার, ধীর প্রস্তুতির পর হঠাৎ নাটকীয় মোচড় দেওয়ার ক্ষমতায় অনন্য। তিনি এমন এক কৌশলী লেখক, যিনি কোনো বিষয়েই, এমনকি নিজের মহিমান্বিত গ্যোয়টেসুলভ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও, পুরোপুরি উদ্যমী নন। তাঁর জটিল সাহিত্যিক গোলকধাঁধার কেন্দ্রে রয়েছে আবেগগত বিশৃঙ্খলা, দার্শনিক উন্মত্ততা এবং এক ধরনের অমানবিক শীতলতার আভাস। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ডান থেকে বামে, সমগ্র বিংশ শতাব্দীর মতাদর্শিক পরিসরে ছুটে বেড়ায়। তাঁর যৌনতা এক প্রদর্শনবাদী রহস্য। জীবন ও সাহিত্য, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর পরস্পরবিরোধী সত্তাগুলো যেন রূপান্তরিত শিলার স্তরের মতো একে অপরের উপর চেপে বসে আছে। মনোলিথদের প্রকৃতিই তো হলো সহজে বৃদ্ধ না হওয়া।

‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ ছিল মানের সন্তানদের দেওয়া একটি ডাকনাম—তা এমন এক দূরত্বকে নির্দেশ করে যা কিনা তিনি আপনজনদের সঙ্গেও বজায় রাখতেন। টোইবিনের এই উপন্যাস তাঁর পূর্ববর্তী সাহিত্যিক-জীবনীমূলক রচনা ‘দ্য মাস্টার’(২০০৪)-এর উত্তরসূরি, যেখানে তিনি হেনরি জেমসের ছায়াময় অন্তর্জগৎ অনুসন্ধান করেছিলেন। মানের অলংকারময় ভাষার বিপরীতে টোইবিনের গদ্য কৃশকায় বলা চলে, তবু তিনি বাহ্যত শীতল এই মানুষটির চরিত্রের বিন্যাসে একধরনের উষ্ণতা তুলে আনেন। তাঁর মান কিছুটা বিভ্রান্ত, আত্মমগ্ন, পুরোপুরি অপছন্দ করার মতো কিংবা একাকী নন; চারপাশের শক্তিশালী ব্যক্তিত্বদের টানে দুলতে থাকা এক মানুষ। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী তাঁর স্ত্রী কাটিয়া প্রিংসহেইম মান, এক ধনী ও সংস্কৃতিমান ইহুদি পরিবারের কন্যা।

প্রথম দর্শনে টোইবিনের এই প্রকল্পকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে, কারণ টমাস মানকে নিয়ে ইতোমধ্যেই অসংখ্য অসাধারণ উপন্যাস লেখা হয়েছে, আর সেগুলোর লেখক স্বয়ং টমাস মান নিজেই। খুব কম কথাসাহিত্যিকই নিজের জীবনকে এত নিরলসভাবে নিজের রচনায় রূপান্তর করেছেন। ‘বুডেনব্রুকস’-এর গর্বিত ও আহত বালক হ্যানো, যে পিয়ানোয় ওয়াগনারীয় কল্পনা সৃষ্টি করে; ‘টোনিও ক্রোগার’-এর অহংকারী, আহত তরুণ লেখক, যে কিনা শিল্পের জন্য জীবন উৎসর্গ করে; ‘রয়াল হাইনেস’-এর প্রিন্স ক্লাউস হাইনরিখ, যিনি কঠোর শৃঙ্খলার সঙ্গে নিজের রাজকীয় কর্তব্য পালন করে চলেন; ‘ডেথ ইন ভেনিস’-এর গুস্তাভ ফন আশেনবাখ, প্রথানুগত, আত্মসংযমী, খ্যাতিমান সাহিত্যিক, যিনি ভেনিসের সমুদ্রতীরে এক কিশোরের প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন; ‘যোসেফ অ্যান্ড হিজ ব্রাদার্স’-এর মুত-এম-এনেত, পোটিফারের স্ত্রী, যিনি সুদর্শন হিব্রু যুবক যোসেফের প্রেমে উন্মত্ত হয়ে পড়েন; ‘ফেলিক্স ক্রাল’-এর প্রতারক নায়ক যে কিনা মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে সে আসলে যতটা দেখা যায় তার চেয়েও অনেক বেশি অসাধারণ; কিংবা ‘ডক্টর ফস্টাস’-এর সুরকার আদ্রিয়ান লেভারক্যুন, যাকে তুলনা করা হয়েছে “এমন এক অতল গহ্বরের সঙ্গে, যেখানে অন্যেরা তার প্রতি যে অনুভূতিই প্রকাশ করুক না কেন, তা নিঃশব্দে তলিয়ে যায়, কোনো চিহ্ন না রেখেই।” এরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে লেখক মানেরই প্রতিরূপ। অনেক সময় তো তারা সরাসরি তাঁর চিঠি ও ডায়েরির ভাষা, ভাবনা এবং অভিজ্ঞতারই বাহক হয়ে ওঠে। মান প্রায়ই বলতেন, তিনি গল্প উদ্ভাবন করেন না, বরং খুঁজে পান। জার্মান ভাষার finden (খুঁজে পাওয়া) এবং erfinden (উদ্ভাবন করা), শব্দদুটো নিয়ে এটি ছিল তাঁর এক প্রিয় শব্দখেলা।

তাঁর সবচেয়ে চমৎকার আত্মনাট্যায়ন দেখা যায় ১৯৩৯ সালের উপন্যাস ‘লোটে ইন ওয়েমার’-এ। এখানে বয়োবৃদ্ধ গ্যোয়টে ও তার পুরোনো প্রেমিকা শার্লট বাফের পুনর্মিলনের কাহিনি বলা হয়েছে যে কিনা কিছু দশক আগেই ‘দ্য সরোস অফ ইয়াং ওয়ারদার’-এ লোটের চরিত্রকে অনুপ্রাণিত করেছে। গ্যোয়টে মান নিজের বহু বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ করেছেন; কখনও প্রশংসাসূচকভাবে, কখনও সমালোচনামূলকভাবে। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যদের জীবন থেকে খাদ্য গ্রহণ করেন এবং শিষ্যদের কাজও আত্মসাৎ করেন, তারপর নিজের প্রতিভার ছাপ দিয়ে সবকিছুকে নতুন রূপ দেন। মান নিজেও পরিবার-পরিজনসহ অগণিত মানুষকে সাহিত্যিক উপাদানে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁদের একজন আজও জীবিত, তাঁর নাতি ফ্রিডো মান। ছোটোবেলায় তিনি তাঁর ওপা, অর্থাৎ দাদার সঙ্গ খুব ভালোবাসতেন। পরে আবিষ্কার করেন, ‘ডক্টর ফস্টাস’-এ তাঁর একটি কাল্পনিক প্রতিরূপ রয়েছে যাকে কিনা আবার মেরেও ফেলা হয়েছে।

