১৭ মে, রবিবার ভোরে আমি নাইজেরীয় সাহিত্যসমালোচক ও প্রাবন্ধিক চিমেজি চিকের একটি টুইট দেখি। সেখানে তিনি সদ্য ঘোষিত ২০২৬ কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজের ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিজয়ী জামির নাজিরের বিরুদ্ধে পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্পটি এআই দিয়ে লেখার অভিযোগ তুলেছেন।
সামাজিক মাধ্যম এক্সের মন্তব্যগুলো একটু ঘেঁটে দেখতেই বোঝা গেল, চিমেজি সহ আরও অনেকে দাবি করছেন, জামিরের গল্প “দ্য সার্পেন্ট ইন দ্য গ্রোভ” অনেকটা দুর্বল, অতিরিক্ত রূপকভারে ক্লান্তিকর, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই গল্প নাকি এআই দিয়ে লেখা।
এআই সংক্রান্ত অভিযোগগুলো আমাকে গভীর চিন্তায় ফেলে দেয়, কারণ যেসব লক্ষণ, বৈশিষ্ট্য বা বাক্যগঠনকে তারা এআইয়ের চিহ্ন বলছিল, সেগুলোই একজন পাঠক হিসেবে আমার বেশ ভালো লাগছিল। এমনকি আমি নিজের লেখাতেও এসব অনেকবার ব্যবহার করেছি।
বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার জন্য গল্পটা আবার মনোযোগ দিয়ে পড়ি। কিছু জায়গায় একটু বেশি অলংকার ও আবেগপ্রবণ মনে হয়েছে, কিন্তু এই ধরনের শৈলীর সঙ্গে আমি আগে থেকেই পরিচিত। এই ধরনের লেখাকে টনি মরিসন হয়তো বলতেন “ভাষাকে সত্যিই ব্যবহার করতে জানে।”
নাজিরের গল্পে এশীয় ও ক্যারিবীয় সাহিত্যধারার প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে আছে। অরুন্ধতী রায় ও জামাইকা কিনকেইডের মতো লেখকদের প্রভাব বেশ স্পষ্ট। আগের এশীয় ও ক্যারিবীয় বিজয়ীদের গল্পে যে অদ্ভুত অথচ সুন্দর আবহ খুঁজে পাই, এই গল্পেও সেটি আছে।
খুব দ্রুতই এই আলোচনা ছিটকে পড়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের নোংরা খাদে। ‘রুল অব থ্রি’, ‘রূপক’, ‘এম ড্যাশ’ ইত্যাদি নিয়ে তর্ক চলতে থাকে। কেউ কেউ প্যাংগ্রামের স্ক্রিনশট শেয়ার করে দেখায়, গল্পের কোন জায়গায় নিশ্চিতভাবেই এআইয়ের ব্যবহার রয়েছে এবং কোথাও আংশিক ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ গল্পটিকে ‘পোস্টকলোনিয়াল আবর্জনা’ বলছে, কেউ ‘ওকওয়াশিং’-এর অভিযোগ তুলছে। এই পুরস্কারে সফল হতে পারেননি এমন লেখকেরাও বিদ্রুপের সুযোগ নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে আছেন এক শ্রেণির বিভক্ত ও উত্তেজিত দর্শক।
১৩ মে, বুধবার ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজের আঞ্চলিক বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। চৌদ্দ বছরে পা দেওয়া এই পুরস্কারটি কমনওয়েলথ অঞ্চলের সাহিত্যিক উৎকর্ষ সাধনে কাজ করে আসছে। এর আগের বিজয়ী ও শর্টলিস্টে থাকা লেখকদের মধ্যে আছেন বেস্টসেলার লেখক, বুকার ফাইনালিস্ট, কির্কাস, ভি.এস. প্রিচেট ও উইন্ডহ্যাম-ক্যাম্পবেল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা।
এই পুরস্কারটি বিশেষ করে অপ্রকাশিত ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা লেখকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে কোনো এন্ট্রি ফি নেই এবং প্রকাশিত লেখক হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়। আমি ২০২০ সালে “হোয়েন আ ওম্যান রিনাউন্সেস মাদারহুড” গল্পের জন্য আফ্রিকান আঞ্চলিক পুরস্কার জিতেছিলাম। ফলে পুরস্কারের বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা আছে।
