অঁতোয়ান নিজেই ছিলেন লিটল প্রিন্স

সাল ১৯৩৫, দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ডিসেম্বরের এক রাত, চারদিকে ব্ল্যাকহোল অন্ধকার, দিগন্ত জুড়ে ঝিরিঝিরি বালুময় তপ্ত মরুভূমি। সুদূর আকাশে মিটিমিটি তারার আলো, ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় মৃতপ্রায় এক দুর্ধর্ষ বৈমানিক ও তার সহযাত্রীর আশঙ্কা—এটিই হয়তো তাদের শেষ রাত!

২৯ ডিসেম্বর প্যারিস থেকে উড্ডয়নকৃত ‘কোড্রোঁ সি. ৬৩০ সিমুন’ বিমানটি সাইগনের উদ্দেশ্যে প্রায় ১৯ ঘণ্টা উড়ার পর পরদিন ভোরে ঘন কুয়াশা ও ঝড়ের ঝাপটায় দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে আছড়ে পড়ে সাহারা মরুভূমির লিবিয়ান অংশে। অলৌকিকভাবে ক্র্যাশ থেকে বেঁচে যাওয়া বৈমানিকদের একমাত্র রসদ ছিল সামান্য কিছু ফল, চকলেট ও অল্প পানীয়। সাহারা মরুভূমির তীব্র দাবদাহে তারা বিমানের ডানায় জমা হওয়া সামান্য শিশিরবিন্দুও শুষে নিয়ে জলের তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা করেছিলেন। তারা সাহারা মরুভূমির তপ্ততা, তৃষ্ণা, ক্ষুধা, বেঁচে ফেরার আশাহীনতা ও দৃষ্টির সম্মুখে নিশ্চিত মৃত্যু নিয়ে হেঁটে চললেন টানা পাঁচদিন।

এক অলীক জগৎ, কাল্পনিক অবয়ব, বিচিত্র শাব্দিক প্রতিধ্বনি ও মরুভূমির মরীচিকার খাদে টেনে নিয়েছিল যাকে, তিনি আরো একবার অলৌকিকভাবে মরুভূমির দুই বেদুইনের সহায়তায় সেবারের মতো বেঁচে ফিরলেন, আট বছর পর লিখে ফেললেন ফরাসি ভাষায় সবচেয়ে বেশি পঠিত, ৩০০টি ভাষায় অনূদিত, বিশ্বব্যাপী ২০ কোটিরও বেশি বিক্রিত বই, বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক ক্লাসিক রূপকথা কিংবা দর্শনের অভিজ্ঞান ‘দ্য লিটল প্রিন্স’। সেদিনকার সেই রুদ্ধশ্বাস তুলকালাম অভিযানের দুর্ধর্ষ বৈমানিক আর কেউ নন, তিনি অঁতোয়ান দ্য স্যাৎ-একজ্যুপেরি এবং তার সঙ্গী নেভিগেটর আঁন্দ্রে প্রেভো।

প্রথমবার ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ পাঠের পর মনে পড়ছিল হুমায়ুন আজাদের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি—

“আমাকে ভালোবাসার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না তোমার।
নিজেকে দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত মনে হবে যেন তুমি শতাব্দীর পর শতাব্দী
শুয়ে আছো হাসপাতালে। পরমুহূর্তেই মনে হবে
মানুষের ইতিহাসে একমাত্র তুমিই সুস্থ, অন্যরা ভীষণ অসুস্থ।”

এই পঙক্তিগুলোই হঠাৎ মনে আসবার কারণ একটাই, কিছু বই পড়ার পর আমরা আর কখনোই আগের মতো থাকি না, পৃথিবীকে আগের মতো করে দেখি না কিংবা বুঝি না, এই 'রূপান্তরমূলক পাঠ অভিজ্ঞতাই' আমার মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে বেজে উঠেছিল। জগতের ঘুণেধরা ব্যবস্থাপত্রগুলো সম্বন্ধে বোঝাপড়া সৃষ্টি, জাগতিক অসুস্থতাগুলোকে ধরিয়ে দিতেই পৃথিবীতে ‘লিটল প্রিন্স’ কিংবা ছোট্ট রাজপুত্রের আগমন।