আত্মবিরোধ থেকে আধুনিকতার শিখরে টমাস মান
অতএব, মান নিজেই যে একদিন তাঁর ব্যবহৃত সাহিত্যিক কৌশলের শিকার হবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। টোইবিনের উপন্যাসের প্রথম দিকের অধ্যায়গুলোতে উত্তর জার্মানির ল্যুবেক শহরে কৈশোরে মানের ছেলেদের প্রতি আকর্ষণের অভিজ্ঞতাগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে আমরা আর্মিন মার্টেন্সের সঙ্গে পরিচিত হই, যার সঙ্গে মান দীর্ঘ, আকুল পদচারণায় অংশ নিতেন। টোইবিন লিখেছেন, “মান আশা করতেন আর্মিন হয়তো কোনো ইঙ্গিত দেবে, হয়তো কোনো এক হাঁটাচলার সময় কবিতা ও সংগীতের আলোচনা ছেড়ে নিজেদের অনুভূতির কথা বলবে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, এই হাঁটাগুলোর গুরুত্ব তাঁর কাছে যতখানি, আর্মিনের কাছে ততটা নয়। “মনে প্রশ্ন জাগে, ‘টোনিও ক্রোগার’-এর সেই বিখ্যাত অংশটির সমান্তরালে এর সামঞ্জস্য কেমন, যেটা কিনা ১৯০৩ সালের পক্ষে যথেষ্ট সাহসী ছিল। সেখানে টোনিও উপলব্ধি করে: “সে সুস্পষ্টভাবে জানত যে অন্যজন এই একসঙ্গে হাঁটাকে তার অর্ধেক গুরুত্বও দেয়না। বাস্তবতা ছিল যে টোনিও হ্যান্স হ্যানসেনকে খুব ভালোবাসত এবং তার জন্য ইতোমধ্যেই অনেক কষ্ট সহ্য করেছিল। তার চৌদ্দ বছর বয়সি হৃদয় তাই শিখে নেয় জীবনের একটি কঠিন ও সরল সত্য, যে বেশি ভালোবাসে, সে-ই অধস্তন, এবং তাকেই কষ্ট পেতে হয়।”

টোইবিন অবশ্য জীবনীসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ ঘটেছে যৌনতার ক্ষেত্রে। সব তথ্য বিচার করলে মনে হয়, মান সম্ভবত কখনও এমন কোনো সম্পর্কে জড়াননি, যাকে আজকের মানদণ্ডে সমকামী যৌন সম্পর্ক বলা যায়। তাঁর ডায়েরি তথ্যগত দিক থেকে নির্ভরযোগ্য এবং বিব্রতকর বিষয় এড়িয়ে যায় না; সেখানে উত্থান, হস্তমৈথুন, স্বপ্নদোষের উল্লেখও আছে। কিন্তু পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্ক করা তো দূর, কল্পনা করতেও তাঁর যেন অসুবিধা হতো। ১৯৫০ সালে গোর ভিদালের ‘দ্য সিটি অ্যান্ড দ্য পিলার’ পড়ে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, “ভদ্রলোকদের সঙ্গে কীভাবে শোয়া যায়?” কিন্তু ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’-এ টোইবিনের মানকে কয়েকটি সমলিঙ্গীয় ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যদিও সেসবের বর্ণনা অস্পষ্ট ও সংযত।

উপন্যাসটির সবচেয়ে স্মরণীয় অংশে যৌনতা ও রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, আর সাথে সামান্য কিছু বিকৃত পরিণতি। ১৯৩৩ সালের বসন্তে, নির্বাসনের কয়েক মাস পর, মান উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন তাঁর পুরোনো ডায়েরিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। সেগুলো মিউনিখে পারিবারিক বাড়িতে রয়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে তিনি ডানপন্থি জাতীয়তাবাদ ত্যাগ করেছিলেন এবং নাৎসি শাসকগোষ্ঠীর চোখে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিলেন। রাইনহার্ড হাইডরিখ তাঁকে গ্রেপ্তার করারও ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। সেই অবস্থায় ডায়েরিগুলো তাঁর সুনাম ধ্বংসের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারত। তাঁর ছেলে গলো সেগুলো একটি সুটকেসে ভরে সুইজারল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও সেগুলো পৌঁছায়নি। এপ্রিলের শেষের দিকের ডায়েরির একটি পাতায় মান লিখেছিলেন, “ভয়ংকর, এমনকি প্রাণঘাতী ঘটনাও ঘটতে পারে।” বহু দশক পরে জানা যায়, এক জার্মান সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তা সুটকেসটি আটকে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কেবল উপরের স্তরে থাকা বইয়ের চুক্তিপত্রগুলোই পরীক্ষা করেছিলেন। সেগুলো হাইডরিখের রাজনৈতিক পুলিশের কাছে পাঠানো হয়, তারা দেখে ফেরত দেয়, এবং তারপর সুটকেসটিকে গন্তব্যে যেতে দেওয়া হয়।

টোইবিন এই হারিয়ে যাওয়া ডায়েরিগুলো নিয়ে মানের আতঙ্ককে জীবন্ত করে তুলেছেন। একটি চমৎকার দৃশ্যে দেখা যায়, তিনি জুরিখের একটি বইয়ের দোকানে গিয়ে অস্কার ওয়াইল্ডের জীবনী খুঁজছেন। কারণ, তিনি কল্পনা করছিলেন: “যদিও তিনি ওয়াইল্ডের মতো কোনো তথ্য প্রকাশের ফলে কারাগারে যাওয়ার আশা করেননি, যেটা কিনাওয়াইল্ড গিয়েছিল, এবং তিনি জানতেন যে ওয়াইল্ডের জীবন ছিল অশালীন, যেটা তাঁর নয়, তবুও বিখ্যাত লেখক থেকে জনসমক্ষে অপমানিত সার্বজনীন ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার বিষয়টাই তাঁকে আকর্ষণ করেছিল।”

