টি. এস. এলিয়ট ‘হ্যামলেট’-কে ব্যর্থ নাটক বলেছিলেন, ভার্জিনিয়া উলফ ও জেমস জয়েস একে অপরের কাজ নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন, এমনকি কোনো কোনো লেখক অন্য লেখকের বই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার কথাও বলেছেন। সাহিত্য ইতিহাসে এমন তীব্র বিদ্রূপ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা কিন্তু কম নয়!
যারা সারাজীবন অনেক ভেবেচিন্তে শব্দ বেছে বেছে লেখেন, তারাই অনেক সময় অন্য লেখকদের সম্পর্কে ভয়ংকর মন্তব্য করেছেন। সাহিত্যিক দ্বন্দ্ব অনেক সময় পেশাগত মতভেদের চেয়েও ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয়েছে।
জেন অস্টেনের কবর খুঁড়ে আঘাত করতে চেয়েছিলেন মার্ক টোয়েন
মার্ক টোয়েন শুধু জেন অস্টেনকে অপছন্দ করতেন না, তার অস্তিত্বই যেন তাকে বিরক্ত করত। তিনি একবার বলেছিলেন, অস্টেনের বই তাকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ পড়লেই তার ইচ্ছে করে জেন অস্টেনের কবর খুঁড়ে তাকে নিজের পায়ের হাড় দিয়ে আঘাত করতে।
মজার বিষয় হলো, জেন অস্টেনের উপন্যাস ভদ্রতা, সংযম ও সামাজিক আচরণ নিয়েই বেশি আলোচনা করে। অথচ মার্ক টোয়েনের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
নাবোকভের অপছন্দের তালিকায় অনেকেই
ভ্লাদিমির নাবোকভ অনেক বিখ্যাত লেখককেই অতিমূল্যায়িত মনে করতেন। তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিলেন ফিওদর দস্তয়েভস্কি। নাবোকভ দস্তয়েভস্কিকে “মাঝারি মানের লেখক” বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার মতে, দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে অতিরিক্ত নাটকীয়তা ও দুর্বল নির্মাণ ছিল। এতেই তিনি থেমে যাননি। তিনি উইলিয়াম ফকনারের লেখাকেও তুচ্ছ করে “ভুট্টাক্ষেতের গল্প” বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন।
ফরাসি আধুনিকতাবাদী অনেক লেখকের প্রতিও তার বিরূপ মনোভাব ছিল। তার অভিযোগ ছিল, তারা প্রকৃত শিল্পসত্তার বদলে কৃত্রিম আবেগ ব্যবহার করেন।
ভার্জিনিয়া উলফ বনাম জেমস জয়েস
ভার্জিনিয়া উলফ জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বইটিকে “অশিক্ষিত”, “নিম্নরুচির” ও “একজন অসুস্থ মনের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাজ” বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, কয়েকশ পৃষ্ঠা পড়ার পর বইটি একঘেয়ে হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ডি. এইচ. লরেন্স ‘ইউলিসিস’-এর শেষ অংশকে “সবচেয়ে নোংরা ও অশ্লীল লেখা” বলে অভিহিত করেছিলেন।
মজার বিষয় হলো, লরেন্স নিজেও অশ্লীলতার অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
হেমিংওয়ে ও ফকনারের শব্দযুদ্ধ
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও উইলিয়াম ফকনারের দ্বন্দ্ব ছিল বেশ বিখ্যাত। ফকনার একবার বলেছিলেন, হেমিংওয়ে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেন না, যা পাঠককে অভিধান দেখতে বাধ্য করতে পারে। এর জবাবে হেমিংওয়ে বলেন, “গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে বড় বড় শব্দের প্রয়োজন হয় না।” তিনি আরও বলেন, তিনি কঠিন শব্দ জানেন, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করাকে প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
এই বিতর্ক আসলে তাদের লেখার ধরনকেই প্রকাশ করে। ফকনার দীর্ঘ, জটিল ও ঘন গদ্য লিখতেন। অন্যদিকে হেমিংওয়ের ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত, সরল ও ধারালো।
টি. এস. এলিয়টের চোখে ব্যর্থ ‘হ্যামলেট’
উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-কে টি. এস. এলিয়ট সরাসরি “শিল্পগত ব্যর্থতা” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, নাটকটির আবেগ ও ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে যথেষ্ট সামঞ্জস্য নেই। এই মতামত তিনি তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘হ্যামলেট অ্যান্ড হিজ প্রবলেমস’-এ তুলে ধরেন।
অস্কার ওয়াইল্ডের তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন হেনরি জেমস
অস্কার ওয়াইল্ড তার তীক্ষ্ণ রসবোধের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। সেই রসবোধের লক্ষ্য হয়েছিলেন হেনরি জেমসও। ওয়াইল্ড একবার বলেছিলেন, জেমস এমনভাবে গল্প লেখেন যেন তা তার জন্য খুবই কষ্টকর এক দায়িত্ব পালন। তিনি আরও বলেন, জেমসের লেখনী হলো “অতিরিক্ত সতর্কতার বিশৃঙ্খলা”।
হেনরি জেমস মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও জটিল গদ্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। ওয়াইল্ডের মতে, তার লেখা পড়া বিনোদনের চেয়ে ক্লান্তিকর কাজের মতো একটা ব্যাপার।
ডরোথি পার্কারের বিখ্যাত বিদ্রূপ
ডরোথি পার্কার একবার একটি উপন্যাসের সমালোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন— “এই বইকে হালকাভাবে পাশে সরিয়ে রাখা উচিত নয়। একদম ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত।”
সাহিত্য ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় এক লাইনের সমালোচনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।