সাহারা মরুভূমিতে দু'পা এগিয়ে কিংবা একপা পিছিয়ে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করবার অভিজ্ঞতা থেকেই পৃথিবীকে ভিন্ন ভাবে চিনতে পেরেছিলেন অঁতোয়ান, পরবর্তীতে সেই অভিজ্ঞতা তিনি লিখে গেছেন আত্মজীবনীতেও। মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে জীবনকে চিনে নেবার অভিজ্ঞতা জগতের যাবতীয় বড় মানুষী ব্যবস্থাগুলোর কিংবা কলকব্জাগুলোর দৈন্যতাকে ঝেড়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল, সেই বোঝাপড়া থেকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন ছোট্ট রাজপুত্রের জগৎবীক্ষা, আদতে তার সৃষ্ট চরিত্র ছোট্ট রাজপুত্র কিংবা বৈমানিক উভয়ই ছিলেন তিনি নিজেই। তার ইগো ও অল্টার ইগোর মধ্যকার সংলাপই ছোটোদের চোখে রূপকথা, বড়দের চোখে দর্শন কিংবা জীবনবোধ হিসেবে হাজির হয়।


ছোট্ট রাজপুত্র পৃথিবীতে এসেছিল সৌরজগৎ পরিবারের বৃহৎ গ্রহাণুপুঞ্জের বি-৬১২ নামক এক ক্ষুদ্র গ্রহাণু থেকে। গল্পের ন্যারেটর-বিমানচালকের সঙ্গে মরুভূমিতে বন্ধুত্ব হয় ছোট্ট রাজপুত্রের, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে তার সৌরমণ্ডলীয় ভ্রমণের গল্প শোনায় সে বিমানচালককে কিংবা বিশ্বব্যাপী পাঠককে, শিখিয়ে দেয় প্রকৃত বেঁচে থাকার মানে। এই বেঁচে থাকার মন্ত্র কিন্তু নাকের ডগায় পুরু ফ্রেমের চশমা ঝোলানো জ্যাঠামশাই ধরনের কর্তৃত্বের নিয়মে, হিসাবের মারপ্যাঁচে কিংবা কেতাবি জগতে তৈরি হয় না, বেঁচে থাকার উপজীব্য হয়ে ওঠে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র সব মুহূর্ত—একটা সূর্যাস্ত দেখা, একটা ফুলকে ভালোবাসা বা একটা ভালো বন্ধু পাওয়ার মাঝে!

অঁতোয়ানের জন্ম হয়েছিল ১৯০০ সালের ২৯ জুন ফ্রান্সের এক অভিজাত পরিবারে, শৈশবেই পিতৃহারা অঁতোয়ান বড় হয়েছিলেন শিল্পমনা মায়ের সান্নিধ্যে। কল্পনার ডানায় চড়ে উড়ে বেড়ানো অঁতোয়ান সংখ্যা, অঙ্ক, হিসাব-নিকাশের বেড়াজালের বাইরের জগৎকে দেখতে ভালোবাসতেন, প্রকৃতির সঙ্গে কথোপকথনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা অঁতোয়ান হতে চাইতেন চিত্রশিল্পী, কিন্তু বড়দের হিসেবি জগৎ চিত্রশিল্পের পরিবর্তে তার ওপর ভূগোল, গণিত, ইতিহাসের বৈষয়িক জ্ঞানের বোঝা চাপিয়ে দিল, যেটিকে গল্পের আদলে তিনি ‘লিটল প্রিন্স’ বইয়ের ন্যারেটর বৈমানিকের ভাষ্যে উপস্থিত করলেন এভাবে— “ছোটোবেলায় বৈমানিক ভালোবাসতেন ছবি আঁকতে, প্রথমবার এঁকেছিলেন এক আস্ত হাতি গিলে ফেলা বোয়া সাপের ছবি, অথচ বড়রা সেই ছবি দেখে ভাবলো মাটিতে পরে থাকা হ্যাটের ছবি! অর্থাৎ, বড়দের জগৎ কখনোই কোনো বিষয়ের ভেতরটাকে দেখতে পায় না, তারা কেবল বৈষয়িক বাহ্যিকতাকেই মূল বলে মনে করে। তাকে তাই রং-তুলি ঝেড়ে ফেলে হতে হলো বিমানচালক!”