এই উদ্বেগের মধ্যেই মান স্মরণ করেন ১৯২৭ সালের একটি ঘটনা। তখন তাঁর বয়স বায়ান্ন, তখন ক্লাউস হয়জার নামের এক আঠারো বছরের তরুণের প্রতি তিনি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মান সেই সময়ের ডায়েরিগুলো ধ্বংস করে দিয়েছিলেন; বর্তমানে সংরক্ষিত খণ্ডগুলো ১৯১৮ থেকে ১৯২১ এবং ১৯৩৩ থেকে ১৯৫৫ সালের। তবে পরবর্তী মন্তব্যগুলো থেকে বোঝা যায় যে তিনি এটিকে একজন পুরুষের সঙ্গে তাঁর একমাত্র পরিপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে বিবেচনা করতেন। টোইবিন এটি এভাবে বর্ণনা করেছেন : “টমাস উঠে বুককেসগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। নিজেকে সামলে নেওয়ার কিংবা ক্লাউসের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনার সুযোগ পাওয়ার আগেই ক্লাউস দ্রুত ঘর পেরিয়ে তাঁর কাছে এসে দাঁড়াল। এক মুহূর্তের জন্য সে টমাসের দুই হাত নিজের হাতে ধরে রাখল, তারপর আলতো করে তাঁকে ঘুরিয়ে এমনভাবে মুখোমুখি করল যে তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল, এবং তারপর চুম্বন করল।” বর্ণনা সেখানেই থেমে যায়, যদিও পরবর্তী ঘনিষ্ঠতার কিছু আভাস রেখে।

ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসিফিক প্যালিসেডসে তাঁদের বাসভবনের প্রবেশপথে টমাস মান ও কাতিয়া মান, ১৯৪১। সূত্র: ইটিএইচ লাইব্রেরি জুরিখ, টমাস মান আর্কাইভস।
টোইবিন সেই মুহূর্তকে রোমান্টিকভাবে পুনর্নির্মাণ করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক সাক্ষ্য একমুখী নয়। পরবর্তীকালে গবেষক কার্ল ভের্নার বোম হয়জারকে খুঁজে বের করে সাক্ষাৎকার নেন। তখন জানা যায়, হয়জার নিজেও সমকামী ছিলেন। কিন্তু তাঁর দাবি ছিল, মানের সঙ্গে কোনো যৌন সম্পর্ক তো দূরের কথা, কোনো রকম যৌন ঘনিষ্টতাও ঘটেনি। তিনি কখনও বুঝতেই পারেননি যে এই সংযত ও ভদ্র বয়স্ক মানুষটি তাঁর প্রতি কোনো রোমান্টিক আকর্ষণ অনুভব করতেন।

আজকের চোখে মানকে হয়তো অতিরিক্ত দমিত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অন্য একটি আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাঁর এই নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে এক ধরনের নৈতিক মর্যাদাও খুঁজে পাওয়া যায়। পারিবারিক বন্ধুর সন্তান হয়জারের সঙ্গে আরও এগিয়ে যাওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার বা শিকারীসুলভ আচরণ হিসেবে দেখা যেতে পারত। অবশ্য মানকে থামিয়েছিল তাঁর নৈতিক বিবেচনা নয়; বরং শারীরিক ঘনিষ্ঠতার প্রতি এক গভীর ভীতি। সম্ভবত টোইবিনের উপন্যাসের মতো হয়জার যদি সত্যিই এতটা আগ্রহী হয়ে উঠতেন, তবে মান ঘর থেকেই পালিয়ে যেতেন।

যাইহোক, ম্যাজিশিয়ানে টমাসের এই সম্পর্ক তাঁর মনে হতাশার চেয়ে আনন্দই বেশি জাগিয়েছিল। বহু বছর পরে তিনি হয়জারকে স্মরণ করেছিলেন “গর্ব ও কৃতজ্ঞতা” নিয়ে। কারণ, তাঁর কাছে এটি ছিল “এক আজীবন আকাঙ্ক্ষার অপ্রত্যাশিত পূর্ণতা।”

এই সবকিছুর মধ্যেই মান একটি মোটামুটি সুখী দাম্পত্যজীবনে আবদ্ধ ছিলেন। এমন এক দাম্পত্য, যার শারীরিক দিকটি এতটাই সন্তোষজনক ছিল যে তাদের ছয়টি সন্তানের জন্ম হয়। ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’-এর অন্যতম সাফল্য হলো দৃঢ়চেতা ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি কাটিয়া মানের সমৃদ্ধ প্রতিকৃতি। বিয়ের আগে তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন; কিন্তু বিয়ে তাঁর একাডেমিক জীবনের সম্ভাবনাকে শেষ করে দেয়। একজন সমকামী পুরুষের যমজ বোন হিসেবে কাটিয়া তাঁর স্বামীর কলেজপড়ুয়া তরুণদের প্রতি মাঝেমধ্যে জন্ম নেওয়া আকর্ষণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন; একই সঙ্গে এটাও জানতেন যে এসব আকর্ষণের কোনো বাস্তব পরিণতি ঘটবে না। ১৯৫০ সালে যখন মান জুরিখের এক হোটেল-ওয়েটার, ফ্রানৎস ভেস্টারমায়ারের প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন, কাটিয়া তখন রসিক মন্তব্য ছুড়ে দিতেন, ফলে তাঁদের মেয়ে এরিকা পারিবারিক সুনাম নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতেন। ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’-এ এরিকার একটি সংলাপ : “সারা পৃথিবী যখন দেখছে, তখন তুমি কোনো হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে একজন ওয়েটারের সঙ্গে প্রেমালাপ করতে পারো না”—নাটকীয় বলে মনে হতে পারে, অথচ এটি সরাসরি মানের ডায়েরি থেকে নেওয়া।