জমা পড়া সাত হাজারের বেশি গল্প প্রথমে পেশাদার পাঠকদের দ্বারা বাছাই করে প্রায় দুই শতাধিক গল্পের একটি লংলিস্ট বিচারকদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর স্বীকৃত সাহিত্যিক ও পেশাজীবী বিচারকমণ্ডলী সেখান থেকে পঁচিশটি গল্পের শর্টলিস্ট, পাঁচজন আঞ্চলিক বিজয়ী এবং শেষে সামগ্রিক বিজয়ী নির্বাচন করেন।
মোট ছয়জন বিচারক থাকেন: একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচ অঞ্চলের জন্য পাঁচজন বিচারক। তবে প্রতিটি ধাপেই সিদ্ধান্ত হয় সম্মিলিত ও সর্বসম্মতভাবে। আঞ্চলিক বিচারকদের এককভাবে নিজেদের অঞ্চলের বিজয়ী বেছে নেওয়ার ক্ষমতা নেই। ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইও এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজয়ীদের জন্ম ও নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হয় এবং গল্প প্রকাশের আগে একজন সম্পাদকও নিয়োগ দেওয়া হয়।
তাই এআই পোস্টে ভরা নাজিরের লিংকডইন অ্যাকাউন্ট, তার ফেসবুক জুড়ে এআই দিয়ে লেখা কবিতা, এমনকি পুরস্কারের জন্য ব্যবহৃত এআই দিয়ে তৈরি হেডশট যখন আলোচনায় এলো, তখন আমার মাথায় চিন্তা আসে—প্লেজিয়ারিজম ও বৌদ্ধিক চুরি ঠেকাতে এত কাঠামো থাকতেও কমনওয়েলথ কর্তৃপক্ষ এসব স্পষ্ট সংকেত ধরতে পারেনি কীভাবে?
স্বীকার করছি, এ বছরের বিচারক ও প্রথম পাঠকদের মতো আমিও নাজিরের এআই ব্যবহার খেয়াল করিনি। এখনও মনে করি, তিনি পুরস্কারের জন্য একটি সুন্দর গল্প জমা দিয়েছিলেন। কারণ, চ্যাটজিপিটি ও তার অন্যান্য পরজীবী ভাষা মডেলের জনপ্রিয়তার সাথে সাথে আমিও ‘উটপাখি কৌশল’ নিয়েছিলাম। অর্থাৎ সবকিছু একসময় নিজে থেকেই চলে যাবে ভেবে মাথা বালিতে গুঁজে রাখা। বিটকয়েনের ক্ষেত্রেও আমি এমনটাই করেছিলাম।
অনলাইনে ‘এআই দিয়ে লেখা কীভাবে শনাক্ত করবেন’ ধরনের আলোচনায় কয়েকবার অংশ নিলেও দ্রুত সরে এসেছি, কারণ যেসব লেখাকে “এআই-তৈরি” বলা হচ্ছিল, সেগুলোর বড় অংশই ছিল আমার মতো প্রান্তিক লেখকদের লেখা।
নাজিরের ঘটনার পর আমি কয়েকটি ‘এআই এখন সৃজনশীল লেখার শিল্প আয়ত্ত করে ফেলছে’ ধরনের প্রবন্ধ পড়া শুরু করি। বিষয়টি সত্যিই ভীতিকর। বারবার দেখা যাচ্ছে, যেসব শব্দ, বাক্যগঠন ও ভঙ্গি পড়ে ও লিখে আমি বড় হয়েছি, সেগুলোকেই এখন এআই লেখার স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সমস্যা হলো, এসব ‘লক্ষণ’ এক ধরনের গণ-আতঙ্ক তৈরি করছে। সবাই যেন এআই-গোয়েন্দা হয়ে উঠেছে। একজন লেখকের সচেতন শিল্পসিদ্ধ সিদ্ধান্তও এখন লাল বক্সে ঘেরা স্ক্রিনশট হয়ে ‘এআই-তৈরি’ তকমা পাচ্ছে। এই অবিশ্বাস ও বিশৃঙ্খলা বিনোদনমূলক হলেও যন্ত্রণাদায়কও।
যদি সত্যিই নাজিরের গল্প এআই-তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। পুরস্কার কর্তৃপক্ষকে এই ব্যর্থতার দায় নিতে হবে, পাশাপাশি এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। কেননা কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের নীতিমালায় এ নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বক্তব্য নেই।
কিন্তু নাজিরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো যদি পরিস্থিতিগত ও ভুল হয়ে থাকে? তাহলে তার সম্মানহানির কী হবে? আমরা কীভাবে আবার সৃজনশীল সহকর্মী হিসেবে একে অপরের চোখে চোখ রাখব?