এই বিমানচালকের সঙ্গেই যখন মরুভূমিতে দেখা হলো ছোট্ট রাজপুত্রের, আমরা আদতে লেখক অঁতোয়ানের দ্বিমাত্রিক সত্তাকে সমান্তরালে মুখোমুখি সংলাপরত দেখতে পেলাম, তারা ছোটো ছোটো সহজ সরল ঘটনার মাধ্যমে খতিয়ে দেখছেন এবং দেখাচ্ছেন চিরায়ত মানব পরিস্থিতিকে।

গল্পে দেখতে পাই, বৈমানিকের বিমানটি যখন মরুভূমিতে ভেঙে পড়ে তখন ছোট্ট রাজপুত্র ও বৈমানিক পানির খোঁজে ছুটে বেড়ান, অথচ জীবনের চিহ্ন কোথাও নেই! হঠাৎই ছোট্ট রাজপুত্র বলে, “মরুভূমি এত সুন্দর কেন জানো? কারণ মরুভূমিতে কোথাও না কোথাও একটা কুয়া লুকোনো আছে।"

অঁতোয়ানের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে আট বছর আগের সেই সাহারা মরুভূমির প্লেন ক্র্যাশের রাতে আমরা ফিরে যাই, অলৌকিকভাবে এক বেদুইনের কাফেলা তাদের উদ্ধার করেন। অর্থাৎ, জীবনের যেকোনো মুহূর্তে যখনই ব্যক্তিমানুষ নিজেকে মরুভূমির ন্যায় বিরান প্রান্তরে একাকী খুঁজে পাবেন, কোথাও না কোথাও জলাশয়ের ধারাও অবশ্যই বহমান থাকবে।

ছোট্ট রাজকুমারকে সকলেই ভালোবাসতো, কিন্তু ছোট্ট রাজকুমার কেবল ভালোবাসতো তার গ্রহে হঠাৎ করে চলে আসা একটি ‘গোলাপকে’, বীজ থেকে গজানো সেই গোলাপ ছিলো অপূর্ব সুন্দরী কিন্তু ভীষণ অহংকারী! সৌরমণ্ডলের গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট রাজপুত্র যখন পৃথিবীতে এসে দেখলো একটি বাগানে পাঁচ হাজার গোলাপ, তখনই ছোট্ট রাজপুত্রের নিজের গোলাপকে পৃথিবীতে একমাত্র বলে ভাবার ভ্রান্তি ভেঙে গেলো, তখনই এক শেয়াল তাকে বোঝালো, “তোমার গোলাপ এই পাঁচ হাজার গোলাপ থেকে আলাদা, কেননা তুমি তাকে যত্ন দিয়েছ, শ্রম দিয়েছ, বড় করে তুলেছ।”