যতই দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে লেখা হোক না কেন, ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ শেষ পর্যন্ত মানের চরিত্রের সেই সম্রাটসুলভ বৈচিত্র্যকে খানিকটা সংকুচিত করে ফেলে। সেখানে তিনি পরিচিত এক মানবিক রূপে আবির্ভূত হন; কিছুটা করুণ, কিছুটা আত্মগোপনকারী, এমন একজন মানুষ যিনি মাঝেমধ্যে নিজের আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। অথচ বাস্তবের মান কখনও তাঁর আকাঙ্ক্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি; আবার সেগুলোকে পুরোপুরি গোপনও রাখেননি। তাঁর সাহিত্যজীবনের একেবারে শুরু থেকেই সমকামী আকর্ষণের বিষয়বস্তু তাঁর লেখায় উপস্থিত ছিল, এবং তিনি স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন যে তাঁর গল্পগুলো আত্মজীবনীমূলক। ১৯৩১ সালে যখন একটি সংবাদপত্র তাঁকে তাঁর “প্রথম প্রেম” সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি মূলত উত্তর দিয়েছিলেন, “‘টোনিও ক্রোগার’ পড়ুন।” একইভাবে ‘ডেথ ইন ভেনিস’ সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, “এখানে কিছুই উদ্ভাবিত নয়।” সমকামী পাঠকেরা লেখককে নিজেদের একজন বলেই বিবেচনা করতেন। সুরকার নেড রোরেম তরুণ বয়সে মানের একটি বক্তৃতায় সামনের সারিতে বসেছিলেন, এই আশায় যে তাঁর সৌন্দর্য মঞ্চের সেই মহান ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণ করবে। পরে রোরেমের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ছিল, “তিনি একবারও তাকাননি।”

টোইবিন যদি আমাদের সামনে খানিকটা গৃহপালিত টমাস মানকে হাজির করেন, তবে ‘রিফ্লেকশনস অফ এ নন-পলিটিক্যাল ম্যান’-এর নতুন সংস্করণ তাঁকে আরও বেশি ক্ষুদ্র করে ফেলে; যেন সেই মহা-দ্ব্যর্থসৃষ্টিকারী লেখককে নামিয়ে আনা হয়েছে একজন সংবাদপত্রের মতামত-লেখকের স্তরে। বইটির ভূমিকা লেখক ইতিহাসবিদ মার্ক লিলা মনে করেন, শিল্পকলার জগতে বর্তমান মতাদর্শগত প্রথানুবর্তিতার বিষয়ে মানের কিছু বলার আছে। কিন্তু এই পাঠ গভীরভাবে বিভ্রান্তিকর। কারণ, মান নিজেই পরবর্তী জীবনে এই গ্রন্থকে তাঁর রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতার দলিল হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প-যুগের আমেরিকার প্রেক্ষাপটে ‘রিফ্লেকশন্স’-এর প্রকৃত শিক্ষা বরং এই যে, শিক্ষিত মানুষও কীভাবে অযৌক্তিকতা ও সহিংসতার সঙ্গে আপোশ করে নিতে পারে।

আত্মবিরোধ থেকে আধুনিকতার শিখরে টমাস মান

১৯১৮ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মানের মনকে আচ্ছন্ন করা উগ্র দেশপ্রেমে সম্পূর্ণ সিক্ত। পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি এতে রয়েছে গভীর অবজ্ঞা, এবং তাঁর ভাই হাইনরিশ মানের প্রতি তীব্র ক্ষোভ। যদিও হাইনরিশের নাম কোথাও উল্লেখ করা হয়নি, তিনি বইটিতে “সভ্যতার সাহিত্যিক” (Zivilisationsliterat) রূপে উপস্থিত। হাইনরিশ বিশ্বনাগরিক আদর্শের পক্ষে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, এবং তাঁর সমসাময়িক উপন্যাস ‘দার উনটারটান’-এ দেখিয়েছিলেন কীভাবে জার্মান জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে উগ্র জাত্যভিমান, সামরিকতন্ত্র এবং ইহুদিবিদ্বেষে অবনমিত হয়েছিল। তাঁর মতে, শিল্পীদের উচিত ছিল আরও আলোকিত পথ দেখানো। এর জবাবে টমাস মান ‘রিফ্লেকশন্স’-এ যুক্তি দিলেন যে যুদ্ধ স্বাস্থ্যকর ও আলোকপ্রাপ্তি সন্দেহজনক। তাঁর ভাষায়, শিল্পের মধ্যে “মূলগতভাবে এক অবিশ্বস্ত, বিশ্বাসঘাতক প্রবণতা রয়েছে; কেলেঙ্কারিপূর্ণ অযৌক্তিকতার প্রতি তার আনন্দ এবং সৌন্দর্যসৃষ্টিকারী ‘বর্বরতা’র প্রতি তার ঝোঁক কখনও নির্মূল করা যায় না।”

তবে মান খুব দ্রুতই নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেন। বন্ধুদের তিনি বলতে থাকেন যে বইটিকে রাজনৈতিক গ্রন্থের চেয়ে উপন্যাস হিসেবে পড়াই ভালো। ১৯২২ সালের মধ্যে তিনি হাইনরিশের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন এবং ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন জানান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘রিফ্লেকশন্স’ তাঁকে ক্রমশ বিব্রত করতে থাকে। তিনি আশঙ্কা করতে থাকেন যে বইটি হয়তো জার্মানির নাৎসিবাদের দিকে পিছলে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। যদিও তিনি কখনও প্রকাশ্যে গ্রন্থটিকে অস্বীকার করেননি, ১৯৪৪ সালে মন্তব্য করেছিলেন যে বইটি ‘যথার্থভাবেই’ কখনও ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি। তিনি আরও যোগ করেছিলেন, “জার্মান ভাষাতেও আমার এটি প্রকাশ করা উচিত ছিল না; এর চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত এবং একই সঙ্গে অপব্যবহারের উপযোগী মতামত আর কখনও লেখা হয়নি।” তাঁর মতে, তখন বইটির একমাত্র মূল্য ছিল এই যে, এটি ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’-এর শিকড় বুঝতে সাহায্য করে, যে উপন্যাসে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব আরও প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরায় ফিরে এসেছে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়; নিউ ইয়র্ক রিভিউ বুকস সেই অনুবাদকেই পুনর্মুদ্রণ করেছে।