তাই এআই-তৈরি লেখার অভিযোগ তোলার পদ্ধতিগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কেননা এআই দিয়ে লেখা শনাক্তকরণ এআই-চালিত এআই-চেকারের ওপর নির্ভরশীল। সেই বিশ্বাসকে আরও বাড়ায়। ফলে এক ভয়াবহ চক্র তৈরি হয়। এআই শনাক্ত করার নামে আরও বেশি লেখা এআই মডেলের ভেতরে ঢুকছে।
তাছাড়া ‘এআই দিয়ে লেখা কল্পকাহিনি’ ধারণাটিও এক অর্থে অদ্ভুত। এতে এআইকে স্রষ্টার আসনে বসানো হয়। অথচ এআই সাধারণত অ্যালগরিদমিক অনুকরণ অর্থাৎ মানুষের লেখাকে নকল করার একটি ব্যবস্থা। যে লেখকের কাজ ব্যবহার করে এসব ভাষা মডেল তৈরি হয়েছে, তারা এখনও জীবিত, এখনও লিখছেন। তাহলে তাদের কী হবে? তারা কি নিজেদের বহু বছরের গড়ে তোলা ভাষাশৈলী ভেঙে ফেলবেন? একেবারে লেখা ছেড়ে দেবেন? যারা এই লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত তাদের ভবিষ্যৎ কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও নেই। আমি ভাবছি, এআই দিয়ে লেখা রচনা কীভাবে আমাদের সাহিত্যবোধকে বদলে দিচ্ছে এবং দেবে। আমার মতো পাঠকদের হয়তো সরলতা ত্যাগ করতে হবে। প্রহরীর মতো ‘বিরক্তিকর লক্ষণ’ খুঁজে তারপর রায় দিতে হবে।
ঈশ্বর না করুন, যদি ভুল করে এআই দিয়ে লেখা কোনো রচনা পড়ে সত্যিই উপভোগ করে ফেলি! তখন কী হবে? একজন পাঠক কীভাবে সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাবে? কোনো লেখা ভালো লাগার পর সেটি যদি এআই দিয়ে লেখা বা অমানবিক সোর্স দিয়ে তৈরি জানতে পারি, তখন কি আর অপছন্দ করা সম্ভব?
পাঠক ও লেখকের জন্য এটি উভয়মুখী সংকট। নতুন ও তরুণ লেখকেরাই এই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে বড় শিকার হবেন। যাদের নাম এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যাদের ক্ষেত্রে সহজে ‘সন্দেহের’ তীর ছোড়া যাবে তারাই সবচেয়ে বেশি অভিযোগের মুখে পড়বেন।
আমার মনে হয়, লেখাকে ‘আরও মানবিক’ প্রমাণ করার এই প্রতিযোগিতায় হিউম্যান চেকারগুলো একসময় নতুন ধরনের ‘সেনসিটিভিটি রিডার’-এ পরিণত হতে পারে, যারা লেখকদের ‘মানুষের লেখা’ সনদ দিতে পারবে।
তাছাড়া এসব আত্মসন্দেহ, অবিরাম নজরদারি, সদিচ্ছাপূর্ণ হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত আমাদের সৃজনশীলতাকেই কতটা দমিয়ে দেবে, তা নিয়েও আমি গভীরভাবে শঙ্কিত।
মূল: ইনোসেন্ট চিজারাম ইলো/লিটহাভ ডট কম