অঁতোয়ান ও তার স্ত্রী কনসুয়েলা সুনসিন
অনেকের মতে অঁতোয়ানের ব্যক্তিজীবনে এই গোলাপটি ছিলেন তার স্ত্রী! আগ্নেয়গিরির দেশ এল সালভাদরের স্বাধীনচেতা কন্যা কনসুয়েলা সুনসিন। স্ত্রী কনসুয়েলার আত্মজীবনী ‘দ্য টেইল অব দ্য রোজ’-এ সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা আমরা পাই। তাদের সম্পর্কের জটিলতার রূপক যেন ফরাসি এই লাইন দুটো— “On voit bien qu'avec le cœur. L'essentiel est invisible pour les yeux.” অর্থাৎ চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে দেখতে হয়। পৃথিবীতে কোনো মানুষই অনন্য নয়, বরং আমাদের যত্নই কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে অনন্য করে তোলে।

১৯৪৪ সালের ৩১ জুলাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটায় ফ্রান্সের আকাশে চুয়াল্লিশ বছর বয়সি একজন অভিজ্ঞ পাইলট পিঠের পুরোনো ক্ষত নিয়েই সকলের বারণ সত্ত্বেও ‘লাইটনিং পি-৩৮’ যুদ্ধবিমানটি নিয়ে উড়াল দিলেন। তিনি আর কেউ নন, অঁতোয়ান দ্য স্যাৎ-একজ্যুপেরি। ঠিক যেমন পৃথিবী থেকে হঠাৎ বিদায় নিয়েছিল তার গল্পের ছোট্ট রাজপুত্র, তেমনি অঁতোয়ানও তার শেষ উড্ডয়নের পর বিমান নিয়ে উধাও হয়ে যান। গল্পে কিংবা বাস্তবে বহু বছর ধরে তার কোনো সন্ধান মেলেনি।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালে এক ফরাসি জেলে ভূমধ্যসাগরে তার রুপার ব্রেসলেট খুঁজে পান। তাতে খোদাই করা ছিল অঁতোয়ান ও তার স্ত্রী কনসুয়েলার নাম। কিন্তু তার অন্তর্ধানের রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

প্রেমিকা মিলেনার উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে কাফকা জানিয়েছিলেন পৃথিবী সমাপ্তির আকাঙ্ক্ষা— “Dear Milena, I wish the world were ending tomorrow. Then I could take the next train, arrive at your doorstep in Vienna, and say: Come with me, Milena."

বৈমানিক অঁতোয়ান কিংবা ছোট্টো রাজপুত্র যে নামেই ডাকিনা কেন, কাফকার মতো তিনিও হয়তো বিমানের ওয়ান-ওয়ে টিকিট কেটে আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন সেটিকেই পৃথিবীর শেষ দিন হিসেবে! কেননা যুদ্ধক্লান্ত শরীর নিয়ে তার রহস্যময় উড্ডয়ন ও অন্তর্ধান অনেকগুলো প্রশ্নেরর মুখোমুখি করে তোলে পাঠককে, তা কি শুধুই সামরিক দায়িত্ব নাকি বিষণ্ন, ছকবদ্ধ বা ক্লান্তিকর জগৎ থেকে হঠাৎ একদিন হাওয়ায় যাবার আকাঙ্ক্ষা?


এই রহস্যময় বিদায় যেন তার নিজেরই সৃষ্ট চরিত্র ছোট্ট রাজপুত্রের নিয়তির প্রতিধ্বনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর ক্লান্তি, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করার অভিজ্ঞতা ও মানুষের নির্মিত জটিল ব্যবস্থার প্রতি গভীর সংশয়—সবকিছু মিলিয়ে অঁতোয়ান নিজের মধ্যেই ধারণ করেছিলেন বৈমানিক ও ছোট্ট রাজপুত্র উভয় সত্তাকে।

তাই ‘দ্য লিটল প্রিন্স’-কে রূপকথা বাইরে এসে মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন, তার ইগো ও অল্টার ইগোর মধ্যকার সংলাপ হিসেবে দেখা যায়। অঁতোয়ান যেন শেষ পর্যন্ত নিজেই মিশে গিয়েছিলেন নিজের সৃষ্ট সেই জগতে, যেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসা যায় না।