এই পুনর্মুদ্রণের প্রথম সমস্যা হলো, এটি যেন এক শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এমন এক পরিস্থিতি, যা মানকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করত। তাঁর প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ গদ্যরচনাই হয় ইংরেজিতে পাওয়া যায়না, নয়তো কখনও অনূদিতই হয়নি। আমাদের দরকার একটি নবায়িত ‘টমাস মান রিডার’, যেখানে ‘রিফ্লেকশন্স’-এর অংশগুলোর পাশাপাশি ‘এন আপিল টু রিজন’, ‘দ্য কামিং ভিক্টরি অফ ডেমোক্রেসি’, ‘দ্য ক্যাম্পস’(১৯৪৫ সালের হলোকাস্ট নিয়ে প্রথমদিকের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর একটি), ‘জার্মানি অ্যান্ড দ্য জার্মানস’ এবং ‘অন দ্য অকেশন অফ এ ম্যাগাজিন’—এই লেখাগুলোও থাকবে। শেষোক্ত প্রবন্ধটি ১৯৪৯ সালে লেখা হলেও অপ্রকাশিত ছিল; ম্যাকার্থিবাদের বিরুদ্ধে এটি ছিল মানের নিজস্ব “আমি অভিযোগ আনছি”(J’Accuse!)। ‘রিফ্লেকশন্স’-এর বর্তমান সংস্করণে অবশ্য ১৯২২ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ “অন দ্য জার্মান রিপাবলিক” সংযোজিত হয়েছে, যেখানে মান গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর সমর্থন ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তা আগের দীর্ঘ বক্তৃতাধর্মী উগ্রতার ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ।

যথাযথ প্রেক্ষাপট দিলে ‘রিফ্লেকশন্স’ এক ভয়াবহ অথচ আকর্ষণীয় পাঠ্য হয়ে ওঠে। এখানে মান নিজের সম্পর্কে যতখানি উন্মোচিত করেছেন, তাঁর আত্মজীবনীমূলক কথাসাহিত্যেও হয়তো ততটা করেননি। অ্যান্থনি হেইলবাট তাঁর ১৯৯৬ সালের গবেষণা “টমাস মান : ইরোস অ্যান্ড লিটারেচার”-এ দেখিয়েছেন যে মানের পরিচিত যৌন আবেশগুলো বইটিতেও সক্রিয়। তিনি কল্পনা করেন, জার্মানির বলিষ্ঠ সৈনিকেরা তাঁর লেখনী থেকে শক্তি সঞ্চয় করছে। ‘ডেথ ইন ভেনিস’ নাকি বিশেষভাবে ট্রেঞ্চে জনপ্রিয় ছিল। তাঁর ধারণা, সহযোদ্ধাদের মধ্যে “ইন্দ্রিয়পরায়ণ আবেগ” এমন মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে যে যুদ্ধফেরত সৈনিকেরা হয়তো আর নিজেদের স্ত্রীর প্রতিও আকৃষ্ট থাকবে না। আরও বিস্ময়কর, একটি অংশে তিনি যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়ে মানবতাবাদীদের শোকপ্রকাশের জবাব দেন নিজের এক সন্তানের কঠিন জন্মের প্রসঙ্গ টেনে। তাঁর মন্তব্য: “সেটি মানবিক ছিল না, নারকীয় ছিল; এবং যতদিন পৃথিবীতে এমন ঘটনা ঘটবে, ততদিন যুদ্ধ থাকলেও আমার আপত্তি নেই।”

‘রিফ্লেকশন্স’ আসলে ইঙ্গিত, অনুকরণ, আড়াল করা অপমান, উৎসবিহীন উদ্ধৃতি, সাহিত্যচুরি এবং আত্মভক্ষণে গঠিত এক অসাধারণ জটিল নির্মাণ। এস. ফিশার প্রকাশনীর টীকাসহ সংস্করণে গবেষক হারমান কুর্ৎসকে প্রায় আটশো পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা যোগ করেছেন, যেখানে চার হাজারেরও বেশি উদ্ধৃতির উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। অথচ নিউ ইয়র্ক রিভিউ বুকসের সংস্করণে কোনো সূচি নেই; মাত্র পাঁচ পৃষ্ঠার টীকা রয়েছে, তাও মূলত জার্মান কবিতার উদ্ধৃতি নিয়ে। ফলে পাঠকেরা অন্ধকারেই থেকে যান। “অসীম সরল অথচ দানবীয় যন্ত্রণাক্লিষ্ট”  লেখকটি যে ফ্রাঙ্ক ভেডেকিন্ড, তা জানতে পারেন না; ওয়াগনারের ‘লোহেংরিন’-কে ব্যঙ্গ করা উপন্যাসটি যে ‘দার উনটেরটান’, তাও বোঝেন না; কিংবা “একজন মানুষের মূল্য নির্বিশেষে তাকে স্বীকার করে নেওয়া” বাক্যাংশটির উৎস যে সমকামী সমাজতত্ত্ববিদ হান্সব্ল্যুহার, সে তথ্যও তাঁদের অজানা থেকে যায়।

বইটির ভূমিকাটি বিশেষভাবে বিব্রতকর। লিলার অন্যান্য বই, যেমন, “দ্য রেকলেস মাইন্ড : ইন্টালেকচুয়ালস ইন পলিটিক্স” বা “দ্য স্টিলবর্ন গড : রিলিজিয়ন, পলিটিক্স অ্যান্ড দ্য মডার্ন ওয়েস্ট” যতই মূল্যবান হোক, টমাস মান বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর যোগ্যতা সীমিত। তিনি দাবি করেন, ‘বুডেনব্রুকস’ এবং ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’-এর মধ্যবর্তী সময়ে মান কোনো উপন্যাস লেখেননি। এভাবে তিনি সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার ‘রয়াল হাইনেস’-কে কার্যত অস্তিত্বহীন করে দেন। তিনি লেখেন, হিটলার ক্ষমতায় আসার সময় মান বিদেশে বক্তৃতাসফরে ছিলেন, যা সত্য নয়। তিনি বলেন, তরুণ হাইনরিশ মান “কড়া বামপন্থী ব্যঙ্গরচনা” লিখতেন, অথচ হাইনরিশের সাহিত্যজীবনের শুরু ডানপন্থি অবস্থান থেকেই। এমনকি “Zivilisationsliterat” শব্দটিকেও তিনি ভুল বানানে লিখেছেন।

আত্মবিরোধ থেকে আধুনিকতার শিখরে টমাস মান
তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর হলো ‘রিফ্লেকশন্স’-কে ঘিরে তাঁর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা। বইটির বিপজ্জনক মতাদর্শিক প্রবণতা তিনি স্বীকার করলেও এর তথাকথিত “জ্যাকোবিন বিরোধী” অবস্থানের প্রতি সহানুভূতি দেখান, কারণ তা নাকি তাঁকে আজকের বিশ্বের কিছু রাজনৈতিক প্রবণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর মতে, মানের গ্রন্থের কিছু বাক্য আজও লেখা যেতে পারত। কিন্তু বাস্তবে মান যে শক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাচ্ছিলেন, সে শক্তি কোনো সর্বশক্তিমান মতাদর্শিক পুলিশ ছিল না; বরং ছিল এক ক্রমশ স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া সামরিক রাষ্ট্রের মধ্যে দুর্বল অবস্থানে থাকা উদারপন্থি কিছু বুদ্ধিজীবী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং মিউনিখে নাৎসিবাদের উত্থানই শেষ পর্যন্ত মানকে বুঝিয়েছিল যে তিনি ভয়াবহ ভুল পথে হাঁটছেন। কিন্তু ‘রিফ্লেকশন্স’ লেখার সময়ও তাঁর মধ্যে সংশয়ের কম্পন ছিল। একদিকে জার্মান যুদ্ধোন্মাদনা, অন্যদিকে বিশ্বনাগরিক ইউরোপীয় চেতনা—এই দুইয়ের মধ্যে তিনি ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিলেন। বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানেই : নিজের বিরোধাভাসের ভারে এটি নিজেই বারবার টলমল করে ওঠে। শত শত পৃষ্ঠা লেখার পর মান স্বীকার করেন যে তাঁর প্রধান যুক্তি, বামপন্থিরা নাকি নিষ্পাপ শিল্পক্ষেত্রে রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়েছে, আসলে অসংগত, কারণ “অরাজনীতিও এক ধরনের রাজনীতি।” দীর্ঘ গণতন্ত্রবিরোধী বক্তৃতার পর তিনি আবার বলেন, জার্মানিতে গণতন্ত্র অনিবার্য। তাঁর অপেক্ষাকৃত সুস্থ মুহূর্তগুলোতে তিনি কেবল এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন, যা স্বাধীনতার বুলি আওড়াতে আওড়াতে অন্য জাতিকে অধীন করে রাখে না।

এই কারণেই ‘রিফ্লেকশন্স’ শেষ পর্যন্ত কোনো স্থির মতাদর্শের বই নয়; বরং এক লেখকের ধীরে ধীরে জেগে ওঠার দলিল, যিনি আগে কখনও রাজনীতি নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে ভাবেননি। এখান থেকেই শুরু হয় সেই দীর্ঘ যাত্রা, যার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করেন। হারমান কুর্ৎসকের ভাষায়, জার্মানিতে জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ যখন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম, ঠিক তার আগেই মান নিজে সেই রোগে আক্রান্ত হন, এবং শেষ পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে হিটলারবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের মানসিক প্রতিরোধক্ষমতা প্রদান করে।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মান জোর দিয়ে বলে গেছেন যে শিল্প ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার যেকোনো চেষ্টা এক বিপজ্জনক বিভ্রম। ১৯৪৫ সালে হারমান হেসকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত প্রকাশ করেছিলেন: “আজ আমি বিশ্বাস করি, কোনো জীবন্ত সত্তাই রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে না। প্রত্যাখ্যানও এক ধরনের রাজনীতি; এর মাধ্যমে মানুষ অশুভ শক্তির রাজনীতিকেই এগিয়ে দেয়।”

তাঁর মতে, শিল্পীরা যদি স্বাধীনতার কল্পনায় নিজেদের হারিয়ে ফেলেন, তবে তাঁরা শেষ পর্যন্ত অত্যাচারীদের হাতিয়ারে পরিণত হন। কারণ অত্যাচারীরা সবসময়ই শিল্পকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চায়, যাতে নিপীড়নের কাজ নির্বিঘ্নে চলতে পারে। ১৯৩৭ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে একটি বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, রাজনীতি বর্জনকারী কবি আসলে “আত্মিকভাবে পথহারা মানুষ।” পরবর্তী কথাসাহিত্যেও এই বিশ্বাস গভীরভাবে খোদিত। ‘ডক্টর ফস্টাস’-এর প্রধান বিষয়বস্তুই হলো পুরোনো রোমান্টিক আদর্শের উন্মাদনা।

অতএব, মার্ক লিলার মতো যদি বলা হয় যে মান সারাজীবন শিল্পীস্বাধীনতার কোনো চিরন্তন নীতিতে অবিচল ছিলেন, তবে তা তাঁর সমগ্র সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক যাত্রাপথকে উল্টো করে পড়া হবে। বাস্তবে তিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি ও শিল্প, উভয় ক্ষেত্রেই কিছু সীমার প্রয়োজন।

তবে মানের যৌনতা ও রাজনীতির এই জটিল গিঁট এতটাই বিস্তৃত যে তা প্রায়ই তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনাকে গ্রাস করে ফেলে। অথচ এই গিঁটের বাইরে গিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশ বোঝা অসম্ভব। ‘বুডেনব্রুকস’(১৯০১) থেকে 'দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’(১৯২৪)-এর দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়।

বিশের কোঠায় থাকা এক তরুণ লেখকের জন্য ‘বুডেনব্রুকস’ ছিল বিরাট সাফল্য। কিন্তু এরপর শুরু হয় অনিশ্চয়তার দীর্ঘ সময়। নানা অসমাপ্ত প্রকল্প, বারবার নতুন সূচনা। ‘ফিওরেঞ্জা’ সাভোনারোলা ও মেডিচি পরিবারকে নিয়ে লেখা বাগাড়ম্বরপূর্ণ নাটক, কঠোর সমালোচনার শিকার হয়। ‘রয়াল হাইনেস’ এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক বিবাহকাহিনি, পাঠকের কাছে আশানুরূপ গভীরতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে হাইনরিশ মান একের পর এক সাফল্য পাচ্ছিলেন। দুই ভাইয়ের সম্পর্কের অবনতির অন্যতম কারণ ছিল ১৯১৫ সালে জোলা সম্পর্কে লেখা একটি প্রবন্ধে হাইনরিশের কটাক্ষ: “যারা অল্প বয়সেই শুকিয়ে যাওয়ার জন্য নিয়তিবদ্ধ, তারাই বিশের কোঠার শুরুতে সচেতন ও সম্মানিত রূপে আবির্ভূত হয়।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে মান প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন দ্বিতীয় একটি শ্রেষ্ঠকীর্তি রচনার। তিনি ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটকে নিয়ে উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন, আরও বহু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ভেবেছিলেন। কিন্তু কিছুই সফল হলো না। শেষে তিনি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করলেন, এক আকর্ষণীয় প্রতারককে নিয়ে গল্প, সুইস স্যানাটোরিয়ামে যক্ষ্মারোগীদের নিয়ে কাহিনি, কিংবা ভেনিসের সমুদ্রসৈকতে কাটানো ছুটির অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি নভেলা।

আত্মবিরোধ থেকে আধুনিকতার শিখরে টমাস মান
এই শেষের কাজটিই, ১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘ডেথ ইন ভেনিস’, তাঁর পরিণত শিল্পরীতির দ্বার খুলে দেয়। কিন্তু সেটি ছিল এক জটিল আত্মব্যঙ্গ। তাঁর অপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো তিনি সেখানে নিজেরই এক বয়স্ক, ক্লান্ত সংস্করণের উপর আরোপ করেছিলেন। যেন নিজের অহংকারকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা, এক ধরনের শিল্পসুলভ আত্মহত্যা। যৌবনে মান আত্মহত্যার প্রবণতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন, আর নিজের ভিন্ন সত্তার প্রতিরূপদের ধ্বংস করে দেওয়ার মধ্যে একধরনের শুদ্ধিমূলক তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।

‘রিফ্লেকশন্স’-এ তিনি ‘ডেথ ইন ভেনিস’ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যার কথাও বলেন। অনেক পাঠক নভেলাটিকে “মহৎ শৈলী” অর্জনের এক অনুশীলন বলে মনে করেছিলেন। অথচ মানের কাছে এটি ছিল নিজের সেই শৈল্পিক সাধনারই ব্যঙ্গচিত্র। ‘ডেথ ইন ভেনিস’ আসলে এক রসাত্মক রচনা, তবে গাঢ় অন্ধকার। এর বর্ণনাকারীর মহিমান্বিত ভাষা বারবার অতিরঞ্জনের সীমা অতিক্রম করে হাস্যকর হয়ে ওঠে। চূড়ান্ত ভাঙনের মুহূর্ত আসে তখন, যখন আমাদের বিশ্বাস করানো হয় যে আশেনবাখের অলৌকিক গদ্যরচনা পৃথিবী উপভোগ করবে, কিন্তু তার নোংরা উৎস সম্পর্কে কিছুই জানবে না। অথচ শিল্প ও জীবনের মধ্যকার সীমানা একবার টানা মাত্রই বিলীন হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সমান্তরালভাবে একটি নান্দনিক সংকটও এসে উপস্থিত হয় এবং সেই সংকটই মানকে আরেকটি সৃজনশীল উত্থানের দিকে নিয়ে যায়। ‘রিফ্লেকশন্স’-এর প্রথম দিকের অধ্যায়গুলোতে মান যেন একটি সুসংগঠিত যুক্তি নির্মাণ করতে চাইছেন। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই সেই ভান ভেঙে পড়ে এবং বইটি ক্রমশ ডায়েরির মতো বিচ্ছিন্ন টুকরোর এক কোলাজে পরিণত হয়। একের পর এক অভিজ্ঞতা এসে বর্ণনার মধ্যে জুড়ে যেতে থাকে; ডাকযোগে বন্ধুদের নতুন বই এসে পৌঁছানো, হান্স ফিট্সনারের অপেরা ‘প্যালেসট্রিনা’-এর মঞ্চায়ন দেখা, যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি ও পশ্চাদপসরণের সংবাদ শোনা। পরবর্তী বৃহৎ রচনা ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’-এও মান প্রায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তবে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পকুশলতার সঙ্গে। তাঁর দৈনন্দিন জীবনের আপাত আকস্মিক ঘটনাগুলো; আত্মা ডাকার আসরে উপস্থিতি, এক্স-রে যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয়, গ্রামোফোনের আগমন; সবকিছুই অনায়াসে জায়গা করে নেয় সেই স্যানেটোরিয়াম-নির্ভর মহাকাব্যিক উপন্যাসে। ‘রিফ্লেকশন্স’-এর ভারী ও অগোছালো আত্মসংগ্রাম শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক স্বতন্ত্র উপন্যাস-প্রযুক্তিতে, যা মান পরবর্তী পুরো সাহিত্যজীবন জুড়েই ব্যবহার করেন।

মানের এই নতুন রচনাশৈলী ছিল উচ্চবিত্ত বুর্জোয়া রূপে প্রকাশিত আধুনিকতাবাদ; স্তরবিন্যাস ও জটিলতায় যা জেমস জয়েসের রচনার সমকক্ষ। ‘লোটে ইন উইমার’-এর সপ্তম অধ্যায়ে, যেখানে গ্যোয়টে একটি দীর্ঘ অন্তর্মনোলাপ করেন, সেখানে গ্যেটের নিজস্ব উক্তি ও ভাষাভঙ্গি এমনভাবে মানের চিন্তার সঙ্গে মিশে যায় যে এক অবিশ্বাস্য ঘনত্বের সাহিত্যিক মোজাইক সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে এটি এক সাংস্কৃতিক অর্ধদেবতার পৌরাণিক মহিমাকেও নির্মমভাবে ভেঙে দেয়। (হেলেন লোয়ে-পোর্টারের কিছুটা কাঠখোট্টা ইংরেজি অনুবাদ পড়ে হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু উপন্যাসে গ্যেটের ঘুম ভাঙে যৌন উত্তেজিত অবস্থায়।)

‘ডক্টর ফস্টাস’ আবার নতুনভাবে মঞ্চস্থ করে ফ্রিডরিখ নীৎশের জীবনকে। এর মধ্যে স্থান পায় মানের পুরোনো ডায়েরির অংশবিশেষ, পাশাপাশি সুরকার আর্নল্ড শ্যোনবার্গ এবং দার্শনিক থিওডর ডব্লিউ. আদোর্নোর সংগীত-দর্শনের নানা উপাদান। উপন্যাসের কথক সেরেনুস সাইটব্লম, আরেকজন ঐচ্ছিক দীর্ঘবক্তা ও খানিকটা ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র, হিটলারের পতনের সংবাদে ঠিক সেই প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করেন, যা লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের অধ্যয়নকক্ষে বসে মান করেছিলেন। এই আত্ম-প্রতিফলনের কৌশল উপন্যাসটিকে এক অদ্ভুত বাস্তবতা দেয়, যেন পর্দার আড়াল থেকে আরেকজন লেখক সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছেন। মান নিজেকে যেমন নিরাবেগ দৃষ্টিতে দেখতেন, অন্যদেরও তেমনভাবেই পর্যবেক্ষণ করতেন।

এই বিচিত্র পদ্ধতির মধ্যে কি কিছুটা ভণ্ডামির উপাদান ছিল না? বিশেষ করে যখন আলফ্রেড এ. নফ জুনিয়র তাঁর নির্বাসিত তারকা ঔপন্যাসিককে “জীবিতদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক” হিসেবে প্রচার করছিলেন? মান নিজেও এই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করেননি। কারণ, সারাজীবন তিনি এক ধরনের অনুভূতিতে তাড়িত ছিলেন; যেন তিনি ভেতরে ভেতরে ফাঁপা, যেন কাঠের তৈরি কোনো সৈনিক। আর সত্যি বলতে, প্রতিভার ভঙ্গুরতা ছিল সবসময়ই তাঁর অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক বিষয়।

হিটলারকে নিয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধ ‘দ্য ব্রাদার’-এ তিনি বলেছিলেন, মহত্ত্ব মূলত নৈতিক নয়, নান্দনিক এক ঘটনা। অর্থাৎ নাৎসিরা যখন গ্যোয়টে বা বিথোভেনকে নিজেদের মতাদর্শের কাজে ব্যবহার করেছিল, তখন সেটি জার্মান শিল্পী-পূজার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না; বরং সেই পূজারই এক বিকৃত ও ভয়ংকর সম্প্রসারণ ছিল। ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’-এর সবচেয়ে অসাধারণ কৌশল ছিল এই যে, এটা তাঁর প্রতিভার সমস্ত অহংকার ও ভানকে ভেঙে ফেলতে পেরেছিল, অথচ তার মহিমাকেও অক্ষুণ্ন রেখেছিল। এই কীর্তি মাত্র একবারই সম্পূর্ণভাবে দেখানো যায়, এবং তা ঘটে ‘ডক্টর ফস্টাস’-এ। সেখানে লেভারক্যুন যখন নিজের বিদায়ি ক্যান্টাটা ব্যাখ্যা করতে করতে ধীরে ধীরে উন্মাদনার মধ্যে তলিয়ে যান, তখন বুর্জোয়া সংস্কৃতির এক নিখুঁত প্রতিমূর্তি নিজের ধ্বংসের নাটক নিজেই মঞ্চস্থ করে।

এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শেষ পর্যন্ত যা অবশিষ্ট থাকে, তা হলো মহাজাগতিক পরিহাস, একটি ভঙ্গি, যা মান তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। মৃত্যুর সময় তিনি ‘কনফেশনস অফ ফেলিক্স ক্রাল, কনফিডেন্স ম্যান’ উপন্যাসের প্রথম অংশ শেষ করেছিলেন। এটি তাঁর আগের একটি গল্পের বিস্তৃত, পূর্ণাঙ্গ রূপ। এক অধ্যায়ে দেখা যায়, আকর্ষণীয় যুবক ফেলিক্স প্যারিসের একটি হোটেলে ওয়েটারের কাজ করছে। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় স্কটিশ ভদ্রলোক লর্ড কিলমার্নকের। তিনি রোগা, সোজা ভঙ্গির একজন মানুষ; ধূসর-সবুজ চোখ, লৌহবর্ণ চুল, ছাঁটা গোঁফ, মুখ থেকে কিছুটা অস্বস্তিকরভাবে বেরিয়ে থাকা নাক, আর মিশুক অথচ বিষণ্ন আচরণ। এর আগে বহুবার, কিন্তু এত স্পষ্টভাবে কখনও নয়, মান যেন নিজের কল্পকাহিনির ভেতরে এসে নিজেই বসে পড়লেন। সংক্ষিপ্ত কয়েকটি আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে কিলমার্নক ফেলিক্সের প্রতি নিজের আকর্ষণের ইঙ্গিত দেন, যদিও কখনও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেন না। তিনি জীবনের যে দর্শনের কথা বলেন, তা হলো Selbstverneinung বা আত্ম-অস্বীকৃতি, অথবা আত্মকে অতিক্রম করার সাধনা। তিনি বলেন, “হয়তো, mon enfant (শিশু আমার), নিজেকে অস্বীকার করতে পারলেই অন্যকে স্বীকার করার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।”

মূল: অ্যালেক্স রস, দ্য নিউ ইয়র্কার

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কিস্তিতে পণ্য কেনা ক্রেতার মৃত্যু, পরিবারকে লাখ টাকার সহায়তা দিলো ওয়ালটন
কিস্তিতে পণ্য কেনা ক্রেতার মৃত্যু, পরিবারকে লাখ টাকার সহায়তা দিলো ওয়ালটন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নগদের ক্যারিয়ার ফেস্ট, চাকরি পেলেন ৫ শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নগদের ক্যারিয়ার ফেস্ট, চাকরি পেলেন ৫ শিক্ষার্থী
প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার না মানলে সরকার ও সংসদ অবৈধ: জামায়াত সেক্রেটারি
প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার না মানলে সরকার ও সংসদ অবৈধ: জামায়াত সেক্রেটারি
ভুলে চার মাস কারাভোগ, ৩০ লাখ টাকা পেলেন ভুক্তভোগী
ভুলে চার মাস কারাভোগ, ৩০ লাখ টাকা পেলেন ভুক্তভোগী
সর্বাধিক পঠিত
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
মুক্তি পেয়েই যে বার্তা দিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
মুক্তি পেয়েই যে বার্তা দিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
‘সময় নষ্ট করবেন না’, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে আবেদন নাকচ সুপ্রিম কোর্টের
‘সময় নষ্ট করবেন না’, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে আবেদন নাকচ সুপ্রিম কোর্টের